চন্দনা বললো–তারপর?
যে কদিন জাহাজে ছিলাম দুজনার মধ্যে একটা গভীর ভালবাসা জমে উঠেছিলো। সব সময় হীরা আর আমি একসঙ্গে থাকতাম। ও আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলো আমাকে ও মনের সব কথা বলতো। একদিন কথায় কথায় বললো সে-জানো রাণী, পুরুষ জাতকে আমি বিশ্বাস করি না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম–কেন, পুরুষ জাত তোমার কি ক্ষতি করেছে? বলেছিলো হীরা–সে অনেক কথা। তখন একটা গভীর বেদনার ছায়া ভেসে উঠেছিলো হীরার মুখমণ্ডলে। চন্দনা, কেন জানি না সেদিন ওর সেই ব্যথা ভরা মুখখানা আমাকে ভীষণ কাতর করে তুলেছিলো।
হীরা বলে চলেছে–বেশ কয়েক বছর আগের কথা, আমার সহচরীদের নিয়ে আমি একদিন সমুদ্রতীরে স্নান করতে গিয়েছিলাম। তখন সবেমাত্র পূর্বাকাশে সূর্যদেব উঁকি দিচ্ছে। আমার সহচরীসহ আমি উচ্ছল আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে সমুদ্রতীরাভিমুখে চলেছি। সেদিন কেন যেন বড় ভাল লাগছিলো আমাকে। আমার দক্ষিণ বাহু বারবার স্পন্দিত হচ্ছিলো। আমি জানতাম, দক্ষিণ বাহু স্পন্দন কোন শুভ লক্ষণ। তাই মনে মনে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠেছিলাম। তারপর সমুদ্রতীরে পৌঁছলাম। ভোরের সূর্যের আলোতে সমুদ্রতীর ঝকঝক করছে। অপূর্ব সে শোভা। সমুদ্রতীরে এসে আমরা এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, হঠাৎ আমার দৃষ্টি চলে গেলো দূরে বালুচরে। দেখলাম একটি লোক উপুর হয়ে পড়ে আছে। ততোক্ষণে আমার সহচরীদের দৃষ্টিও গিয়ে পড়েছে সেইদিকে। আমি প্রথমে পা বাড়ালাম, চলতে দেখি লোকটা মৃত না জীবিত। গিয়ে দেখলাম একটা লোক উপুর হয়ে পড়ে আছে সে মৃত না জীবিত, বোঝা যাচ্ছে না। আমার সহচরদের আদেশ দিলাম লোকটাকে চীৎ করে ফেলার জন্য। আমার সহচরীগণ আদেশ পালন করলো। রাণী, তোমাকে কি বলবো ওকে চীৎ করে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত হৃদয়ে একটা বিপুল অনুভূতি অনুভব করলাম। কারণ লোকটির মুখমণ্ডলে এক আভিজাত্যের ছাপ ফুটে আছে, বলিষ্ঠ সুন্দর দীপ্ত একটি মুখ। সে রকম সুন্দর মুখ আর হয় না। আমিই প্রথমে ওর বুকে কান রেখে পরীক্ষা করে দেখলাম। দেখলাম সে জীবিত আছে। সহচরীদের লক্ষ্য করে বললাম, একে নিয়ে চল বাঁচাতে হবে। হীরা কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে থেমেছিলো।
আমি তখন অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম।
চন্দনা বলে উঠলো–যেমন আজ আমার অবস্থা হয়েছে? বলো রাণী, তারপর?
রাণী তাকিয়েছিলো ঝরণার ঝরে পড়া সচ্ছ সাবলীল জলধারার দিকে। হয়তো বা ওর চোখের সামনে ভাসছিলো হীরার সেদিনের মুখখানা। বলতে শুরু করলো রাণী–হীরা বলে চললো-সহচরীদের সহায়তায় ওকে নিয়ে এলাম রাজ অন্তঃপুরে। এক গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখলাম অতি সাবধানে। উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম কখন ওর সংজ্ঞা ফিরে আসবে। আমি এবং আমার সহচরীগণ নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে ওর জ্ঞান ফিরে আসে। এক সময় জ্ঞান ফিরে এলো ওর। রাণী, তোমাকে কি বলবো, ওর সেই প্রথম দৃষ্টি আজও আমার হৃদয়ে গাঁথা হয়ে আছে। অদ্ভুত নীল দুটি চোখে অন্তঃর্ভেদী দৃষ্টি সুস্থ হয়ে উঠলো ও। আমি ওকে ভালবেসে ফেললাম। আমার সহচরীদের সহায়তায় ওকে আমি রাজঅন্তঃপুরের একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখলাম।
গভীর রাতে যখন সমস্ত রাজঅন্তঃপুর নিদ্রায় অচেতন থাকতো তখন আমার প্রধান সহচরী রতা এসে আমাকে নিয়ে যেতো ওর কাছে। আমিও ওকে পেয়ে আনন্দে আত্নহারা হতাম, ভুলে যেতাম আমার অস্তিত্ব, আমি নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলতাম। রাণী, সেই মুহূর্তগুলো আমার যে কিভাবে কাটতো তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না। প্রথম প্রথম রাতের বেলা আসতাম ওর কাছে, তারপর দিনের বেলায়ও আসতে শুরু করলাম।
আমি বলেছিলাম–হীরা, তোমার দুঃসাহস তো কম নয়?
বলেছিলো হীরা–ওর সঙ্গ আমাকে দুঃসাহসী করে তুলেছিলো রাণী। শুধু ওর সঙ্গে মিলিত হতেই আসতাম না। সহচরীদের সহায়তায় আমরা গোপনে ওকে নিয়ে সমুদ্রে বজরায় বেড়াতে বের হতাম। সেকি আনন্দ, ও আর আমি বজরার ছাদে বসে তাকিয়ে থাকতাম জ্যোছনাভা সমুদ্রের দিকে। হঠাৎ দৃষ্টি আমার চলে যেতো ওর মুখে। জোছনার আলোতে অপূর্ব লাগতো ওকে। আমি সম্মোহিত হয়ে পড়তাম। রাণী, তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না, আমার সমস্ত হৃদয়-মন ওকে সঁপে ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওকে আমি ধরে রাখতে পারলাম না……ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলো হীরা।
জানিস চন্দনা, তখন ওর জন্য আমার এতো বেশি দুঃখ হলো যে, আমি ঐ মুহূর্তে মনে মনে শপথ করলাম, বললাম-হীরা, কে সে যুবক যাকে তুমি মৃত্যুর মুখ থেকে রক্ষা করলে অথচ সে তোমাকে অবজ্ঞা করলো, উপেক্ষা করলো তোমার ভালবাসাকে। হীরার দুগণ্ড বেয়ে তখন দরদর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কাঁদতে কাঁদতে বললো হীরা, বিদায় নেবার মুহূর্তে সে নিজের পরিচয় আমাকে জানিয়েছিলো, সে নাকি দস্যু বনহুর। চন্দনা, সেদিন দস্যু বনহুর নামটা শুনে আমার ধমনির রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠেছিলো। ঐ নরপিশাচ হীরার সরলতা নিয়ে তার হৃদয় জয় করে পরে তাকে তুচ্ছ বলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেলো। এতোবড় স্পর্ধা তার। হীরার হাত ধরে আমি কথা দিয়েছি, যেমন করে হোক দস্যু বনহুরকে আটক করবোই এবং তাকে শায়েস্তা করবো। হীরা আজও কোনো পুরুষকে গ্রহণ করেনি, ওর ধ্যান-জ্ঞান সাধনা ঐ দস্যু বনহুর? যতক্ষণ না ওকে বন্দী করে হীরার হাতে সমর্পণ করতে পেরেছি ততক্ষণ আমার স্বস্তি নেই চন্দনা। কথাগুলো বলে থামলো রাণী।
