এই তো আমি এসেছি মোখলেছুর, তোদের হয়েছে।
হাঁ, আমরা তৈরি। বললো মোখলেছুর।
সাতজন ওরা সবাই জমকালো পোশাকে তৈরি হয়ে নিয়েছে, সবার হাতেই এক একটা আগ্নেয়াস্ত্র।
এমন সময় শিরিন ট্রের উপর কতগুলো কাপ এবং একটি টি পটে গরম চা নিয়ে হাজির হলো। তার পিছনে জাহানারা, তার হাতে কিছু গরম সিঙ্গারা।
শিরিন বললো– নাও, তোমরা গরম চা খেয়ে নাও, তারপর যেখানে খুশি যাও।
জাহানারা সিঙ্গারার প্লেটখানা সবার সামনে বাড়িয়ে ধরলো নাও, নিজের হাতে তৈরি করে এনেছি।
মোখলেছুর একটা সিঙ্গারা তুলে নিল, সঙ্গে সঙ্গে সবাই তুলে নিল এক একটা সিঙ্গারা, তারপর খেতে শুরু করলো।
এমন সময় শমসের আলী এলো সেখানে।
ছেলেদের পরনে জমকালো পোশাক দেখে এবং তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে চমকে উঠলো সে। শমসের আলী এসেছিল সমিতি প্রাঙ্গনে। তার গরুটা গোয়াল থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিল এদিকে। শমসের আলী তাই গরু ধরতে এসেছিল, এসে দেখে সমিতির কক্ষের দরজা খোেলা, তাই সে পা পা করে সমিতি কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে অবাক হয়ে যায় ছেলেদের অদ্ভুত ড্রেসে সজ্জিত অবস্থা দেখে।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো শমসের আলী– একি, তোমরা এমনভাবে প্রস্তুত কেন?
মোখলেছুর বললো— অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে যাচ্ছে। দোয়া কর শমসের ভাই, যেন। ট্রাক ভর্তি চাল ছিনিয়ে নিতে পারি এবং বিলিয়ে দিতে পারি দুঃস্থ জনগণের মধ্যে।
মোখলেছুরের কথায় শিউরে উঠে শমসের আলী, বলে– না না, ও কাজে তোমরা যেও না ভাই, আমি তোমাদের নিষেধ করছি।
না, কোন বাধাই আজ আমরা শুনবো না শমসের ভাই। আমরা কিছুতেই দেশের সম্পদ বাইরে যেতে দেব না। আমরা ছিনিয়ে নেবোই–
কিন্তু এমনভাবে ছিনিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।
কেন উচিত হবে না? আমরা বারবার ইকরাম আলীকে ও তার দলবলকে সাবধান করে দিয়েছি তবু তারা অন্যায় করে যাচ্ছে। দেশে এত শস্য উৎপন্ন হয়েও দেশের মানুষ যদি অনাহারে মরে, তা কিছুতেই আমরা বরদাস্ত করব না।
তা তো বুঝি কিন্তু তোমরা কি পারবে ঐ নরপশুদের সঙ্গে? ওরাই যে গ্রামের শাসনকর্তা। ওদের কথায় সবাই ওঠে বসে– সব কাজ করে।
তা হতে দেব না। ওরা যদি অন্যায় কাজ করে আমরা নীরবে সহ্য করব? শমসের তাই, তোমরা চিরদিন মুখ বুজে সহ্য করেছ আর নয়, আমরা অন্যায় সহ্য করব না, করব না– টেবিলে মুষ্ঠাঘাত করে ঠাণ্ডা।
মোখলেছুর বলে উঠে যতই তোমরা মুখ বুজে সহ্য করে এসেছে ততই ওরা তোমাদের নেড়ে মাথায় বেল ভেঙে খেয়েছে।
শমসের আলী সরল সোজা মানুষ, সে বলে উঠে– ওরা যা করে সরকারের নির্দেশমত করে। দোষ ওদের নেই, বুঝলে ভাই?
দেখো শমসের ভাই, তোমাদের বয়স হয়েছে, তোমরা আমাদের চেয়ে ভাল বোঝো মানি, কিন্তু। তোমরা নীরবে অন্যায় হজম করতেও জান। সরকারের দোহাই দিয়ে কেউ অন্যায় করুক, এটা আমরা সহ্য করব না। তুমি যাও, নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও গে মোখলেছুর শমসের আলীকে বিদায় করে দেয়।
এখানে যখন সমিতির গোপন এক কক্ষে যুবক ছেলেরা চোরামালবাহী ট্রাক ছিনিয়ে নেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, তখন ইকরাম আলীর শয়নকক্ষে হবি মোল্লা সহ আরও দু’জন রাইফেলে গুলী ভরে নিচ্ছিল।
ইকরাম আলী বললো– হবি, তুমি যা বললে সব সত্যি তো?
একেবারে খাঁটি সত্য, আমি নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি–ট্রাক যখন হিজলা সড়ক হয়ে সীমান্তের ওপারে যাবার জন্য এগুবে তখন ট্রাকগুলো আটক করে সব মালামাল ছিনিয়ে নেবে।
আমি জীবিত থাকতে এ হতে দেব না। হবি, রমজান, শের আলী, তোমরা তৈরি আছো?
জি হাঁ, আমরা তৈরি। বললো শের আলী।
ইকরাম আলী বললো– দুষ্কৃতিকারীদের কেমন করে শায়েস্তা করতে হয় আমার জানা আছে। গ্রামের শিক্ষিত ছেলে হয়ে তারা এসেছে আমাদের বিরুদ্ধে লড়তে। শের আলী?
বলুন জনাব?
তোমাদের রাইফেলের গুলী যেন ব্যর্থ না হয়, ওদের মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়া চাই।
জনাব, হাত আমাদের পাকা আছে।
বারবার ওদের বাপদের সাবধান করে দিয়েছি, তবু ছেলেগুলোকে সৎপথে আনতে পারল না। এবার বোঝাবো কেমন মজাটা! আমারই জমিতে বাস করে, আমারই জমি চাষ করে, আমারই কাজে বাধা– দাতে দাঁত পিষে বলে ইকরাম আলী।
হবি মোল্লা বলে উঠে– আর দেরী করা উচিত হবে না।
ইকরাম আলী বলে– নাও, আমার বন্দুকটা তুমি নাও হবি। যাও, এখন ট্রাকগুলো ছাড়বে। ওগুলো হাটের পথে বটতলায় অপেক্ষা করছে। শোন, ট্রাকের মধ্যে তোমরা গোপনে লুকিয়ে থাকবে, আমি হিজলা সড়কে লাঠিয়ালদের নিয়ে লুকিয়ে থাকবো, সময়মত হাজির হব, বুঝলে?
বুঝেছি। বললো হবি মোল্লা।
ওরা বেরিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে।
ঘাটের পাশে বটতলায় দাঁড়িয়েছিল চাল আর ধান বোঝাই দুটি ট্রাক। ইকরাম আলীর লোক বন্দুক আর রাইফেল নিয়ে ট্রাকের ভিতরে চাল আর ধানের বস্তার ফাঁকে লুকিয়ে পড়লো।
ট্রাকের ড্রাইভার এতক্ষণ প্রস্তুত হয়েই বসেছিল। ওরা উঠে বসতেই ট্রাক ছাড়লো।
আজ নতুন নয়, এ পথে প্রায়ই ধান এবং চাল বোঝাই ট্রাক নিয়ে এরা যাওয়া–আসা করে। কোনদিন কেউ বাধা দেয় না। সেবার নৌকায় ডাকাত পড়েছিল, ডাকাতরা নিজে কিছু নেয়নি, তবে সব বিলিয়ে দিতে বাধ্য করেছিল। তারপর আর তেমন কিছু ঘটেনি। ড্রাইভারগণ তাই চরম সাহসী হয়ে উঠেছে। চোরা মাল বনহকারী ট্রাকের ড্রাইভার হওয়া চরম ভাগ্যের কথা, মোটা অর্থ উপার্জন হয়। কাজেই ড্রাইভারগণ বেশ পাকা বলেই মনে হলো।
