রাণী সেই অদ্ভুত যানে আরোহণ করলো। সঙ্গে সঙ্গে যানখানা ভেসে উঠলো আকাশে। অদ্ভুত সে যানটি, কোনোরকম শব্দ হচ্ছে না। যানখানা আকাশে নীলাভ আলোর কিঞ্চিৎ আভা ছড়িয়ে মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
আওরঙ্গ হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো আকাশের দিকে।
এমন সময় কেউ যেন ওর কাঁধে হাত রাখলো।
চমকে ফিরে তাকালো আওরঙ্গ।
কখন যে মদন এসে তার কাঁধে হাত রেখেছে বুঝতে পারেনি সে। আওরঙ্গকে ফিরে তাকাতে দেখে বলে মদন–হা করে কি দেখছো চাচা?
এ্যা, কি বললে? আওরঙ্গ যেন থতমত খেয়ে গেছে।
মদন বললো–ভয় নেই, আমাদের রাণীজী তার আস্তানায় গেলেন।
আস্তানা! কিসের আস্তানা মদন বাবাজী?
বোকা বুড়ো জানে না দস্যুরাণীর আস্তানা আছে।
কেন, দস্যুরাণীর এটাই তো আস্তানা?
না; এটা ছাড়া পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠে তার আসল আস্তানা আছে। রাণীজী সেখানেই থাকেন।
জানো চাচা, রাণী এবার কেন এসেছিলেন?
তা আমি জানবো কি করে?
দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে এসেছিলেন তিনি।
দস্যু বনহুর!
হাঁ তাকে চেনো না?
আমি–আমি দস্যু বনহুরকে চিনবো কি করে?
সে অনেক বড় দস্যু, বুঝলে? তাকে আমাদের রাণীজী বন্দী করেছেন।
সত্যি বলছো মদন বাবা?
হাঁ, তা নয়তো কি মিথ্যা বলছি!
দস্যু বনহুর কেমন দেখতে?
মানুষের মতো।
তাতো বুঝলাম কিন্তু কেমন তার চেহারা তাই বলছি। খুব বুঝি ভয়ঙ্কর দেখতে?
হেসে উঠলো মদন-দস্যু হলেই বুঝি খুব ভয়ঙ্কর চেহারার লোক হয়?
তাই তো আমি মনে করি।
আমাদের রাণীজীকে দেখেছো—তিনি তো দস্যুরাণী কিন্তু কত সুন্দর তার রূপ-যৌবন, যেন অপূর্ব। তেমনি দস্যু বনহুর। কি সুন্দর তার চেহারা, যেন রাজপুত্র।
মদন বাবাজী, আমাকে একবার তাকে দেখাবে? বড় সাধ আমার দস্যু বনহুরকে একবার স্বচক্ষে দেখি।
এই সখ তোমার?
হাঁ মদন বাবা।
এসো আদার সঙ্গে।
এতো রাতে?
তাতে কি আসে যায়। আমাদের আস্তানায় রাত এবং দিন সব সমান, চলো।
আচ্ছা চলো মদন বাবাজী।
মদন এগুলো, তাকে অনুসরণ করলে আওরঙ্গ। জমাট অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ। মদনের হাতে একটি মোমবাতি।
মোমের আলোতে সামান্য পথ নজরে পড়েছিলো, কেমন যেন বিভীষিকাময় লাগছিলো আওরঙ্গের কাছে। সে চিরদিন মুক্ত আলো-বাতাসে সমুদ্রবক্ষে কাল কাটিয়েছে, এমন জায়গাতত আর সে দেখেনি কোনোদিন। বারবার হোঁচট খাচ্ছিলো, দেয়ালের সঙ্গে মাথাও ঠুকে গেলো কয়েকবার।
মদন বললো–কি বুড়ো চাচা, দস্যু বনহুরকে দেখবার সখ তবু আছে?
হাঁ বাবা দেখবো। এতোবড় একটা দস্যুকে তোমাদের রাণীজী বন্দী করেছেন আমি দেখবো? দেখবো চলো।
অনেকটা সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করে এক সময় এসে পৌঁছে গেলো তারা লৌহ কারাকক্ষের সম্মুখে।
আওরঙ্গের চক্ষুস্থির, ভূগর্ভে এমন কারাকক্ষ সে দেখেনি কোন দিন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আওরঙ্গ হা করে।
মদন বলে- কি দেখছো ঐ যে ভিতরে তাকাও দস্যু বনহুরকে দেখতে পাবে।
মদনের কথায় আওরঙ্গ তাকায় কারাকক্ষের ভিতরে, চমকে উঠে আওরঙ্গ, সে দেখতে পায়। এক যুবক মাথার নিচে বাহু রেখে ঘুমাচ্ছে। কারাকক্ষের স্বল্প আলোতে যুবকের চেহারাখানা স্পষ্ট নজরে পড়ে।
আওরঙ্গ কিছু বলতে যাচ্ছিলো।
মদন ঠোঁটে আংগুল চাপ দিয়ে বলে উঠে চুপ। কথা বলো না।
আওরঙ্গের কিছু বলা হয় না, সে নির্বাকভাবে তাকিয়ে থাকে কারাকক্ষের ঘুমন্ত বন্দীর মুখের দিকে।
মদন বলে—কি দেখছো অমন হা করে?
দেখছি দস্যু বনহুরকে…..
হ দেখো আমাদের রাণী কত বড় বীর রমণী যার অসাধ্য কিছু নেই।
তাইতো দেখছি।
দুজন প্রহরী এতোক্ষণ বসে ঝিমুচ্ছিলো তারা সজাগ হয়ে উঠে। একজন বলে বসে–কে রে?
মদন এক মুখ হেসে বলে–আমরা।
তোমরা এখানে কেন?
মদন জবাব দেয়—আমরা বন্দীকে দেখতে এসেছি।
তোমার সঙ্গী কে?
আওরঙ্গ চাচা।
ও বুড়োর আবার বন্দী দেখার সখ।
দস্যু বনহুরকে সে দেখেনি কোনোদিন তাই।
বেশ করেছো এবার চলে যাও।
কথাবার্তায় জেগে উঠেছে বন্দী। সে উঠে বসে তাকাচ্ছে তাদের দিকে। নিদ্রাজড়িত দুটি চোখ ঢল ঢল করছে বন্দীর।
আওরঙ্গ স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
বন্দী শয্যা ত্যাগ করে উঠে এলো লৌহশিকের পাশে। আওরঙ্গের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। স্থির দৃষ্টি মেলে।
ঠিক ঐ মুহূর্তে হঠাৎ ফিরে দাঁড়ালো আওরঙ্গ। তার দুহাতে দুটি ক্ষুদ্রাকৃতি আগ্নেয় অস্ত্র। বললো সেখবরদার, এক পা নড়বে না।
মদন এবং প্রহরীদ্বয় আচমকা আওরঙ্গকে রুদ্রমূর্তি ধারণ করতে দেখে হকচকিয়ে গেলো। প্রহরীদ্বয় তাদের হস্তস্থিত অস্ত্র উঁচু করবার সুযোগ পেলো না। তারা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গড়েছে।
আওরঙ্গ বজ্রকঠিন কণ্ঠে বললো–হাতের অস্ত্র ফেলে দাও।
মদন বললো–আওরঙ্গ তুমি……
পরে সব শুনবে, এবার আমার কথা মতো কাজ করো, না হলে মৃত্যু অনিবার্য! প্রহরীর নিকট থেকে চাবি নাও খোলো বন্দীশালার দরজা। যাও–তাকিয়ে আছো কেন।
মদন প্রথম প্রহরীর নিকট থেকে চাবি নিয়ে খুলে ফেলে লৌহ কারাগারের দরজাটা।
আওরঙ্গ বলে এবার–অস্ত্র ফেলে দাও প্রহরীদ্বয়। দাও বলছি…
বাধ্য হলো ওরা হাতের অস্ত্র ফেলে দিতে।
আওরঙ্গ বললো-মদন, প্রহরীদ্বয় সহ বন্দীশালায় প্রবেশ করো, নাচেৎ……অস্ত্র দুটি ঠিকভাবে উঁচু করে ধরে কথাটা অর্ধসমাপ্ত ভাবে শেষ করে সে।
মদন এবং প্রহরীদ্বয় যত সাহসীই হোকনা কেন, তারা আওরঙ্গের হস্তস্থিত ক্ষুদ্র অস্ত্র দুটির দিকে তাকিয়ে একেবারে দমে গেছে যেনো। মদন ভাবতে পারেনি বৃদ্ধা আওরঙ্গ এমনভাবে তাদের পরাজিত করতে পারবে। ওরা ভিজে বিড়ালের মতো বন্দীশালায় প্রবেশ করে। মদন দাঁতে অধর দংশন করতে লাগলো।
