কেউ ছুটলো শহর অভিমুখে পুলিশ অফিসে সংবাদ দিতে, কেউ ছুটলো ডাক্তারের বাড়িতে ডাক্তার ডাকতে।
ইকরাম আলীর দক্ষিণ হাতখানার হাড় গুড়ো হয়ে গেছে, ছিঁড়ে গেছে রগগুলো। রক্তের বন্যা ছুটেছে যেন।
ওদিকে মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে বড় সাহেব। চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে আছে তার বুকের পাশে। এখনও বড় সাহেবের চোখ দুটো মুদে যায়নি, কেমন যেন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে।
পাড়া প্রতিবেশীরা অনেকেই বলছে তারা নাকি অশ্বপদ শব্দ শুনতে পেয়েছে। গোলাপীকে অশ্বপৃষ্ঠে তুলে নিয়ে ডাকাত পালিয়ে গেছে, বুঝতে পারে সবাই।
.
পূর্বাকাশ ফর্সা হয়ে এলো
অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো জমকালো মূর্তি। এতক্ষণ একটানা অশ্ব চালনা করে এসেছে সে। সম্মুখে বসিয়ে নিয়েছিল জমকালো মৃর্তি গোলাপীকে।
এবার নির্জন একস্থানে এসে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে জমকালো মূর্তি নেমে দাঁড়িয়ে গোলাপী–বৌকে সে নামিয়ে নিল নিচে।
গোলাপীর মুখখানা বিবর্ণ ফ্যাকাশে, ঠিক মড়ার মুখের মত রক্তহীন। অসহায় করুণ তার চোখ দুটো, মুখে কোন কথা নেই, এমন কি চিৎকার করার শক্তিও যেন সে হারিয়ে ফেলে।
জমকালো মূর্তির পাগড়ির আঁচলে এখনও তার মুখের নিচের অংশ ঢাকা, এবার জমকলো মূর্তি নিজের মুখের আবরণ সরিয়ে ফেলে।
সঙ্গে সঙ্গে গোলাপী বলে উঠ–আপনি আপনি সেই লোক, এতক্ষণে গোলাপীর রক্ত শূন্য মুখখানায় একরাশ রক্ত ছড়িয়ে পড়ল যেন, চোখ দুটো খুশিতে ভরে উঠলো তার।
বললো জমকালো মূর্তি–আমিই তোমার সেই বন্ধু!
নির্বাক দৃষ্টি মেলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল গোলাপী ওকে, প্রাণভরে যেন সে ওকে দেখছে। ভুলে গেছে গোলাপী লজ্জা–শরমের কথা।
হেসে বললো জমকালো মূর্তি–কি দেখছো অমন করে?
আপনাকে! সত্যি আপনি যে এমন করে ঠিক ঐ মুহূর্তে আমাকে উদ্ধার করব ভাবতে পারিনি। খোদা আপনাকে পাঠিয়েছিল–নাহলে আমি সব হারাতাম…. গোলাপীর গলা বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে। একটু থেমে বলে–জান, মালেক ভাই সেই যে চলে গেছে আর আসেনি। বড় ভাল লোক ছিল সে, বড় ভালবাসতো আমাকে। জান, সে চলে যাবার পর আমার আর কিছু ভালো লাগে না। মনে হয় আমার কেউ নেই….
জমকালো মূর্তি বলে উঠে–যদি মালেক ভাইকে পাও খুশি হবে?
হাঁ, আমি খুব খুশি হব।
বেশ, আমি তোমাকে ঐ নরপশুর কবল থেকে উদ্ধার করে এনেছি, এবার তোমার মালেক ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেব।
আর আপনি?
আমি একজন খুনী ডাকাত, কাজেই পুলিশ আমাকে সর্বক্ষণ সন্ধান করে ফিরছে, আমি তো তোমার পাশে থাকতে পারি না।
কিন্তু আমি যে আপনাকে ছেড়ে দেব না আর। আপনি আমাকে নিয়ে চলুন, যেখানে আপনার ঘর, আমি সেখানেই থাকবো।
আমার তো কোন ঘর নেই– আমি ডাকাত, আমি খুনী… তুমি তো নিজের চোখেই তার প্রমাণ পেয়েছে, কাজেই….
না, আমি কোন কথা শুনবো না, আপনাকে যখন পেয়েছি তখন কিছুতেই আপনাকে আমি ছাড়বো না।
তা হয় না।
কেন হয় না? আমি বহুদিন ধরে আপনার প্রতীক্ষা করছি। আপনি কোথা থেকে এসেছেন আবার কোথায় চলে গেছেন। কতদিন আমি মালেক ভাইকে বলেছি কিন্তু মালেক ভাই আপনার সন্ধান দিতে পারেনি। আপনি আজ আমাকে বড় সাহেবের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। উনি বড় সাহেব নন, উনি নরশয়তান, জালেম…. রাগে গোলাপীর গলার স্বর কঠিন হয়ে উঠে।
জমকালো মূর্তি বলে–বড় সাহেবের চেয়েও জালেম হলো তোমার শ্বশুর ইকরাম আলী। কারণ, তারই সহায়তায় বড় সাহেব প্রশ্রয় পেয়েছিল। তোমার উপর পাশবিক অত্যাচার চালাতেও সে পিছপা হয় নি।
এতই যদি জান তবে কেন আমার শ্বশুরকে আপনি হত্যা করলেন না?
এবার একটু হাসলো জমকালো মূর্তি তারপর বললো–হত্যা করে ঐ নরশয়তানকে রেহাই দেব না, তাই ওকে হত্যা করিনি–ওর শাস্তি তিল তিল করে মৃত্যুবরণ করা। গোলাপী, ইকরাম আলী শুধু তোমার জীবনটাকেই ধ্বংস করেনি, ধ্বংস করেছে সে সমস্ত গ্রামবাসীর। হাজরার এমন কোন ব্যক্তি নেই যার সে ক্ষতি করে নি। আত্মীয়ের ক্ষতি করেছে আত্মীয়ের মুখোশ পরে। পাড়া প্রতিবেশীর ক্ষতি করেছে প্রতিবেশীর দোহাই দিয়ে। বন্ধুর ক্ষতি করেছে পরম বন্ধু সেজে। এই নরপশুর শাস্তি মৃত্যু নয়…
তবে, তবে কি করব তার?
জঘন্য নির্মমভাবে তাকে আমি হত্যা করব এবং সে কারণেই আমি তাকে জীবিত রেখেছি।
বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিল গোলাপী ওর দিকে। কে এই ব্যক্তি যার কথাবার্তা, চালচলন স্বাভাবিক মানুষের মত নয়। কে এই লোক যাকে সে মাঝে মাঝে হাজরা গ্রামের সেই বটতলায় দেখেছিল, আবার কোথায় উবে যেতো, আর কতদিন দেখা যেতো না। একনজর দেখেই গোলাপী ভালবেসে ফেলেছিল—ভালবাসা নয়, পাগলিনীপ্রায় হয়ে পড়েছিল এত ভাল লেগেছিল সে নিজেই বুঝতে পারেনি। ওর কণ্ঠস্বর, ওর চোখ দুটো, ওর হাসি তাকে আকর্ষণ করেছিল ভীষণভাবে। সেই সুন্দর সুপুরুষ লোকটার আর একটা ভয়ঙ্কর রূপ ছিল তা জানতো না গোলাপী।
আজ যখন সে জমকালো পোশাক পরে, আগ্নেয়াস্ত্র হাতে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে বড় সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করলো তখন গোলাপী ভাবতেও পারেনি এই ব্যক্তি তার সেই বন্ধু।
গোলাপী যখন নানা কথা ভাবছে তখন জমকালো মূর্তি বলে উঠলো– হাজরা গ্রাম ছেড়ে আমরা বহুদূর এসে পড়েছি। ঐ যে সম্মুখে একটি গ্রাম দেখা যাচ্ছে, ঐ গ্রামেই আছে তোমার মালেক ভাইয়ের বাড়ি। যদি বলল ওখানে তোমাকে পৌঁছে দেব, থাকবে ওখানে।
