কিন্তু বড় সাহেব তখন উন্মত্তের মত গোলাপীকে বুকে টেনে নিয়ে নিজের মুখখানাকে তার মুখের উপর চেপে ধরলো।
ঠিক ঐ মুহূর্তে পিছনের জানালা কেঁপে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো এক জমকালো মূর্তি।
চমকে ফিরে তাকালো বড় সাহেব। মুখমণ্ডল তার ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। গোলাপীকে মুক্ত করে দিয়ে বললো– কে তুমি?
জমকালো মূর্তির দক্ষিণ হাতে রিভলভার, পায়ে ভারী বুট। দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এলো সে বড় সাহেবের পাশে।
গোলাপী তখন ভয়বিহ্বল চোখে বিবর্ণমুখে তাকিয়ে আছে জমকালো মূর্তিটার দিকে। তার মনেও প্রশ্ন— কে এই জমকালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তি। টু শব্দও সে উচ্চারণ করছে না। গোলাপীর সুন্দর মুখখানা নীল হয়ে উঠেছে যেন।
জমকালো মূর্তি কয়েক পা অগ্রসর হয়েই বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরলো বড় সাহেবের জামার কলার। তারপর রিভলভার চেপে ধরলো তার বুকে, কঠিন স্বরে বললো– একটা অসহায় মেয়ের ইজ্জত সুটে নিতে লজ্জা করছে না বড় সাহেব? জান, তোমার মা–বোন আছে– তাদের ইজ্জত যদি কেউ এমনিভাবে লুটে নেয় তাহলে কেমন হবে?
কেন তুমি?
আমি মানুষ।
তুমি! তুমি খুন করতে চাও নাকি আমাকে
হাঃ হাঃ হাঃ, খুন করতে চাইবে আমি আপনার মত মহৎ মহান ব্যক্তিকে? তোমাকে ফুল দিয়ে পূজা করব, নরপশু শয়তান–
কথা শেষ হয় না জমকালো মূর্তির। সম্মুখ দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ইকরাম আলী। সে গোলাপীকে বড় সাহেবের হাতে দিয়ে ফিরে গিয়েছিল নিজ কক্ষে। শয্যায় গা এলিয়ে দিতেই তার কানে পৌঁছলো জমকালো মূর্তির কণ্ঠের অদ্ভুত হাসির শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো ইকরাম আলী উঠানে। কান পেতে বললো– হাবলুর মা, এ হাসির শব্দ বড় সাহেবের নয়।
ইকরাম গৃহিণীও কান পেতে শুনছিল, বলে উঠে তাই তো এ গলার আওয়াজ তোমার বড় সাহেবের নয়—
ইকরাম আলী তক্ষুণি ছুটলো বৈঠকখানা অভিমুখে। কক্ষের দরজা অর্ধ ভেজান ছিল। সে দরজা ঠেলে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়ালো তার দু’চোখ বিস্ময় ফুটে উঠলো। সে প্রথমে হতভম্ব হলেও পরমুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠে এবং চিৎকার শুরু করলো ডাকাত— ডাকাত–
মাত্র কয়েকটা শব্দ সে উচ্চারণ করতেই জমকালো মৃর্তির রিভলভারের গুলী বড় সাহেবের বক্ষ ভেদ করে আলগোছে বেরিয়ে গেল। একটা তীব্র আর্তনাদ ফুটে উঠলো সেই কক্ষে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল বড় সাহেব, তাজা রক্তের বন্যা ছুটলো মেঝেতে।
জমকালো মূর্তির রিভলভারের গুলী বড় সাহেবের বক্ষ ভেদ করতেই ইকরাম আলী পিছু হটে পালাতে যাচ্ছিলো।
জমকালো মূর্তি তার ডান হাতখানা লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো।
সঙ্গে সঙ্গে আর্তচীৎকার করে উঠলো–ইকরাম আলী এবং বাম হাতে ডান হাতের বাজু চেপে ধরলো।
জমকালো মূর্তি মুহূর্ত বিলম্ব না করে গোলাপীকে তুলে নিল কাঁধে, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল পিছনের জানালা দিয়ে কক্ষের বাইরে।
গোলাপী একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তার চোখের সম্মুখে এমন খুন, এত রক্ত সে কোনদিন দেখেনি। জমকালো মূর্তি যখন গোলাপীকে ধরে ফেললো তখন সে একটু শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না, সংজ্ঞাহীনার মত চুপ ছিল সে।
জমকালো মূর্তি গোলাপীকে নিয়ে পিছন জানালা দিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে!
বাইরে তখন জমাট অন্ধকার।
কক্ষমধ্য থেকে ইকরাম আলীর কাতর আর্তকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে বাঁচাও, কে কোথায় আছো বাঁচাও আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে, বাঁচাও–
পরমুহূর্তেই শোনা যায় ইকরাম গৃহিণীর ভয়ার্ত চিৎকার– ওরে কে আছে, বাঁচাও বাঁচাও, খুন হয়েছে, খুন হয়েছে–
ইকরাম গৃহিণী গুলীর শব্দ শুনতে পেয়ে নিজ কক্ষ থেকে ছুটে এসেছিল, বৈঠকখানায় প্রবেশ করতেই দেখতে পায় মাটিতে রক্তাক্ত দেহে পড়ে আছে বড় সাহেব, তারপর স্বামীর দেহ রক্তাক্ত। সে বাম হাতে ডান হাতের বাজু চেপে ধরে মাতালের মত টলছে। ইকরাম গৃহিণী এ দৃশ্য লক্ষ্য করে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল একি কাণ্ড, সে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। একটু সামলে নিয়েই চিৎকার শুরু করলো সে।
ইকরাম গৃহিণীর আর্তচিৎকারে ছুটে এলো পাড়া প্রতিবেশি। সবাই উঠানে ভিড় জমিয়ে ফেললো অল্পক্ষণেই। ইকরাম গৃহিণী বললো দেখে যাও, ভিতরে এসে দেখে যাও কি সর্বনাশ আমার হয়েছে…. তোমরা দেখে যাও….
সবাই ভিড় করে বৈঠকখানায় প্রবেশ করলো।
বড় সাহেবের রক্তাক্ত দেহ লক্ষ্য করে ভীত আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সবাই। সকলের মুখই ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠলো, সবাই একবাক্যে বলে উঠে খুন খুন খুন……..
অল্পক্ষণেই গ্রামবাসীতে ভরে উঠলো ইকরাম বাড়ি। অন্ধকার রাত, সবার হাতেই লণ্ঠন আর কেরোসিনের ডিবা। নানা জনের মুখে নানা ধরনের কথা।
ইকরাম আলীকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ইকরাম আলী আর্তকণ্ঠে বলছে–ডাকাত গোলাপী বৌকে নিতে এসেছিল, তখন বড় সাহেব আর আমি বাধা দেই, তাতেই সে বড় সাহেবকে খুন করে আর আমাকে আহত করে গোলাপীকে নিয়ে পালিয়েছে……
ইকরাম গৃহিণী বলে, হায় হায়, আমি আগেই যদি জানতাম ঐ শয়তানীর ডাকাতের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, তাহলে সাবধান থাকতাম আমরা। হায় হায়, কি সর্বনাশ সে আমাদের করলো। বড় সাহেব ওর জন্য খুন হলো। হাবলুর বাবার হাতখানা গেল। কি হবে…. মাথায় করাঘাত করে সে কাঁদতে লাগল।
পাড়া প্রতিবেশীরা এসে ঘিরে ধরলো ইকরাম গৃহিণীকে, এক একজন এক এক রকম কথা বলতে লাগল। সবার রাগ গিয়ে পড়ল গোলাপীর উপর। তারই জন্য এতবড় সর্বনাশ আজ হলো। গোলাপীর রূপই নাকি এই সর্বনাশের মূল।
