যাচ্ছিগো যাচ্ছি– আগে হাবলু ঘুমিয়ে পড়ুক।
ওর জন্য ভাবতে হবে না, ও ওসব কি বোঝে?
যাও, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি বলে ইকরাম গৃহিনী গোলাপীর কক্ষের দিকে চলে যায়।
ইকরাম আলী এসে দাঁড়ায় উঠানের মাঝখানে।
গোলাপীর কক্ষ থেকে ভেসে আসে গোলাপীর কণ্ঠস্বর– না, আমি যাবো না।
থমথমে অন্ধকার রাত।
নিস্তব্ধ বাড়িখানায় গোলাপীর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা যায়। ইকরাম আলী রাগে–ক্ষোভে অধর দংশন করে, চাপাকণ্ঠে বলে–ছিঃ ছিঃ ছিঃ, আমার মান–সম্মান সব খোয়া গেল। বড় সাহেবের কানে গিয়ে পৌঁছলো বুঝি গোলাপীর কথাগুলো ছিঃ ছিঃ ছিঃ–
গম্ভীর গলায় ডাকলেন– হাবলুর মা ও হাবলুর মা, শোন! ওকে টেনে বের করে নিয়ে এসো–
স্বামীর কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল ইকরাম গৃহিণী। সে পুত্রবধূকে শাসনের সুরে বললো শিগগির চলল, নাহলে টেনে বের করে নিয়ে যাবে বলে দিলাম।
গোলাপী খাটের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইলো স্থবিরের মত। এই তার নতুন নয়, এমনি অনেকবার তাকে অনেক বড় সাহেবের পাশে যেতে হয়েছে নানারকম উৎকট উক্তি তাকে শুনতে হয়েছে। ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তবু সেই সময় তার পাশে আরও কয়েকজন ছিল। আজ গভীর রাতে বড় সাহেবের ঘরে তাকে একা যেতে হবে– না না না, সে কিছুতেই যাবে না, কিছুতেই না।
গোলাপী বলে উঠলো আমাকে তোমরা জবাই কর– তবু আমি যাবো না—
কি বললে? ইকরাম গৃহিণী খেঁকিয়ে উঠলো।
গোলাপীর কণ্ঠে যেন আজ অসীম সাহস দেখা গেল। সে প্রতিবাদের সুরে বললো– আমি রাতদুপুরে কিছুতেই বাইরে যাবো না।
কি, এত সাহস তোমার আমার মুখের উপর এতবড় কথা বলতে পারলে! ইকরাম গৃহিণীর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। গোলাপীর কথাগুলো তার কানে সম্পূর্ণ নতুন বলে মনে হলো, কারণ এর পূর্বে এমন সূর তার কণ্ঠে কোনদিন শোনোনি সে।
রাগে–ক্ষোভে ইকরাম গৃহিণী উন্মুখ হয়ে উঠলো যেন, সে বস্ত্র মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো গোলাপীর হাত– চলো, যেতেই হবে তোমাকে।
না, আমাকে এমন করে নিয়ে যেও না মা, আমাকে এমন করে টেনে নিয়ে যেও না। আমি এত, রাতে বাইরের ঘরে যাবো না, যাবো না– গোলাপী খাটের হাত চেপে ধরলো শক্ত করে।
বললো ইকরাম গৃহিণী তোকে না নিয়ে গিয়ে ছাড়বো না। চল হারামী মেয়ে, চল্ শিগগির
মা– মাগো, আমাকে নিয়ে যেও না– যেও না, ছেড়ে দাও– ছেড়ে দাও—
ততক্ষণে গোলাপীকে টেনে বের করে আনে ইকরাম গৃহিণী ঘর থেকে বাইরে।
উঠানে উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইকরাম আলী, তার মুখখানা তখন সম্পূর্ণ দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে, ভীষণ রেগে গেছে সে।
বৈঠকখানার ঘরে বড় সাহেব ধূর্ত শিয়ালের মত ওৎ পেতে বসে বসে সিগারেট পান করছে। তার ধমনির রক্ত তখন উষ্ণ হয়ে উঠেছে। গোলাপীকে ইতিপূর্বে সে কয়েকবার দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছে কিন্তু একেবারে এমন নির্জন রাতে সঙ্গিনী হিসাবে তাকে কাছে পায়নি কোনদিন। বড় সাহেব এত ঘন ঘন হাজরা গ্রামে আসে শুধু ঐ একটিমাত্র কারণে, গোলাপীর যৌবন সুধা পান করার নেশা তাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। তাই সে নেশাগ্রস্তের মত কাজে অকাজে হাজরায় ধন্না দিতে শুরু করে দিয়েছে।
ইকরাম আলী বড় সাহেবের মনোভাব আঁচ করে নিয়েই গোলাপীকে টোপ ফেলে কার্যসিদ্ধি করে চলেছে। বড় সাহেবও এ সুযোগ অবহেলা করে না। সে কক্ষমধ্যে বসে সব কথাই শুনতে পাচ্ছিলো। তার মনে একটা লোভাতুর ভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল বারবার, যেমন ভাজা মাছের গন্ধে বিড়াল মামার অবস্থা হয় ঠিক তেমনি।
ওদিকে গোলাপীকে নিয়ে তখন শাশুড়ি আর শ্বশুর মিলে টানা–হেঁচড়া শুরু হয়ে গেছে।
ঘর থেকে উঠানে নামিয়ে আনা হয়েছে গোলাপীকে।
ইকরাম আলী বললো– আজ যদি আমাদের কথা না শোন, তাহলে কালকেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।
গোলাপী তখনও বলে চলেছে– না না, আমাকে এত রাতে ও ঘরে নিয়ে যাবেন না আপনারা — নিয়ে যাবেন না, নিয়ে যাবেন না–
গোলাপীর কাতর কণ্ঠে বিচলিত হয় না ইকরাম দম্পত্তি। তারা জোরপূর্বক পুত্রবধূকে নিয়ে হাজির হয় বৈঠকখানার দরজায়।
বড় সাহেব তখন দরজার আড়ালে ওৎ পেতে দাঁড়িয়ে আছে মুখখানা হুতুম পেঁচার মত গম্ভীর করে। বুকের মধ্যে সুড়সুড়ি ভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। মনের ভাবকে সে অনেক কষ্টে দমন করে আসছে যেন।
নরশয়তান ইকরাম আলী ততক্ষণে গোলাপীকে নিয়ে এসে হাজির হলো বৈঠকখানার দরজায়। প্রায় একরকম ধাক্কা দিয়েই ওকে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে দরজার শিকল টেনে দিল সে। বড় সাহেব খপ করে ধরে ফেলেন গোলাপীর একখানা হাত— যেমন করে শিকারী বিড়াল ইঁদুরছানাকে ধরে ফেলে তেমনি করে।
গোলাপী তখন একেবারে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। তার কণ্ঠ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। শুধু থরথর করে সে কাঁপছে। বড় সাহেব গোলাপীর হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেন বিছানার দিকে। তার মুখে একটা কুৎসিত লালসাপূর্ণ হাসির আভাস ফুটে উঠেছে।
গোলাপীকে বিছানার পাশে নিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরলো বড় সাহেব।
অসহায় কণ্ঠে বললো, গোলাপী– খোদা আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও—
বড় সাহেব বললো– আমি বাঘ না ভল্লুক তাই ভয় পাচ্ছো সুন্দরী? এসো, আমার বাহুবন্ধনে এসো।
না না, আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও– খোদা, হে খোদা, আমাকে বাঁচাও—
