না।
তবে?
যে আমার জেকীর কন্যাকে সেই বানরীর কাছ থেকে উদ্ধার করে দেবে, তাকে।
সত্যি তাকে তুমি খুঁজছো?
হাঁ বাবা।
এখনও তার কথা তোমার মনে আছে?
আছে। আমার জেকীর মেয়ে, তাকে আমি কি ভুলতে পারি।
সে আজ কতদিনের কথা ঠিক বলতে পার?
পারি।
তবে বল কতদিন আগে জেকীসহ তুমি সেই পর্বতমালার পাদমূলে গিয়ে পৌঁছেছিলে?
বৃদ্ধ চুপ থেকে ভাবলো কিছুক্ষণ, তারপর আংগুলে বিড় বিড় করে কি গুণলো, তারপর হঠাৎ বলে উঠলো–ঠিক মনে পড়েছে, সেই দিন ছিল রবিবার, যেদিন আমার জাহাজ ডুবি হয়……১৯৫১ সালে।
বলো কি বাবা, ২৫ বৎসর আগের কথা?
হাঁ, কিন্তু আমার মনে হয় এই তো সে দিনের কাহিনী।
এর মধ্যে তুমি আর কোনদিন যাওনি সেই পর্বতমালায়? বনহুর প্রশ্ন করলো ওকে।
বৃদ্ধ বললো–গিয়েছিলাম, জেকীর অনুরোধে।
সেকি, জেকী তো মরে গেছে বললে?
না মরেনি, এতক্ষণ মিথ্যা কথা বলছিলাম।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো বনহুর–তোমার স্ত্রী জীবিত আছে।
হাঁ, ফিরে আসার সময় আমার জেকীকে আমি সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।
সত্যি?
হাঁ সত্যি। জান মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস আমার নেই, ছিলও না কোনদিন।
তবে যে এতক্ষণ মিথ্যা বলছিলে?
বললাম তো মিথ্যা বলার অভ্যাস আমার নেই। জেকীকে সেই পর্বতমালার পাদমূলে ছেড়ে আসবো, এমন কথা তুমি ভাবতে পারলে? যে জেকী আমাকে এক মুহূর্ত না দেখলে থাকতে পারে না, আমি তাকে ছেড়ে আসবে সেখানে একা রেখে? ঠিক তুমি পাগল–পাগল না হলে এমন কথা বলো!
বনহুর ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো–তোমার জেকী জীবিত আছে?
হা–হা আছে। আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারি না, ও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারে না।
কোথায় তাকে রেখে এসেছ?
হঠাৎ বৃদ্ধ হাঃ হাঃ হাঃ করে ভীষণভাবে হেসে উঠলো, তারপর বললো–সে আমার সঙ্গেই আছে……
সঙ্গে আছে! বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো বনহুর।
বৃদ্ধ বললো–দেখবে তাকে।
এ তুমি কি বলছো।
জেকী বড় অভিমানিনী, তাই ওকে সঙ্গেই রাখি। যদি কোনদিন ভুল করে রেখে আসি তাহলে আমার নিস্তার নেই। সমস্ত দিন সে আমার সঙ্গে কথাই বলবে না…
তাই নাকি, কিন্তু কোথায় সে।
এই তো আমার কাছে…একটা পুঁটলি ওর পিঠে বাধা আছে এতক্ষণ লক্ষ্য করেনি বনহুর। এবার লক্ষ্য করলো সে, পুঁটলিটা বৃদ্ধ খুলে নিল পিঠ থেকে, তারপর পুঁটলির গিট খুলে ফেললো।
বনহুরের চক্ষুস্থির–বৃদ্ধের পুটলির মধ্যে একগাদা কঙ্কাল–মানুষের কঙ্কাল।
অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর–একি!
বৃদ্ধ হেসে কঙ্কালের গাদার উপর সস্নেহের হাত বুলিয়ে বললো–এই তো আমার জেকী, আমার প্রিয়তমা, আমার স্ত্রী….ওকে কি আমি ছেড়ে থাকতে পারি।
বনহুর হতবাক হয়ে যায়, কোন কথা বের হচ্ছে না তার মুখ দিয়ে, নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত তাকিয়ে আছে সে ঐ হাড়গুলোর দিকে। বনহুরের চোখের সম্মুখে জীবন্ত হয়ে উঠে একটি নারীমুখ–সে ঐ জেকী …একটি ভাসমান লাইফবয়ে চেপে ওরা দু’জন এসে নামলো সমুদ্র উপকুলে। স্বামী–স্ত্রী উভয়ে নেমে দাঁড়ালো বালুচরে। স্ত্রীকে ধরে আছে স্বামী, গর্ভবতী স্ত্রীর যেন কোন কষ্ট না হয়। ওরা তাকায়–সম্মুখে সীমাহীন বালুরাশি, পিছনে অথৈ সমুদ্র। দূরে নজর পড়ে, দেখা যায় পর্বতমালার সুউচ্চ রেখা। ওরা অনেক কষ্ট এসে পৌঁছায় পর্বতমালার পাদমূলে! স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়, স্বামী ব্যাকুল হয়ে উঠে। স্ত্রী একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান প্রসব করে। স্বামীর চোখ দুটো আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠলো, ভুলে গেল সে সব ব্যথা–বেদনা কষ্ট। কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে স্বামী–কত আশা–আকাক্ষা জাগে তার মনে। স্ত্রী পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ে। স্বামীর কাছে সে নিজের পিপাসার কথা জানায়। পানির সন্ধানে যায় স্বামী কিন্তু ফিরে এসে আর সে স্ত্রীকে জীবিত দেখতে পায় না…স্ত্রীর মৃত স্বামীকে উন্মাদ করে তোলে, কাঁদে সে ডুকরে……কিন্তু কেকী আর চোখ মেলে চায় না….।
দেখছো, আমার স্ত্রীকে দেখছো তুমি? ভারী সুন্দর আমার জেকী, তাই না?
বৃদ্ধের কথায় বনহুরের চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বলে সে–এ্যাঁ, কি বললে?
বললাম আমার স্ত্রী জেকী খুব সুন্দর, তাই না?
হা। ছোট একটা শব্দ বের হয় বনহুরের কণ্ঠ দিয়ে। একটু পর পুনরায় বলে বনহুর–এই দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তুমি তোমার স্ত্রীর কঙ্কাল বহন করে বেড়াচ্ছো?
কঙ্কাল! কিসের কঙ্কাল। একে তুমি তাহলে চিনতে পারনি? আমার জেকী, আমার স্ত্রী…হাঃ হাঃ হাঃ, তুমি পাগল না হলে এমন কথা বলো! জান, জেকী আমার সঙ্গে কথা বলে, হাসে, গান গায়।
সত্যি।
হাঁ সত্যি, আমি তো বলেছি মিথ্যা বলার অভ্যাস আমার নেই।
আচ্ছা বাবা, তুমি যদি তোমার সেই হারানো কন্যাকে ফিরে পাও, বানরীর কাছ থেকে তাকে যদি উদ্ধার করে এনে দিই।
পারবে না, পারবে না– তোমরা কেউ তাকে বানরীর কাছ থেকে আনতে পারবে না। কত লোককে বলেছি, কেউ রাজি হয়নি আমার সন্তানকে এনে দিতে। তুমি পাগল, তাই বলছে পারবে।
আমি বলছি পারবো।
সত্যি পারবে?
হাঁ। কিন্তু সেতো এখন আর সেই ছোট্টটি নেই। এখন সে অনেক বড় হয়েছে,পঁচিশ বছর তার। বয়স হয়েছে। তাকে দেখলে চিনবে কি করে?
ঠিক চিনবো। আমার জেকীর মেয়েকে আমি চিনবো না তো কে চিনবে? আমি ঠিক চিনবে….
বনহুর খুশি হলো–যা হোক রহস্যময়ীর আসল পরিচয় সে জানতে পারল, জানতে পারল কে তার পিতা এবং মাতা।
