বেশ তাই নিয়ে চলুন, আর কোনদিন আমি হাজরায় ফিরে যেতে চাই না।
সেখানে তোমার স্বামী আছে, সংসার আছে।
কে আমার স্বামী?
শুনেছিলাম ইকরাম আলীর পুত্র হাবলুর সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছিল?
হাঁ, কিন্তু আমি জানি আমি তার স্ত্রী না, সেও আমার স্বামী না, কারণ সে কোনদিন আমাকে স্পর্শ করেনি, আমিও কোনদিন তাকে স্বামী বলে গ্রহণ করিনি।
তাহলে হাবলুর সংসার তুমি নিজের সংসার বলে মেনে নিতে চাও না?
না না না, আমি মরে যাবো তবু আর হাজরায় ফিরে যাবো না কোনদিন।
সত্যি?
হাঁ সত্যি।
চলো তবে, কিন্তু যাবার পূর্বে তোমাকে এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, কারণ মালেক মিয়া বা তার আত্মীয় কেউ বাড়িতে আছে কিনা আমাকে জেনে আসতে হবে।
বেশ, আমি এখানে বসছি আপনি শীঘ্র ফিরে আসবেন। গোলাপী বসে পড়ল সেই স্থানে একটা উঁচু মাটির ঢেলার উপর।
জমকালো মূর্তি অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসলো।
গোলাপী নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
জমকালো মৃর্তি বললো–খোদা হাফেজ। অশ্ব তারপর তাকে নিয়ে চলে গেল দ্রুতগতিতে।
*
অজানা গ্রাম।
অশ্বপৃষ্ঠে এসে দাঁড়ালো বনহুর। অশ্বপৃষ্ঠ থেকেই সে লক্ষ্য করতে লাগল গ্রামখানাকে। এখনও ভোরর সূর্য প্রখর হয়ে উঠেনি। গ্রামবাসীরা সবে জেগে উঠেছে অনেকে চলেছে মাঠের পথে লাঙ্গল কাঁধে।
বনহুর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
হঠাৎ তার নজরে পড়ল এক বৃদ্ধ গরু নিয়ে মেঠো পথ ধরে এগুচ্ছে।
বনহুর অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো, লাগাম ধরে এগিয়ে গেল কিছুটা।
ততক্ষণে বুদ্ধ গরু নিয়ে ঠিক সামনা–সামনি এসে পড়েছে।
বনহুর বললো–শোন বাবা!
এগিয়ে এলো বৃদ্ধ, বললো–আমাকে ডাকছো?
বনহুর বললো–হাঁ।
বৃদ্ধ ততক্ষনে গরুর দড়ি হাতের মুঠায় চেপে ধরে বনহুরের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
বনহুরকে দেখে বৃদ্ধ কিছুটা অবাক হয়েছে, কারণ সে ইতিপূর্বে তাকে কোনদিন দেখেনি, তাছাড়া বনহুরের জমকালো পোশাক তাকে আরও বিস্মিত করে তুলেছিল। বললো বৃদ্ধ আমাকে কিছু বলবে?
বনহুর বললো–হাঁ বলবো, আর বলবো বলেই তো তোমাকে ডেকেছি। আচ্ছা বাবা, এ গ্রামেই বুঝি তুমি থাকো?
হাঁ, এ গ্রামেই থাকি। ঐ যে বাড়িখানা দেখছো ওটাই আমার বাড়ি।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো, গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা বাড়ি, ছোট্ট উঠানের পাশে পাশাপাশি দুটি তালগাছ।
বললো বৃদ্ধ–ওখানে আমি থাকি।
তোমার ছেলেমেয়ে আছে?
না, কেউ নেই। আমার এক মেয়ে ছিল, সেও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে…. কণ্ঠ ধরে এলো বৃদ্ধের। চোখ দুটো গামছার আঁচলে মুচে নিয়ে বললো সে ছেলেমেয়ে থাকলে আজ। আমাকে খেটে খেতে হতো না।
বনহুর বললো–শোন বাবা, আমার একটা বোন আছে, তাকে যদি তোমার কাছে রাখি তাড়িয়ে দেবে নাতো?
বৃদ্ধ বললো–আমি নিজেই খেতে পাই না, তোমার বোনকে কি খাওয়াবো বলো? ওসব হবে না বাবা, পথ ছাড়ো আমি চলে যাই।
বনহুরের কথা শুনে খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো বৃদ্ধের চোখ দুটো, বললো–তোমার বোনের সঙ্গে আমারও ভরণ–পোষণের ব্যবস্থা করবে, সত্যি বলছো?
হাঁ সত্যি। বনহুর কথাটা বলে প্যান্টের পকেট থেকে এক তাড়া নোট বের করে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে ধরে–নাও। রেখে দাও, আমার বোনকে তোমার কাছে রেখে যাবার পূর্বেই আমি তোমাকে এ টাকাগুলো দিলাম।
বৃদ্ধের চোখ দুটো ছানাবড় হয়ে উঠলো, তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না এত টাকা তাকে নেবার জন্য কেউ বলছে। সে ভাবছে, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো।
বৃদ্ধের হতভম্ব ভাব দেখে বললো বনহুর–ভয় নেই, নাও এ টাকা। বাড়ি ফিরে যাও, আর তোমাকে কাজ করে খেতে হবে না। বুড়ো মানুষ–বসে বসে খাবে বুঝলে?
বাবা, কে তুমি?
আমি যেই হই না কেন, আমার বোনকে তোমার বাড়িতে আশ্রয় দেবে, তাহলেই আমি খুশি হব এবং প্রয়োজনবোধে আরও টাকা দেব। নাও টাকা নিয়ে গোপনে রেখে দাও।
বৃদ্ধ কম্পিত হস্তে টাকার বাণ্ডিল নিয়ে চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেললো।
বনহুর বললো–শোন, একটা মিথ্যা কথা বলতে হবে আমার বোনের কাছে।
মিথ্যা কথা!
হাঁ। তুমি বলবে তোমার একটি ছেলে আছে, তার নাম মালেক মিয়া। আরও বলবে সে দূরে কোন জায়গায় চাকরি করে। শোন বাবা, মালেক মিয়া নামে কেউ যদি কোন সময় আসে তাকে নিজের ছেলের মত আদর যত্ন কর। মালেক মিয়া হয়তো আসতেও পারে।
মালেক মিয়া! মালেক মিয়া তোমার কেউ হয় বুঝি?
হাঁ, আমার বড় ভাই। যাও, তুমি বাড়ি ফিরে যাও… বনহুর কথাটা বলে চেপে বসে তাজের পিঠে।
বৃদ্ধ নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে, আজ সে কার মুখ দেখেই না উঠেছিল। কাপড়ের তলায় টাকার বাণ্ডিলগুলোর অস্তিত্ব ভাল করে অনুভব করে বৃদ্ধ।
ততক্ষণে তাজ প্রভুকে নিয়ে ছুটতে শুরু করেছে।
*
ফিরে আসে বনহুর গোলাপীর পাশে।
গোলাপী একা একা ঝিমিয়ে পড়েছিল, মনের মধ্যে একরাশ চিন্তা জট পাকাচ্ছিলো, ভাবছিল। সে… ওকে বিশ্বাস কি….. কতবার তো সে এসেছে, তাকে কথা দিয়ে চলে গেছে, পরে আর আসেনি… এবারও যদি ও না আসে…. তাহলে এই নির্জন প্রান্তরে সে একা একা কোথায় যাবে….. এ পথ তার চেনা নয়। কেউ নেই তার যে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
ভাবছে গোলাপী এমন সময় শুনতে পায় ঘোড়ার খুরের শব্দ। আনন্দে বুকটা ওর ঢিব ঢিব করে উঠে। একটা খুশির উচ্ছলতা তার সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগায়। নতুন এক প্রভাত আজ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
