চলুন তবে। লোকটা তাদের দলের একজনকে লক্ষ্য করে বললো– মদন, গাড়িতে মালগুলো তুলে দে।
বিপুলদেহী একজন এগিয়ে এলো, সে মালের বাক্সগুলো এক এক করে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে এলো।
দলের নেতৃস্থানীয় লোকটা এবার দিপালীকে লক্ষ্য করে বললো– মিস দিপালী, হঠাৎ যদি পুলিশ গার্ড আমাদের গাড়িখানা ধরে ফেলে তাহলে আপনি ঠিক নববধুর মতোই লজ্জা অবনত মস্তকে মৃদু কণ্ঠে বলবেন, বাক্সগুলোতে আপনার বাপের দেওয়া জিনিসপত্র আছে।
দিপালী বললো–আমাকে এতো বুঝিয়ে বলতে হবে না। এসব আমার অভ্যাস আছে। চলুন এবার কোথায় যেতে হবে? কিন্তু মনে রাখবেন সীমানার বাইরে পৌঁছে দেবার পরই আমার পাওনা। আমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
নিশ্চয়ই পাবেন মিস দিপালী।
আচ্ছা চলুন। এসো মাধু আর রাসবিহারী! দিপালী নিজের সঙ্গী দুজনাকে ডাকলো।
ওরা এতোক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো গোবেচারীর মতো। এবার দিপালীকে অনুসরণ করলো।
চোরাচালানীদলের তিনজন এবং দিপালীর সঙ্গী দুজন সহ পাঁচজন পুরুষ এবং দিপালী একজন নারী–এই ছজন গাড়িতে এসে বসলো।
ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো।
যে গাড়িতে দিপালী এসেছিলো এ-গাড়ি সে-গাড়ি নয়, এটা চোরাচালানীদের গাড়ি।
গাড়িখানা এগিয়ে চলেছে।
নববধুবেশে গাড়ির মাঝখানে বসে আছে দিপালী। তার সঙ্গীরা সবাই বসেছে পিছন আসনে।
দিপালীর বাক্সগুলো রয়েছে গাড়ির মেঝেতে।
প্রায় ঘন্টা দুতিন অবিরাম গতিতে চলার পর গাড়িখানা সীমান্তের ধারে এসে পৌঁছলো।
ঐ মুহূর্তে সীমান্তের ওপাশে দেখা গেলো আর একখানা গাড়ি।
দিপালীর সঙ্গী দুজন বসে আছে সম্মুখ আসনে।
চোরাচালানী তিনজন পিছন আসন থেকে ড্রাইভারকে পথের নির্দেশ দিচ্ছিলো এতোক্ষণ। এবার তারা সীমান্তের ওপারের গাড়িখানা দেখে আনন্দে অস্কুট ধ্বনি করে।
একজন বলে–মিস দিপালী, ধন্যবাদ, আজ পথে কোনো পুলিশ বেটা হানা দিয়ে বসেনি।
অপর একজন বললো–এখনও গাড়ির নিকটে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিশ্বাস নেই।
প্রথম জন বললো—-ঐ তো আমাদের ওপারের গাড়ি এসে গেছে।
ড্রাইভার গাড়িখানাকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল করে সীমান্তের ওপারে নিয়ে হাজির করলো।
সন্ধ্যার অন্ধকার তখনও জমাট হয়ে আসেনি।
নেমে পড়লো দিপালীর সঙ্গী দুজন।
চোরাচালানী তিনজন যেমন গাড়ি থেকে নামতে যাবে, অমনি দিপালীর সঙ্গী দুজন পকেট থেকে রিভলভার বের করে উঁচু করে ধরলো-খবরদার, গাড়ি থেকে নামবে না।
অপরজন বাঁশিতে ফুঁ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের এপারে থেমে থাকা গাড়ি থেকে নেমে পড়লো বিশজন সশস্ত্র পুলিশ।
দিপালীর সঙ্গীদের একজন বললো–এই তিনজন চোরাচালানীকে গ্রেফতার করো।
দিপালী ততোক্ষণে নেমে দাঁড়িয়েছে গাড়ি থেকে।
পুলিশ ফোর্স চোরাচালানী তিনজনকে টেনে নামিয়ে ফেললো গাড়ি থেকে। ওরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। ভাবছে ওরা, দিপালী তাহলে আমাদের সঙ্গে চালাকি করলো। পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সে পরামর্শ করেই এসেছিলো।
দিপালী হেসে বললো-দেখুন, আপনাদের অনুরোধ রক্ষা না করে উপায় ছিলো না, কারণ আমাদের নির্দেশ পালন না করলে আপনারা আমাকে বিপদে ফেলতেন তাই……কথার মাঝপথে থেমে ফিরে তাকালো দিপালী তার সঙ্গী দুজনার দিকে–মিঃ হেলালী এবং মিঃ জাফরী, আপনারা আমাকে এভাবে সাহায্য করে রক্ষা করলেন, সেজন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মিঃ হেলালী বললেন–মিস দিপালী, ধন্যবাদ পাবেন আপনি, কারণ আপনার সহায়তায় আজ কজন দুস্কৃতিকারী আটক করা সম্ভব হলো।
মিঃ জাফরী বলে উঠলেন–মিস দিপালী, এই নিন আপনার, প্রাপ্য দশ হাজার টাকা। আপনার পুরস্কার।
দিপালী হেসে বললো-পুরস্কার পাবেন আপনারা, আমি নই। আপনাদের সহায়তা ছাড়া আমার একার কোনো উপায় ছিলো না। রেখে দিন ও টাকা, দেশের দুঃস্থ জনগণের সাহায্য তহবিলে দিয়ে দিবেন।
ততোক্ষণে পুলিশ বাহিনী চোরাচালানীদের বন্দী করে ফেলেছে।
চোরাচালানী মালসহ আটক করা হলো দুস্কৃতিকারী তিন ব্যক্তিকে।
*
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো আওরঙ্গের। সে দড় বড় বিছানায় উঠে বসলো। সে দেখলো, তার গুহার মেঝেতে একটা নীলাভ আলোক রশ্মির আভা ছড়িয়ে পড়েছে। বিস্মিত আওরঙ্গ চিৎকার করতে যাবে অতি কষ্টে সে নিজকে সামলে নিলো। অবাক হয়ে আলোকরশ্মির দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
শয্যা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো আওরঙ্গ। সে যে কক্ষমধ্যে ঘুমাতো সেটি আসেলে কোনো কক্ষ নয়, ছোট একটি গুহা। গুহাটির কোনো দরজায় কোনো ঢাকনা বা আবরণ ছিলো না।
আওরঙ্গ দাঁড়াতেই দেখলো, অদূরে একটি ছোট যান দাঁড়িয়ে আছে আর সেই যান থেকে নীলাভ আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছে। সে দুচোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই বিস্ময়কর যানটির দিকে।
আরও অভিভূত হয়ে যায় আওরঙ্গ, সে দেখতে পায় শুভ্র বসনা এক নারী মূর্তি এসে দাঁড়ায় যানটির পাশে।
তার পিছনে সিমকী এবং আরও কয়েকজন পুরুষ এগিয়ে আসে। পুরুষগুলোর দেহে জমকালো এক অদ্ভুত ধরনের পোশাক। শুভ্রবেশী নারীকে চিনতে পারে আওরঙ্গ, তাকে সেদিন সে দেখেছিলে সিমকার সঙ্গে ঝরণার ধারে। নির্বোধের মতো দেখে সে তাকিয়ে তাকিয়ে।
শুভ বসনা নারীমূর্তিকে নত হয়ে অভিবাদন জানায় তার অনুচরগণ।
নারীমূর্তিকে লক্ষ্য করে বলে সিমকী-তোমার যাত্রা যেন শুভ হয়।
রাণী সিমকীকে লক্ষ্য করে বলে–সবদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখো চন্দনা। ফিরে না আসা অবধি আস্তানার বাইরে যাবে না।
