বৃদ্ধ তখন যত্ন সহকারে জেকীর হাড়গুলো পুঁটলি করে বাঁধছে।
বনহুর বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেয় এবং তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় আস্তানায়। অবশ্য আস্তানায় নিয়ে যাবার সময় ভালভাবে চোখ পট্টি বেঁধে নেয়।
*
আশার আনন্দ ধরে না, রহস্যময়ী এখন অনেকটা সভ্য হয়েছে। সে কাপড় পরতে শিখেছে, এখন সে আর উলঙ্গ থাকে না। চুল আঁচড়াতে শিখেছে, এমনকি খোঁপা বাঁধতে শিখেছে। কথা স্পষ্ট বলতে না পারলেও একটু একটু বলতে শিখেছে।
রোজ আশা ওকে নিয়ে ঝর্ণার ধারে যায়। ঝর্ণার সচ্ছপানিতে ওকে নিয়ে সাঁতার কাটে। আশা রহস্যময়ীর নাম দিয়েছে শাপলা। ওকে শাপলা বলে ডাকলে খুব খুশি হয় ও।
আশা যখন ওকে নিয়ে আস্তানার বাইরে যায় তখন ওর দেহে কালো আবরণ থাকে। অবশ্য আশা নিজেও কালো আবরণে দেহ আচ্ছাদিত করে নেয়। ওকে শহরে নিয়ে যায় আশা–সভ্য মানুষের কার্যকলাপ কেমন শিখাবার চেষ্টা করে সে ওকে।
যানবাহন দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যায় শাপলা, গাড়িতে বসে আশাকে আঁকড়ে ধরে সে।
আশা ওকে কাছে টেনে নিয়ে পিঠ চাপড়ে অভয় দেয়।
আজকাল শাপলা সব সময় আশার কাছে কাছে থাকে, এক মুহূর্ত দূরে সরে যায় না। আশা ওকে নিয়ে খেতে বসে, ওকে নিয়েই বেড়ায়, ওকে নিয়েই ঘুমায়।
সেদিন সকাল বেলা আশা রহস্যময়ী শাপলাকে নিয়ে ঝর্ণার সচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটছিল, এমন সময় অশ্বপৃষ্ঠে বনহুর দাঁড়ায় সেখানে। অবশ্য ইচ্ছা করেই বনহুর অশ্বের গতিরোধ করে ফেলে। দেখতে পায় দুটি নারী ঝর্ণার পানিতে সাঁতার কাটছে।
প্রথমেই বনহুর চিনতে পারে আশাকে কিন্তু তার সঙ্গীটিকে চিনতে পারে না।
বনহুর চলে আসে আস্তানায়।
হিন্দল আস্তানা এটা।
অনুচরগণ সর্দারকে কুর্ণিশ জানায়।
রামসিং এসে দাঁড়ালো–সর্দার!
বনহুর অশ্ব–বলগা রামসিংয়ের হাতে দিয়ে বললো–সংবাদ কি রামসিং?
ততক্ষণে অপর একজন অনুচর রামসিংয়ের হাত থেকে তাজের লাগাম গ্রহণ করেছে।
রামসিং বললো–সর্দার, রহস্যময়ী এখন অনেকটা সভ্য হয়ে এসেছে।
কথাটা শুনে বনহুর খুশি হলো, একটা বিরাট দুশ্চিন্তা ছিল তার মনে, না জানি রহস্যময়ী এখন কেমন আছে। আমার চেষ্টা সফল হবে কিনা সন্দেহ ছিলো তার মনে। বললো বনহুর আশা কোথায়?
একজন বললো–রহস্যময়ীকে নিয়ে সে ঝর্ণার ধারে গেছে।
বনহুর আবার বুঝতে পারল ঝর্ণার ধার হয়ে আসবার সময় সে যে দুটি নারীকে স্নান করতে দেখলো ওরা একজন আশা, অপরজন রহস্যময়ী। উচ্ছল হয়ে উঠলো বনহুরের মন, মস্তবড় একটা সমস্যার যেন সমাধান হয়েছে।
বনহুরের ইচ্ছা হলো ছুটে গিয়ে আশাকে ধন্যবাদ জানায় কিন্তু ঝর্ণার ধারে ওরা এখন মানে মত্ত, কাজেই যাওয়া তার উচিত হবে না।
বনহুর বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করলো।
অল্পক্ষণ পরই আশা এলো সেখানে, সঙ্গে তার এক রমণী। আশা বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো আমার সঙ্গিনীটিকে চিনতে পারছো বনহুরা।
বনহুর তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো রমনীর দিকে।
পিছনের রমণী রহস্যময়ী। সে বনহুরকে দেখামাত্র জড়োসড়ো হয়ে আশার পিছনে লুকিয়ে পড়লো।
বনহুর হেসে বললো– আশা, কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব ভেবে পাচ্ছি না। আমি ভাবতেও পারিনি ওকে এমন অবস্থায় দেখতে পাবো।
আশা বললো তোমার আশীর্বাদ আমাকে জয়ী করেছে বনহুর। আমি নিজেও ভাবতে পারিনি বানরী কন্যাকে মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারবো। জান বনহুর, রহস্যময়ী এখন শাপলা হয়েছে।
শাপলা!
হাঁ।
বড় সুন্দর নাম দিয়েছে ওর। সত্যি শাপলাই বটে। আশা, ও আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে বুঝি?
হাঁ, শুধু তোমাকে কেন, যে কোন পুরুষ দেখলেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ও হয়তো মনে করে আবার তোমরা ওর গলায় ফাঁস পরাবে।
বনহুর হেসে বললো–ঠি তাই হবে। আচ্ছা আশা, ওকে কি করে এত অল্প সময়ে এমন সত্য বানালে? ঠিক তোমার মতই কাপড় পরেছে। সুন্দর করে চুল আঁচড়ে নিয়েছে— সবই তো সুন্দর দেখছি। কথা বলতে শিখেছে কিছু।
কিছু কিছু তবে আরও সময় লাগবে।
আশা, একটি শুভ সংবাদ এনেছি।
কি সংবাদ
রহস্যময়ী, মানে তোমার শাপলার বাবার সংবাদ। আমি তাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি।
শাপলার বাবা!
হাঁ, সব তোমাকে বলবো। শাপলার বাবা আমার কান্দাই আস্তানায় আছে। ইচ্ছা করলে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতাম কিন্তু আনিনি, কারণ সে পাগল প্রায়। তার কন্যা শাপলার সন্ধান করতে করতে সে পাগল হয়ে গেছে। আমি তাকে কথা দিয়েছি তার কন্যাকে তার হাতে তুলে দেব। তাই হিন্দল ছুটে এলাম রহস্যময়ীকে দেখতে। তার পিতাকে সে ফিরে পেলে হত্যা করে বসবে না তো?
না, রহস্যময়ী এখন আর রাক্ষসী নেই, মানবীতে রূপ নিয়েছে।
রহস্যময়ী বনহুর আর আশার কথাবার্তা সব শুনতে পাচ্ছিলো তবে বুঝতে পারছিল না কিছু।
হাজার হলেও সে নারী, তাই নারীসুলভ লজ্জা ছিল তার মধ্যে। বারবার সে তাকাচ্ছিলো লজ্জাভরা দৃষ্টি নিয়ে বনহুরের দিকে।
বনহুর ওর নাম ধরে ডাকলো– শাপলা! এসো, এসো আমার কাছে– আশা ওকে ধরে রাখতে পারল না।
বনহুর বললো– আশা, ওর বাবা বৃদ্ধ এবং পাগলপ্রায়, তাই আমি তাকে সঙ্গে আনিনি। রহস্যময়ী যখন বুঝতে শিখবে বাবা–মা কে হয় তখন আমি তাকে নিয়ে আসবো।
হাঁ, তাই এনো। এখন ও তার বাবার পরিচয় পেলেও বুঝবে না কিছু।
আশা, তোমাকে আরও কিছুদিন কষ্ট করতে হবে, তোমাকে থাকতে হবে হিন্দল ঘাটিতেই।
