প্রদীপ কুমার বন্দীশালার মধ্যে থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেছে। বৃদ্ধ লোকটা কে? আর কেনই বা সে এভাবে এখানে এসেছে? কি এর উদ্দেশ্য?
ততোক্ষণে আওরঙ্গ প্রহরীদ্বয়ের ফেলে দেওয়া অস্ত্রগুলো পা দিয়ে সরিয়ে ফেলে, তারপর বলে উঠে সে-প্রদীপ কুমার, বেরিয়ে আসুন।
বেরিয়ে আসুন আপনি…..
প্রদীপ কুমার অবাক না হয়ে পারে না, কে এই ব্যক্তি যে তার নামটাও জানে। বেরিয়ে আসে প্রদীপ কুমার দ্রুত পদক্ষেপে কারাকক্ষ থেকে।
আওরঙ্গ মুহূর্তের জন্যও নিজের হস্তস্থিত ক্ষুদ্র আগ্নেয় অস্ত্র দুটো নত করে নিল। সে এবার অস্ত্র দুটি জামার পকেটে রেখে নিজের হাতে লৌহ কারাকক্ষের তালা বন্ধ করে ফেললো।
মদন বললো–আওরঙ্গ, তোমার মনে এতো শয়তানি ছিলো…… দাঁতে দাঁত পিষতে থাকে সে।
আওরঙ্গ বললো-চললাম মদন বাবাজী। তারপর প্রদীপ কুমারকে লক্ষ্য করে বললো– আসুন রাজকুমার।
*
মুক্ত আকাশের কুলে এসে দাঁড়ালো আওরঙ্গ আর প্রদীপ কুমার। উপরে আকাশ, নিচে প্রান্তর, সম্মুখে সীমাহীন শূন্যতা। ভোর হয়ে এসেছে, শুকতারা ঝকমক করছে!
প্রদীপ কুমার বেশ হাঁপিয়ে পড়েছিলো, কারণ বহুদিন বন্দী থাকায় তার দেহ দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। সুড়ঙ্গ পথে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে ওরা। আওরঙ্গ বললো–রাজকুমার এবার আপনি বিশ্রাম করুন।
প্রদীপ কুমারের ললাটে ফুটে উঠেছিলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাতের পিঠে ঘাম মুছে ফেললো, তারপর বসে পড়লো সে ঘাসের উপর।
আওরঙ্গও বসলো ওর পাশে।
প্রদীপ কুমার একটু বিশ্রাম করার পর আওরঙ্গকে লক্ষ্য করে বললো–কে তুমি বন্ধু আমাকে এভাবে উদ্ধার করলে? বলো কে তুমি?
আওরঙ্গ একমুখ হেসে বললো–আমি আওরঙ্গ।
না তুমি আওরঙ্গ নও, তুমি……
বলো, থামলে কেন?
তুমি নিশ্চয়ই সেই……
[পরবর্তী বই দস্যুরাণীর কবলে দস্যু বনহুর]
বনহুর বৃদ্ধের মুখমন্ডলে গভীর একটা ব্যথার আভাস দেখতে পেল, বললো–থাক, তোমার কষ্ট হলে বলো না।
বৃদ্ধ বলে উঠলো–না না, বলবো; আমি সব বলবো। শুধু তোমাকে নয়, বহু লোককে বলেছি যদি কেউ আমার মেয়েকে খুঁজে দেয়…জেকীকে কোনদিন আর ফিরে পাবো না, কিন্তু আমার কন্যা সে তো আর মরেনি!
বলো কি, তোমার সন্তান–তোমার সেই শিশুকন্যা মরে যায়নি? সে তাহলে জীবিত আছে।
হাঁ, কি বলছিলাম– এসে দেখলাম জেকী মরে গেছে আর আমার কন্যাটি উধাও হয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো বৃদ্ধ, তারপর আবার সে বলতে শুরু করলো–জেকীকে ঘুমিয়ে রেখে আমি সেই পর্বতমালার পাদমূলে জেকীর সন্ধান করে চললাম। ক্ষুধা–পিপাসার কথা ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম জেকীর কথা। জেকীর চিহ্নস্বরূপ জেকীর কন্যাকে আমি বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলাম। একদিন দু’দিন তিনদিন করে কেটে গেল একটি মাস। জঙ্গল থেকে ফল নিয়ে খেতাম আর সন্ধান করতাম আমাদের কন্যাটির। জান বাবা, একদিন আমি পেয়ে গেলাম আমার কন্যাটিকে।
বলো কি!
হাঁ, অনেক সন্ধান করার পর একদিন আমি অন্যমনস্কভাবে পর্বতমালার ধার ধরে এগিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ নজরে পড়লো একটা বড় বাকা গাছের ডালে বসে আছে এক বানরী….
বনহুরের মুখমন্ডল মুহূর্তে দীপ্ত হয়ে উঠলো, বললো সে–বলল, বলো, তারপর কি দেখলে?
বৃদ্ধ বললো–দেখলাম বানরীর কোলে আমাদের সেই শিশুকন্যা…
তারপর, তারপর কি করলে তুমি?
আমি খুশি হলাম, ভাবলাম জেকী গেছে যাক কিন্তু তার কন্যাটিকে আমি ফিরে পাব…. তারপর হতাশভরা কণ্ঠে বললো–কিন্তু ফিরে আর পেলাম না। বানরী তাকে নিজের কন্যা বানিয়ে নিয়েছে।
আমি সেই পর্বতের পাদমূলে দিনের পর দিন কাটাতে লাগলাম যদি কোনক্রমে বানরী ওকে ছেড়ে দেয় তাহলে আমি ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবো কিন্তু সে আশা আমার বিফল হলো। পুরো একটি বছর ধরে আমি ক্ষুধা পিপাসা বর্জন করে শুধু আমার জেকীর স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ কন্যাটিকে পাবো বলে বানরীর পিছু পিছু ঘুরেছি..বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো বৃদ্ধের কণ্ঠ।
বনহুরের মনে পড়লো এমনি আরও এক বৃদ্ধের কথা। সেও তার কাছে এমনি করে শুনিয়েছিল। বিস্ময়কর এককাহিনী। বনহুর বললো–তুমি কি করতে তারপর।
যখন আমি নিজে বানরীকে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হলাম না, কন্যাকেও ফিরে পেলাম না, তখন নিজে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম স্বদেশের উদ্দেশে পথে নানা বিপদে পড়লাম, বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে রক্ষা পেলাম। তবু ভুলতে পারলাম না জেকীর কন্যাকে। একদিন দেশে এলাম, দেখলাম আমার বাড়িঘর সব নিলাম হয়ে গেছে। আত্নীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব তারা আমাকে চিনেও চিনলো না, তাদের ভয় যদি আমি তাদের ঘাড়ে বোঝা হয়ে বসি। আমি তাদের কাছে শুধু আমার জেকীর কন্যাটিকে উদ্ধারের জন্য বললাম। বললাম, তোমরা আমার সব সম্পত্তি নিয়েছে দুঃখ নেই। তোমরা আমার সঙ্গে চলল, আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবো, তোমরা বানরীর কোল থেকে আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে দাও। জান বাবা, কেউ আমার কথায় কান দেয়নি, সবাই আমাকে পাগল বলে উপহাস করেছে, তাড়িয়ে দিয়েছে দুর দূর করে। ডুকরে কেঁদে উঠলো বৃদ্ধ, তারপর বললো–দেশের লোক যখন আমাকে পাগল বলে তাড়িয়ে দিল তখন আমি আর দেশে রইলাম না। আর কেনই বা থাকবো, ওরা তো আমার কন্যাকে উদ্ধার করে দেবে না, তাই আমি দেশে দেশে খুঁজে ফিরছি..
কাকে, তোমার জেকীর কন্যাকে।
