গাড়ি দুটো চলেছে।
চাল আর ধানের বস্তার আড়ালে ক্ষুদ্ধ শার্দুলের মত বসে আছে ক’জন নরপশু, যেমন ওৎ পেতে থাকে বন্যশূকর ঠিক তেমনি করে।
ওদিকে মোখলেছুর দলবল নিয়ে অপেক্ষা করছে একটি ঝোঁপের আড়ালে। গাড়ির শব্দ তাদের কর্ণগোচর হচ্ছে। মোখলেছুর রাজুকে লক্ষ্য করে বললো– রাজু, আমি গাড়ির চাকায় গুলী করব, তুই ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ির সম্মুখে পথ রোধ করে দাঁড়াবি, সাথে সাথে আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বো।
রাজু বললো– তোমাকে বলতে হবে না মোখলেছুর ভাই, আমি কিছুতেই গাড়ি দুটো এগুতে দেব না।
বললো মোখলেছুর সাবাস, তাই চাই রাজু।
কর্তব্যপরায়ণ নিষ্ঠাবান যুবক রাজুর চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলে উঠলো যেন।
গাড়ি দুটো তীব্র আলো ছড়িয়ে এগিয়ে আসছে।
ঐ তো আর বেশি দূরে নেই, এই এসে পড়লো বলে। যেমনি প্রথম গাড়ি লক্ষ্যের মধ্যে এসেছে, অমনি মোখলেছুরের রাইফেল গর্জে উঠলো, সাথে সাথে পরপর আরও কয়েকটা। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িখানার চাকা ফেঁসে গেল।
রাজু ততক্ষণে সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
মোখলেছুরের দল জানতো না চাল আর ধানের বস্তার আড়ালে অস্ত্র নিয়ে ওৎ পেতে বসে আছে কয়েকজন নর শয়তান।
দু’তরফ থেকে গুলী বিনিময় শুরু হলো।
শের আলীর গুলী গিয়ে বিদ্ধ হলো রাজুর বুকে।
একটা আর্তনাদ নিকষ অন্ধকারের বুক চিরে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে।
কেঁপে উঠলো মোখলেছুর ও তার দলবলের হৃদয়–এ যে রাজুর কণ্ঠস্বর! সবাই গাড়ির সম্মুখে ছুটলো, গাড়ির আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেল রক্তাক্ত দেহে মাটিতে পড়ে আছে রাজু।
ছেলেরা ভুলে গেল সব কথা, তারা রাজুর রক্তাক্ত দেহের পাশে এসে ঝুঁকে পড়লো।
ইকরাম আলী একদল লাঠিয়াল সহ পথের ধারে পোপনে লুকিয়েছিল, সে লাঠিয়ালদের নির্দেশ। দিল সবাইকে লাঠিপেটা করতে—
মোখলেছুরের দল প্রস্তুত ছিল না, তারা বন্ধুর মৃত্যুর দৃশ্য সহ্য করতে পারছিল না। এমন সময় লাঠিয়ালদের লাঠির আঘাত এসে পড়লো। রাজু ও আরও একজন নিহত হলো, আর সবাই আহত অবশিষ্টগুলো হলো বন্দী।
পরদিন ইকরাম আলী পুলিশ বাহিনীকে ডেকে সবাইকে তুলে দিল তাদের হাতে। পুলিশ মহলকে সে জানালো, চাল ও ধান বোঝাই গাড়িতে হানা দেয়ার জন্য দুষ্কৃতিকারীদের, তাদের লাঠিয়াল পাকড়াও করেছে এবং দু’জনকে তারা নিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
পুলিশ মহল মোখলেছুরের দলকে গ্রেফতার করে নিয়ে চলে গেল।
পরদিন সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রচার হলো– হাজরা গ্রামে ডাকাতির দায়ে পাঁচ জন যুবক গ্রেফতার এবং দুজন গ্রামবাসী লাঠির আঘাতে নিহত। ডাকাতদলের নেতা মোখলেছুরকেও পুলিশ বাহিনী গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
বনহুরের কানে গিয়ে পৌঁছে সংবাদটা।
এ সংবাদে বনহুর স্থির থাকতে পারল না, সে তখনই রহমানকে ডেকে বলে– রহমান, আমি জানতে পারলাম হাজরা গ্রামে নানা রকম অন্যায় অনাচার চরমে উঠেছে। আমকে দু’একদিনের মধ্যেই হাজরা অভিমুখে রওনা দিতে হবে।
সর্দার, আপনি কালাই চৌধুরী বাড়ি গিয়েছিলেন?
সময় করে উঠতে পারিনি, হিন্দল থেকে ফিরে যাবো মনে করেছিলাম, কিন্তু–
সর্দার, আমি গিয়েছিলাম বৌরাণীর শরীর ভাল নয়, নূর বিদেশ যাওয়ার পর থেকে তার মনের অবস্থা খুব খারাপ।
যাওয়া নিতান্ত দরকার তবু পারছি না, কারণ হাজরায় আমার যেতেই হবে। রহমান, তাজকে প্রস্তুত কর, আমি আজই রওনা দেব। বনহুর কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়ালো, রহমান তাকিয়ে দেখলো সর্দারে মুখমণ্ডল কঠিন আকার ধারণ করেছে।
রহমান ঐ মুহূর্তে কিছু বলার সাহস পেল না, সে কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
বনহুর সিগারেট ধরালো, পায়চারী করতে করতে সিগারেট থেকে ধূয়া নির্গত করে চললো। একটা গভীর দুশ্চিন্তার ছায়া ফুটে উঠলে তার মুখমণ্ডলে।
কিছু পরে ফিরে এলো রহমান সর্দার তাজ প্রস্তুত।
বনহুর সিগারেটটা দূরে নিক্ষেপ করে ফিরে তাকালো রহমানের দিকে রহমান, তুমিও দুলকীকে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে নাও, তোমাকেও যেতে হবে আমার সঙ্গে।
রহমান বললো– আচ্ছা সর্দার।
রহমান বেরিয়ে যেতেই কক্ষে প্রবেশ করে নূরী– কোথায় যাচ্ছো অসময়ে?
অসময় কাকে বলে নূরী?
এই তো সবে হিন্দল থেকে ফিরে এলে– দু’একটা দিন বিশ্রাম করবে না?
বিশ্রাম! বিশ্রাম যে আমার জন্য নয় নূরী, এ কথা তুমি তো জান।
হাজরায় এত জরুরি যাবার কি প্রয়োজন শুনি?
তুমি বুঝবে না নুরী, ফিরে এসে সব বলবো।
বনহুর কথাটা বলে তৈরি হয়ে নেবার জন্য পাশের কক্ষে চলে গেল।
*
শহর থেকে বড় সাহেব এসেছেন, তার হাতেই আমার সবকিছু মান–সম্মান ইজ্জত। তিনি যা বলবেন তাই হবে। এই যে মালামাল আসছে– সব ঐ মহান ব্যক্তির দয়ায়, বুঝলে হাবলুর মা? কথাগুলো চাপাস্বরে বললো ইকরাম আলী স্ত্রীর কাছে।
হাবলুর মা পান সাজছিল, সে এক খিলি পান স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে বললো– তাই বলে তুমি নিজের ছেলের বৌকে–
চুপ কর– ছেলের বৌ! ছেলেই তোমার হাবা–কালা–বোবা–বৌকে নিয়ে ও সংসার করেছে কোনদিন? গোলাপী আছে আমার বাড়িতে ঝি চাকরের মত।
তুমি কি বলছো?
বলছি খাওয়া–দাওয়া হয়েই গেছে। উনি বিশ্রাম করছেন, গোলাপী পান নিয়ে যাক ঐ ঘরে। বড় সাহেব সৌখিন মানুষ, গোলাপীকে সেদিন দেখেছিল একজন, বড় পছন্দ হয়েছে ওকে।
কি জানি আমার কিন্তু ওসব ভাল লাগে না।
তোমার তা লাগবে কেন? যত মাথা ব্যথা আমার। জান হাবলুর মা, এত বিষয় সম্পত্তি আমার কি করে হলোর শহরের বড় সাহেবদের দয়ায়, বুঝলে? সেই মহান ব্যক্তিরা যদি আমার বাড়ি থেকে বিমুখ হয়ে চলে যান তাহলে– যাও গোলাপীকে চুল আঁচড়ে একখানা পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দাও, তারপর রেকাবিতে কয়েক খিলি পানসহ বড় সাহেবের ঘরে পাঠিয়ে দাও।
