চন্দনার মনেও একটা ভাবময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সে তাকিয়ে আছে রাণীর কঠিন দীপ্ত মুখমণ্ডলের দিকে।
অদূরে আওরঙ্গ বসে বসে রাণী আর চন্দনার কথাগুলো শুনছিলো, যদিও সে ওদের কথাবার্তা একবর্ণও বুঝতে পারছিলো না!
রাণী বলে উঠে–চন্দনা, আবার আমি কান্দাই যাবো। নিশ্চয়ই দস্যু বনহুর ফিরে গেছে তার আস্তানায়। তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
চন্দনা বলে–ততোদিন তুমি প্রদীপ কুমারকে আটক রাখবে রাণী?
এ ছাড়া কোনো পথ নেই চন্দনা। বলে উঠে দাঁড়ালো রাণী। চন্দনাও উঠে পড়লো।
*
মিঃ হেলালী এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। যদিও ডাক্তারের মতে এখনও তাঁর পূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন, তিনি তবু কাজে নেমে পড়েছেন। মিঃ হেলালীকে সহায়তা করে চলেছেন আরও কয়েকজন পুলিশ অফিসার।
সেদিন মিঃ হেলালী পোশাক পরিচ্ছদ পরে তৈরি হয়ে নিচ্ছিলেন এমন সময় একখানা গাড়ি এসে থামলো গাড়ি বারান্দায়।
গাড়ি থেকে নামলো একজন বোরখা পরিহিতা নারী, হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ। গাড়ি থেকে নেমে সোজা সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে।
দরজায় মোটা ভেলভেটের পর্দা ঝুলছে।
বোরখা পরিহিতা দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বললো-ভিতরে আসতে পারি?
মিঃ হেলালী বললেন–আসুন।
মিঃ হেলালী চোখ তুলতেই চমকে উঠলেন, সম্মুখে একটি বোরখা পরিহিতা মহিলাকে দেখে অবাক হলেন তিনি।
বোরখা পরিহিতা মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললো, সঙ্গে সঙ্গে মিঃ হেলালী অবাক কণ্ঠে বললো–মিস দিপালী, আপনি!
হা খুব আশ্চর্য হয়ে গেছেন, তাই না? বললো দিপালী।
মিঃ হেলালী বললেন—আশ্চর্য হবার কথাই বটে। কারণ মিস দিপালীকে বোরখা পরিহিতা অবস্থায় দেখে বড় নতুন লাগছে। জানিনা হঠাৎ এ অবস্থায় এখানে কি মনে করে?
দিপালী বোরখাটা খুলে ফেলে সোফার একপাশে মাখলো তারপর কক্ষের চার দিকে তাকিয়ে। দেখে নিয়ে বললো-আপনি বাইরে বের হচ্ছেন নাকি?
মিঃ হেলালী বললেন–হ্যাঁ একটু বাইরে যাবো। এবার বলুন আপনার সংবাদ কি?
সংবাদ আছে বলেই এসেছি মিঃ হেলালী। বলুন, আজ আপনার শরীর কেমন আছে?
দেখতেই পাচ্ছেন সুস্থ আছি।
কিন্তু ডাক্তার বলেছে আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন।
বিশ্রামই তো এতোদিন করে এলাম মিস দিপালী। এখন কাজ করতে হবে। জানেন তো কত কাজ পড়ে আছে। যাক্, বলুন কি সংবাদ?
দিপালী ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে বের করে একটি খাম। খামটা বাড়িয়ে ধরে মিঃ হেলালীর দিকে।
মিঃ হেলালী খামটা হাতে নিয়ে বলেন-বসুন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন?
দিপালী হেসে বললো-এতোক্ষণে বুঝি অতিথি অভ্যর্থনার কথা স্মরণ হলো?
সত্যি মিস দিপালী, আমি যেন কেমন হয়ে গেছি। আজকাল সব দিক খেয়াল করে চলতে পারি না। ক্ষমা করবেন এ ভুলের জন্য।
দিপালী হাসলো।
মিঃ হেলালী ততোক্ষণে চিঠিখানা খুলে মেলে ধরেছেন চোখের সামনে। চিঠিখানাতে মাত্র কয়েকটা লাইন লেখা আছে–
মিস দিপালী, আপনি শুধু গাড়িতে নববধুর বেশে বসে থাকবেন। গাড়ির ভিতরে থাকবে মালের বাক্স। লোকে জানবে আপনি শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। কেউ গাড়ির তল্লাশি করবে না। জিনিস আসল জায়গায় পৌঁছে গেলেই পাচ্ছেন দশ হাজার টাকা। রাজি থাকলে জানাবেন? অন্যথায় বিপদ আছে। —ক ন ক
চিঠিখানা পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন মিঃ হেলালী দিপালীর দিকে।
দিপালী বললো–চিঠিখানা আজ রাতে আমার চাকরের হাতে কে যেন দিয়ে গেছে।
আপনি রাজি আছেন কিনা জানিয়েছেন?
জানিয়েছি। এই দেখুন আমার চিঠির নকল কপি।
মিঃ হেলালী খুশি হয়ে হাত বাড়ালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন– ধন্যবাদ। চিঠির নকল কপিটা পড়লেন তিনি, তারপর হেসে বললেন– সত্যি, আপনি বুদ্ধিমতী নারী।
দিপালী বললো–আপনার সহায়তা কামনা করছি।
সহায়তা আমার নয়, আপনার সহায়তাই আমাকে কর্তব্যপথে উদ্বুদ্ধ করবে মিস দিপালী। আচ্ছা, আমি এক্ষুণি পুলিশ অফিসে রওয়ানা দিচ্ছি, সেখানে মিঃ জাফরীর সঙ্গে কথা হবে।
দিপালী বললো-তাহলে চলি?
হাঁ আসুন, কিন্তু মনে রাখবেন সব কথা।
নিশ্চয়ই রাখবো। দিপালী উঠে দাঁড়ালো।
মিঃ হেলালী চিঠি দুখানা ভাঁজ করে পকেটে রাখলো, বললো- চলুন আমার গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দি?
দিপালী হেসে বললে–ধন্যবাদ, কারণ আমি যে আপনার এখানে এসেছি, এ কথা কেউ জানে না। সে বোরখা খানা হাতে তুলে নিয়ে বললে–এটা দেখেই কি আপনি বুঝতে পারছেন না আমি কেন বোরখা পরে এসেছি।
ও, সে কথা ভুলেই গেছি। আচ্ছা আপনি তাহলে……
হাঁ, আমি যাচ্ছি। দিপালী বোরখা পরতে পরতে একটু হেসে বললো—সন্ধ্যার পর আবার আসবো।
কিন্তু কেন?
পরে জানতে পারবেন। দিপালী কথাটা বলে বেরিয়ে গেলো ভেলভেটের মোটা পর্দা ঠেলে বাইরে।
মিঃ হেলালী অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন তার চলে যাওয়া পথের দিকে। সিঁড়িতে দিপালীর জুতোর শব্দ মিশে যেতেই মিঃ হেলালী মাথার ক্যাপটা হাতে তুলে নিয়ে ডাকলেন– শামসু–শামসু…
ছুটে এলো বয়টা-স্যার।
বাইরে যাচ্ছি, কেউ এলে বলবি অল্পক্ষণেই ফিরে আসবো।
আচ্ছা স্যার, বলবো।
মিঃ হেলালী সিঁড়ি বেয়ে নেমে যান নিচে।
ততক্ষণে দিপালীর গাড়ি চলে গেছে।
মিঃ হেলালী নিচে নেমে আসতেই তার গভীর নীল গাড়িখানা এসে দাঁড়ালো গাড়ি-বারান্দায়। মিঃ হেলালী চেপে বসলেন।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
মিঃ হেলালী একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন, তারপর আপন মনে ভেবে চললেন তার কাজের কথাগুলো। দিপালীর কিছু পূর্বে দেওয়া চিঠিখানার কথাটা ভাবছিলেন তিনি।
