দস্যু বনহুরের বিচরণ পৃথিবীর উত্তরাংশে আর দস্যু রাণীর বিচরণ সম্পূর্ণ দক্ষিণাংশে, কাজেই কারো সঙ্গে কারো সাক্ষাৎ লাভের কোনো সম্ভাবনাও ছিলো না।
মাঝে মাঝে দস্যুরাণী তার মন্থনা দ্বীপ আস্তানায় আসতো। এমনি একদিন দস্যুরাণী যখন তার মন্থনা দ্বীপ আস্তানার উদ্দেশ্যে স্থলপথে রুহীকে নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিলো তখন পথিমধ্যে হীরাবাঈয়ের সংগে সাক্ষাত করাই ছিলো তার মূল উদ্দেশ্য।
রাজকুমারী হীরাবাঈ ছিলো দস্যুরাণীর বান্ধবী! দুবান্ধবীর মধ্যে স্বহৃদয়তা ছিলো অত্যন্ত গভীর। যদিও ওদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ কদাচিত ঘটতো।
এমনি একদিন দস্যুরাণী আর হীরাবাঈ মিলে যখন মিলিত হয়েছিলো তখন হীরার মুখে দস্যু বনহুর সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছিলো। সেদিন থেকেই দস্যুরাণীর মনে একটা দারুণ ক্রোধ বেঁধে উঠেছিলো যেমন করে থোক দস্যু বনহুরকে সে বন্দী করবে এবং তার বান্ধবী হীরাবাঈকে অবজ্ঞা করার প্রতিশোধ নেবে। মনে মনে শপথ গ্রহণ করেছিলো দস্যুরাণী।
অবশ্য দস্যু বনহুর সম্বন্ধে দস্যুরাণী যে একেবারে অজ্ঞ ছিলো তা নয়। সে জানতো দস্যু বনহুর একজন প্রখ্যাত দস্যু। তার কার্যকলাপও কিছু কিছু কানে এসেছিলো তার কিন্তু দস্যুরাণী মনোযোগ দিয়ে শোনেনি কোনদিন বা ভাবেনি ওর সম্বন্ধে তেমন করে।
তার প্রিয়তম বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা মিঃ আহাদ চৌধুরীর মুখেও দস্যু বনহুরের কৃতিত্বের কথা শুনেছিলো তবু গ্রাহ্য করেনি দস্যু রাণী। কারণ সে জানে তার মত দস্যু এ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় জন নেই।
এবার দস্যুরাণী চন্দনা সহ এসেছে মন্থনায়।
উদ্দেশ্য তার দস্যু বনহুরকে আটক করা এবং তাকে সায়েস্তা করা।
সংবাদটা তারই প্রধান অনুচর রহমতই তাকে দিয়েছিলো বলেছিলো রহমত-রাণীজী, কান্দাই থেকে আমাদের অনুচর জানিয়েছে দস্যু বনহুর ভ্রমে পুলিশ মহল রাজপুত্র প্রদীপ কুমারকে আটক করেছিলো এবার তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গোপনে তারা জানতে পেরেছিলো দস্যু বনহুর প্রদীপের সঙ্গে জাহাজ শাহান শাতে মন্থনা দ্বীপ অভিমুখে যাচ্ছে।
সংবাদ শোনা মাত্র দস্যুরাণীর চোখে মুখে ফুটে উঠেছিলো এক অদ্ভুত দীপ্ত ভাব। জ্বলে উঠেছিলো তার চোখের তারকা দুটো জ্বল জ্বল করে। সেদিন দস্যুরাণী ভাবতে পারেনি এমনভাবে সে পরাজিত হবে দস্যু বনহুরের কাছে।
দস্যু রাণীর মুখোভাব লক্ষ্য করে চন্দনার মনটা ব্যথাকাতর হয়ে উঠলো বললো সে-রাণী, তা হলে তুমি কি করতে চাও বলো?
যতক্ষণ না দস্যু বনহুরকে আটক করতে পেরেছি ততক্ষণ প্রদীপ কুমারকে বন্দী থাকতেই
কিন্তু দস্যু বনহুকে তুমি কোথায় খুঁজে পাবে রাণী? সেকি মন্থনায় আসবে?
না এলেও তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
রাণী তুমি না বলেছিলে তোমার বান্ধবী হীরাবাঈ সম্বন্ধে বলবে? আজ তুমি অবসর আছো বলোনা কে সেই হীরাবাঈ? আর দস্যু বনহুরের সঙ্গেই বা তার কি করে পরিচয় হলো!
একটু হেসে বললো রাণী–শুধু পরিচয় নয় চন্দনা। গভীর ভালবাসা তবে হাঁ যতটুকু আমি শুনেছি তাতে মনে হয় দস্যু বনহুরও তাকে ভালবেসেছিলো।
ভূমিকা রেখে বলোনা শুনি আসল কথাগুলো? যার জন্য তুমি এমন একটা অদ্ভুত বসানাকে চরিতার্থ করতে চলেছো?
রাণীর হাতে ছিলো একটি চাবুক।
এ চাবুকখানা হাতে নিয়ে রাণী রুহীতে আরোহণ করতো। চাবুক দিয়ে সে লাগামের কাজ করতো! রাণী চাবুকখানা দোলাতে দোলাতে ধীরে ধীরে পা ফেলছিলো। ওরা সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করে সুড়ঙ্গ মুখের বাইরে এসে দাঁড়ালো। অদূরে ঘাস খাচ্ছিলো রুহী আর মুলকী।
রুহী এবং মুলকীর কিছু দূরে বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো আওরঙ্গ।
সেদিনের পর থেকে আওরঙ্গ সদা সর্বদা রুহী আর মুলকীকে দেখা শোনা করে। এ ছাড়া আর কিইবা কাজ করবে সে। শক্ত কোন কাজ সে এখন পারেও না তেমন করে।
রাণী আওরঙ্গকে দেখে থমকে দাঁড়ালো।
চন্দনা বললো-রাণী ওর কথাই তোমাকে সেদিন বলেছিলাম। বড় ভাল লোক। বেচারীর এ দুনিয়ায় কেউ নেই…।
তাতো বুঝলাম কিন্তু ওখানে বসে ও কি করছে?
রাণী তোমাকে না বলেই আমি ওকে একটা কাজ দিয়েছি। রুহী আর মুলকীকে দেখা শোনা করবে। বুড়ো মানুষ তাই…
তা বেশ করেছে ওর কোনো অসুবিধা যেন না নয়। অন্যমনস্কভাবে কথাগুলো বলে রুহীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো রাণী। রুহীর পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো সে।
রুহী তার প্রভুকে পাশে পেয়ে আনন্দে আতহারা হয়ে শব্দ করতে লাগলো।
চন্দনা বললো–চলো রাণী ও পাশে ঝরণার ধারে গিয়ে বসি।
রাণী হেসে বললো-তুই হীরার কথা না শুনে ছাড়বিনা দেখছি। চল ঝরণার ধারে গিয়েই বসি।
রাণী আর চন্দনা অদূরে ঝরণার ধারে গিয়ে বসে।
চন্দনা বলে–হীরাবাঈ তোমার কেমন বান্ধবী বলো?
চন্দনা হীরা আমার প্রাণের বান্ধবী যদিও আমি আর তার মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ।
বলোনা কেমন করে ওর সঙ্গে তোমার প্রথম পরিচয়?
সব তোকে বলতে হবে?
হাঁ আমি শুনবো শুনতে বড় ইচ্ছা হচ্ছে কারণ সে রাজকুমারী আর তুমি দস্যুরাণী কি করে তোমরা বান্ধবী হলে? ..
ঠিক বলতে কি ওর সঙ্গে আমার আচমকা পরিচয়। সেবার রায়হান বন্দর থেকে রওনা দিয়ে আমি যখন সিওগাঁহিন্দ যাচ্ছিলাম তখন জাহাজে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই হীরা আমাকে আকৃষ্ট করে ফেলে ওর মধুর ব্যবহারে। জাহাজে আমাকে প্রায় দুসপ্তাহ কাটাতে হয়েছিলো সেবার। থামলো রাণী।
