উঠে দাঁড়ায় গোলাপী।
ততক্ষণে তাজের পিঠে বনহুর এসে দাঁড়ায় সেখানে।
গোলাপী বলে উঠে–এসেছেন তাহলে?
বনহুর অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলেভেবেছিল আসবো না?
না, ঠিক তা ভাবিনি তবে ভয় হচ্ছিলো, কারণ আমি যে বড় হতভাগিনী…
বনহুর বললো–এসো, এবার তোমার সেই মালেক ভাইয়ের বাড়ি তোমাকে পৌঁছে দি।
মালেক ভাইয়ের বাড়ি আপনি খুঁজে পেয়েছেন বুঝি?
হাঁ।
বনহুর গোলাপীকে তাজের পিঠে তুলে নিয়ে সেও চেপে বসে।
তাজ ছুটতে শুরু করে এবার।
গোলাপীর মনে এখন পূর্বের সেই ভীতিকর ভাব নেই। সে এখন বুঝতে পেরেছে যে তাকে নিয়ে চলেছে সে তারই প্রিয়জন, তাই ওর মনে খুশির উৎসব। ইকরাম আলী আর বড় সাহেবের কবল থেকে সে উদ্ধার পেয়েছে। আর তাকে কোনদিন ফিরে যেতে হবে না ও বাড়িতে, এই তার বড় আনন্দ।
বনহুরের বুকে গোলাপী ঠেশ দিয়ে নিজেকে আরও গভীরভাবে ওর সান্নিধ্যে নেয়। ওর প্রশস্ত বুকে বড় শান্তি, বড় তৃপ্তি, বড় আনন্দ।
কিছুক্ষণেই এসে পড়ে বনহুর সেই গ্রামখানার পাশে। আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সে–ঐ যে বাড়িখানা দেখছো, ওটাই হলো তোমার সেই মালেক ভাইয়ের বাড়ি।
গোলাপী তেমন খুশি হতে পারে না, কারণ সে জানে তাকে মালেক ভাইয়ের বাড়ি পৌঁছে দিয়েই চলে যাবে তার অজানা বন্ধু, তাই মনটা খুশি হতে পারে না যেন।
সেই বৃদ্ধের দরজায় এসে তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো বনহুর, নামিয়ে ধরলো। গোলাপীকে।
বৃদ্ধ দরজায় দাঁড়িয়েছিল, এগিয়ে এসে বললো–এসো মা, এসো।
গোলাপীকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর–চলো, ভিতরে চলো।
বনহুর আর গোলাপী বৃদ্ধের সঙ্গে উঠানে প্রবেশ করলো।
বৃদ্ধ দাওয়ায় মাদুর বিছিয়ে রেখেছিল, বললো–বসো বাবা, বসো তোমরা।
গোলাপী উঠানে প্রবেশ করেই এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো–মালেক ভাই কোথায় বুড়ো বাবা?
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকাতেই বনহুর বললো গোলাপী তোমার ছেলে মালেক মিয়ার কথা জিজ্ঞাসা করছে।
বৃদ্ধের স্মরণ হলো বনহুরের পূর্বে শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো। বললো বৃদ্ধ–ও আমার ছেলে মালেকের কথা বলছো বুঝি?
হাঁ। কোথায় মালেক ভাই বললো গোলাপী।
বৃদ্ধ বললো–মালেক বাড়ি থাকে না, সে চাকরি করে শহরে। তবে মাঝে মাঝে আসে, যখন তার মন চায় তখন….
বনহুর বলে–এসো মা, এবার বাড়ির ভিতরে এসো।
বনহুর বললো–যাও গোলাপী, তুমি এখানেই থাকবে। কোন অসুবিধা হবে না তোমার।
আপনি আসবেন না?
যখন মনে করব তখনই আসবো, দেখে যাবো তোমাকে। আমি তাহলে, কেমন?
অস্ফুট কণ্ঠে বললো গোলাপী–আসবেন কিন্তু, নাহলে আমি থাকতে পারবো না এখানে।
আসবো! কথাটা উচ্চারণ করে বনহুর তাজের পিঠে চেপে বসলো।
যতক্ষণ বনহুরকে দেখা গেল ততক্ষণ নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইলো গোলাপী সেদিকে।
বৃদ্ধ হাকিম উল্লাহও দাঁড়িয়ে রইলো তার পাশে।
গোলাপী ফিরে তাকাতেই বৃদ্ধ হাকিম উল্লাহ বললো–মা আমার কেউ নেই, তুমি আজ থেকে আমার মেয়ে হয়ে এলে। তুমি আমার সংসারের লক্ষ্মী… চলো মা, ভিতরে চলো।
গোলাপী তাকিয়ে দেখলো বৃদ্ধের মুখে মায়া–মমতার ছায়া ফুটে উঠেছে, গভীর স্নেহের পরশে চোখ দুটো ছল ছল করছে। বললো গোলাপী–চলো বাবা।
*
শহর থেকে পুলিশ অফিসার এলেন। সঙ্গে এলো পুলিশ ফোর্স। বড় সাহেবের হত্যার ব্যাপার নিয়ে সমস্ত শহর এবং গ্রামাঞ্চলে একটা ভীষণ চাঞ্চল্য দেখা দিল।
ইকরাম আলীর বাড়ি আজ লোকে লোকারণ্য। পুলিশের লোকজন আর গ্রামবাসীতে বাড়ি গম গম করছে। কে সে ডাকাত যার এমন দুঃসাহস বড় সাহেবকে হত্যা করেছে এবং গ্রামের মাতব্বর ইকরাম আলীকে আহত করেছে। গ্রামবাসীদের নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল পুলিশ অফিসার।
ডাক্তার এসেছেন তিনি ইকরাম আলীর হাত পরীক্ষা করে বললেন, হাতখানা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে, হাতখানা দেহ থেকে বিছিন্ন করে ফেলতে হবে। ইকরাম আলীকে তাই শহরে নিয়ে যাবার আয়োজন চললো।
ইকরাম গৃহিণী মাথায় করাঘাত করে কান্না জুড়ে দিয়েছে–তার রাগ ঐ গোলাপীর উপর। গোলাপীকে নিতে এসেই তো ডাকাত বড় সাহেবকে হত্যা করেছে, আহত করেছে তার স্বামী দেবতাকে।
পুলিশ প্রধানের কাছে একরাম আলী বললো–আমার পুত্রবধূ বড় অসৎচরিত্রা মেয়ে ছিল। সে আমার ছেলে হাবলুকে মোটেই পছন্দ করত না। সোপনে সে কোন এক ডাকাতের সঙ্গে প্রেম করত, সেই ডাকাত ইতিপূর্বে আরও কয়েকবার তার বাড়িতে হানা দিয়েছিল, তখন গোলাপীকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারেনি। এবার সে গোলাপীকে যখন নিয়ে পালাতে যাচ্ছিলো তখন বড় সাহেব এবং আমি নিজে ডাকাতকে বাধা দিতে এগিয়ে আসি। ডাকাত তখন তার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে।
ইকরাম আলীর কথায় অবিশ্বাসের কিছু ছিল না। বড় সাহেব প্রায়ই নানা কাজে হাজরা গ্রামে আসতো এবং গ্রামের মাতব্বর বলে ইকরাম আলীর বাড়িতেই সে উঠতে, কাজেই পুলিশ অফিসার ইকরাম আলীর কথামতই ডায়রী করে নিল।
বড় সাহেবের লাশ শহরে নিয়ে যাওয়া হলো।
তার সঙ্গে একটি ভিন্ন গাড়িতে ইকরাম আলীকেও নিয়ে যাওয়া হলো হসপিটালে।
*
হসপিটালের ৩নং ক্যাবিনে ইকরাম আলীকে রাখা হয়েছে। এক্সরে করার পর ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী তার দক্ষিণ হাতখানা সম্পূর্ণ দেহ থেকে বিছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। ইকরাম আলী যেন আধখানা হয়ে গেছে একেবারে।
তার চারপাশে সব সময় গ্রামবাসীদের ভিড় জমে আছে। কেউ বা ডাব–আনারস নিয়ে এসেছে, কেউ এসেছে আংগুর বেদানা নিয়ে, কেউ বা এসেছে মিষ্টি নিয়ে। ফলমূলের স্তূপ জমে উঠেছে ইকরাম আলীর শিয়রে। সবাই তাকে নানাভাবে সহানুভূতি জানাচ্ছে। অবশ্য যদিও সবার মনেই ইকরাম আলীর প্রতি প্রতিহিংসার জ্বালা, কারণ লোকটা যে চরম অসৎ ব্যক্তি তা কারও অজানা ছিল না, তবু গ্রামবাসী আসে সহানুভূতি জানাতে, কারণ যখনই ইকরাম আলী সুস্থ হয়ে উঠবে তখন সে হিসাব করে দেখবে গ্রামবাসীদের কে কে গিয়েছিল তাকে সহানুভূতি দেখাতে এবং তারা কে কেমন মূল্যের দ্রব্য নিয়ে হাজির হয়েছিল। সব কথাই তার মনে থাকবে আর সেই রকম নজর নিয়েই দেখবে সে গ্রামবাসীদের। অবশ্য তার অনুচরদের প্রতি ছিল সে সজাগ।
