কিন্তু–
জানি তুমি চলে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তবু আমার অনুরোধ রাখবে না?
তোমার অনুরোধ না রেখে আমি পারি বনহুর?
বলো?
শাপলাকে আমি নিজের কাছে রাখবো।
বেশ তো, তাই রেখো।
আমি ওকে নিয়ে যেতে চাই সঙ্গে করে, যদি অনুমতি দাও তবে কালই চলে যাবো।
সে কি, হিন্দল তোমার ভাল লাগছে না?
যেখানে তুমি নেই সেখানে আমার একটু মন টিকে না। বিশ্বাস কর বনহুর, এই দিনগুলো যে আমার কেমন করে কেটেছে আমি নিজেই জানি না। সব সময় শাপলাকে নিয়ে তোমার কথা ভুলে। থাকতে চেয়েছি, তবুও– একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আশার বুক চিরে।
বনহুর গম্ভীর হয়ে পড়েছে, সে নতদৃষ্টি তুলে তাকায় একবার আশার মুখের দিকে।
আশা কিছু না বলে বেরিয়ে যায়।
বনহুর সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে। কতগুলো এলোমেলো চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আশা যে কথাগুলো এখন বলে গেল, সে কথাগুলো বেশি করে আলোড়ন সৃষ্টি করে তার মনে— বিশ্বাস কর বনহুর, এ দিনগুলো যে আমার কেমন করে কেটেছে, আমি নিজেই জানি না। সব সময় শাপলাকে নিয়ে তোমার কথা ভুলে থাকতে চেয়েছি, তবুও– আশার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি হতে থাকে তার কানের কাছে।
বনহুর একটির পর একটি সিগারেট নিঃশেষ করে চলে। শুধু আশাই নয়, ভেসে উঠে কয়েকটা নারীমুখ তার মনের পর্দায় যারা তাকে মনে প্রাণে ভালবেসেছিল কিন্তু প্রতিদানে সে তাদের কিছু দিতে পারেনি। কয়েকটি মুখ হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে, যেমন সিন্ধিরাণী সাগরতলে তাকে রক্ষা করেছিল নানাভাবে, ভালবেসেছিল সে মনপ্রাণ দিয়ে কিন্তু বনহুর প্রতিদানে তাকে ভালবাসা দিতে পারেনি। নিজের জীবন দিয়ে সিন্ধিরাণী তাকে রক্ষা করেছিল অজ্ঞাত শত্রুর কবল থেকে। মনে পড়ে লুসীর কথা, সে নিজের সতীত্ব বিলিয়ে দিয়ে তার জীবন বাঁচিয়েছিল, সেই লুসীকেও বনহুর হারিয়েছে, সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে লুসী চিরতরে। মনে পড়ে জংলীরাণীর মুখখানা ফুলের মতই নিষ্পাপ ছিল সে, ভালবেসেছিল জংলীরাণী তাকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে, যে ভালবাসায় ছিল না কোন কলুষতা, সেই জংলীরাণীকেও বনহুর রক্ষা করতে পারেনি, চোরাবালি তাকে গ্রাস করেছে–
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কক্ষে প্রবেশ করে লিয়াংলিচু, কুর্ণিশ জানিয়ে বলে সে– সর্দার।
বলো?
আশা দিদি চলে যাচ্ছে।
সেকি!
হাঁ, সে বলছে আজই সে চলে যাবে।
আচ্ছা যেতে দাও।
কিন্তু—
বল।
রহস্যময়ী নারীর কি হবে, তাকে আমরা তো সামলাতে পারবো না।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি, চলো। বনহুর উঠে দাঁড়ায়। লিয়াং একপাশে সরে দাঁড়ায়।
বনহুর হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেটখানা মেঝেতে ফেলে বুট দিয়ে পিষে ফেলে, তারপর বেরিয়ে যায়।
আশা তার নিজ কক্ষে কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিচ্ছিলো, মুখমণ্ডল গম্ভীর, আষাঢ়ে আকাশের মত থমথমে।
বনহুর প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
ভারী বুটের শব্দে আশা বুঝতে পারল কক্ষে কে এসেছে, তাই সে মুখটা আরও নিচু করে নিল।
বনহুর ওর পাশে দাঁড়ালো, বললো সে– আশা, চলে যাচ্ছো?
আশা বললো–হা।
আরও কিছুদিন থেকে গেলে হয় না?
না।
শাপলাকে ছেড়ে যাবে?
আশা নীরব রইল।
বনহুর বললো তুমি চলে গেলে শাপলা আবার অমানুষ হয়ে পড়বে। আর কিছুদিন থেকে যাও আশা! শাপলাকে তার পিতার হাতে তুলে দেবার মত অবস্থা করে দাও! তুমি ছাড়া ওকে কেউ আর আয়ত্বে আনতে পারবে না–
না, আর আমি পারবো না।
কেন? অভিমান করছো আমার উপর।
তুমি আমার কে তাই তোমার উপর অভিমান করব? আমি অভিমান করিনি–
হেসে বললো বনহুর– যদি সত্যিই অভিমান না করে থাকো তবে আর কিছুদিন থেকে যাও আশা। একি, তুমি কাদছো? বনহুর আশার চিবুকটা উঁচু করে ধরে। আশা, তোমার চোখে পানি দেখবো এটা আমি আশা করিনি। তুমি অন্যান্য নারীর মত নও, এই আমি জানি। আশা, কথা দাও শাপলা যতদিন সম্পূর্ণ সভ্য না হবে ততদিন তুমি যাবে না? বলল, আমার এ অনুরোধটা রাখবে? কথা দাও আশা?
আশার গণ্ড বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
বললো– বেশ কথা দিলাম কিন্তু—
বলো, থামলে কেন?
কিন্তু কথা দাও তুমি আবার আসবে বলে আশা বনহুরের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে।
বনহুর বলে– যদি খুশি হও আসবো। আশা, শাপলাকে সভ্য মানুষ তৈরি করেছ, এজন্য,আমি যে কত আনন্দ পাচ্ছি, তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না।
তোমার আনন্দই আমার জীবনের কামনা। বনহুর, তুমি খুশি হও আমি এই চাই—
আশা!
বলো?
বড় অভিশপ্ত জীবন আমার!
না না, ও কথা তুমি বলো না, তোমার জীবন সে তো সুন্দর সার্থক অপূর্ব জীবন– তুমি সবার কামনার বস্তু।
আশা!
হাঁ বনহুর, তুমি সবার স্বপ্নের জন, কামনার জন, সাধনার ব্যক্তি। আশা বেরিয়ে যায় সেই কক্ষ থেকে।
বনহুর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে থ’ হয়ে, তারপর মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে তার ঠোঁটের কোণে।
*
মোখলেছুর ভাই, ওরা চাল বোঝাই ট্রাক নিয়ে রাতের অন্ধকারে হিজলা সড়ক ধরে সীমান্তের ওপারে চলে যাবে। কাল সমস্ত দিন ধরে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে চাল এবং ধান কিনেছে। কথাগুলো বলে থামলো ঠাণ্ডা।
মোখলেছুর কোমরে বেল্ট বাঁধতে বাধতে বললো আমরা প্রস্তুত আছি। শিগগির শাজাহানকে ডেকে আনো ঠাণ্ডা। আমরা কিছুতেই এ মালামাল সীমান্তের ওপারে যেতে দেব না।
শাজাহান ভাই এসে গেছে।
