আওরঙ্গ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো।
এমন সময় সিমকী এলো হন্তদন্ত হয়ে। তার সঙ্গে আরও দুজন লোক।
যারা কফিন বহন করে এনেছিলো তারাও দাঁড়িয়ে ছিলো কফিনটার চারপাশে।
সিমকী বললো–কফিন উঠিয়ে নাও।
লোক চারজন পুনরায় কফিন তুলে নিলো কাঁধে।
সিমকী বললো-এসো আমার সঙ্গে।
আওরঙ্গ বলে উঠে-মা মণি, আমি বসে থাকবো?
তুমি…আচ্ছা এসো। সিমকী এগুলো তাকে অনুসরণ করলো আওরঙ্গ।
ভূগর্ভে যে এমন কারুকার্য খচিত দালান কোঠার মত সারি সারি গুহা আছে তা আওরঙ্গ কেন, কেউ ভাবতেও পারবে না কোনোদিন। আওরঙ্গ যত এগুচ্ছে ততই বিস্মিত হচ্ছে।
নিকষ অন্ধকার এক সুড়ঙ্গ পথ।
সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হলো সেখানে একটি অদ্ভুত ধরনের গুহা। একটি পাথর দিয়ে গুহামুখ বন্ধ করা ছিলো।
কফিনটা নিচে নামিয়ে রেখে গুহামুখের পাথরখানা সরিয়ে ফেললো লোক চারজন। তারপর ওরা কফিন নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো।
সিমকী দাঁড়িয়ে রইলো বাইরে।
একটু পর ফিরে এলো কফিনের বাহক চারজন।
সিমকী বললো—-তোমরা যাও, আমি আওরঙ্গকে তার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আসি।
ওরা চলে গেলো।
সিমকী বললো—-আমার রাণীর কাছে অনুমতি পেয়েছি আওরঙ্গ। তোমাকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় ছিলাম। রাণী তোমাকে রাখার অনুমতি দিয়েছে। আচ্ছা আওরঙ্গ
বলো মা জি?
তুমি কি কাজ পারবে? বুড়ো মানুষ, তোমাকে কোনো কঠিন কাজ দেবো না। হা শোন আওরঙ্গ, তুমি আমার মুলকী আর রাণীর রুহীকে দেখাশোনা করবে। সব সময় ওদের কাছে কাছে থাকবে আর যত্ন করবে, কেমন?
আচ্ছা মা জি।
শোন, ওদের খাওয়া-দাওয়া তোমাকে করাতে হবে না, তার জন্য অন্য লোক আছে। সিমকী অদূরে দন্ডায়মান এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলে–তিলক, একে নিয়ে যাও মুলকী আর রুহীর সঙ্গে। পরিচয় করিয়ে দাওগে। যাও আওরঙ্গ……
তিলক আওরঙ্গ সহ চলে যায়।
সিমকী পা বাড়ায় অন্য পথে।
আওরঙ্গ মনে ভীষণ চিন্তা উঁকি দেয়, মুলকী আর রুহী এরা আবার কেমন মেয়ে কে জানে। তাকে কেমন চোখে দেখবে–ঘৃণা করবে না সমীহ করবে, তাইবা কে জানে। সে এসেছে একমুঠো ভাতের জন্য আর একটু আশ্রয়ের জন্য। কাজ সে পারে না, সন্ধ্যের পর চোখে দেখে না আজকাল ভাল করে। আওরঙ্গের মনে পড়ে বহুদিন আগের কথা, সে যখন জোয়ান ছিলো তখন তার স্ত্রী আর একটি মেয়ে নিয়ে কত সুখে-শান্তিতেই না ছিলো। আর এখন সে পরিশ্রম করতে পারে না, আর পারে না বলেই না সে এসেছে সিমকীর সঙ্গে। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়, আওরঙ্গ। তাকিয়ে দেখে বেশ পরিস্কার সচ্ছ আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে সে আর তিলক।
তাকিয়ে দেখলো আওরঙ্গ অদূরে পাশাপাশি দুটো ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। আওরঙ্গ চারিদিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলো কোনো মেয়ে মানুষ দেখা যায় কিনা। কিন্তু কোনো মেয়ে মানুষ নজরে পড়লো না। শুধু দুটো ঘোড়া।
তিলক বললো–তোমার নাম কি বুড়ো?
আমার নাম আওরঙ্গ।
হেসে উঠলো তিলক—আওরঙ্গজেব নাকি?
না, শুধু আওরঙ্গ বলেই আমাকে সবাই ডাকে। তুমিও ডেকো কই, মুলকী আর রুহীকে দেখছি না তো?
তুমি কি অন্ধ ঐ তো তোমার সামনে মুলকী আর রুহী।
ঐ ঘোড়া দুটোর কথা বলছো?
তা নয় তো কি ভেবেছো তুমি?
ভেবেছিলাম কোনো মেয়েমানুষ……
বুড়ো বয়সে আবার মেয়েমানুষের সখ কেন বাবা?
সখ নয়, সখ নয় বিপদ……মেয়ে মানুষ দেখলে বিপদে পড়ি, বুঝলে বাবা। তা ঘোড়া দুটোর কি করতে হবে?
দেখাশুনা করবে।
বেশ তাই হবে।
আমি চললাম তুমি থাকো।
তিলক পা বাড়াতেই বলে উঠে আঙ্গ—তুমি তো চললে ভায়া কিন্তু আমার পেট যে চো। চো করছে।
ভয় নেই, ঠিক সময় খেতে পাবে।
আচ্ছা।
তিলক চলে যায়।
আওরঙ্গ এবার ভাল করে তাকায় ঘোড়া দু টোর দিকে। একটি জমকালো একটি সাদা ধব ধবে যেন অমাবস্যা আর জ্যোছনা রাত। আওরঙ্গ বুঝতে পারলো, আজ থেকে এ দুজনের দেখাশোনার ভার তারই উপর রইলো।
*
সমস্ত দেহে শিকারীর জমকালো ড্রেস। পায়ে ভারী বুট। মাথায় ক্যাপ। কোমরের বেল্টে রিভলভার একপাশে তীক্ষ্ণ ধার ছোরা। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ, রেশমের মত রাশিকৃত চুল ছড়িয়ে আছে কাঁধে পিঠে।
পাশে পাশে এগিয়ে চলেছে চন্দনা, ওর শরীরেও রাণীর অনুকরণে পোশাক। ওর কোমরের বেলটে রিভলভার এবং ছোরা। ওরা দুজন সুড়ঙ্গ পথে ধীরে ধীরে পা রেখে এগুচ্ছিলো আর কথাবার্তা বলছিলো।
এ মুহূর্তে ওদের দেখে মনে হচ্ছিলো কোনো জরুরি কাজ নেই ওদের হাতে, তাই ওরা ধীরে সুস্থে এগুচ্ছিলো আর কথাবার্তা বলছিলো।
বললো চন্দনা-রাণী, যদি চিনতেই পেরেছে যাকে তুমি বন্দী করে এনেছে তিনি দস্যু বনহুর নন তবে কেন ধরে রেখেছো? মুক্তি দিলেই পারো!
রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে—-আমার এ পরাজয়ের কথা এখনও আমার অনুচরদের কেউ জানে না, শুধু জানিস তুই আর আমি। আমার অনুচরগণ সবাই জানে দস্যু বনকে আমি বন্দী করতে সক্ষম হয়েছি। তারা আনন্দে আতহারা হয়ে আমার জয়ধ্বনিতে ভূগর্ভ আস্তানা প্রকম্পিত করে তুলেছিলো! যদি তারা জানতে পারে তাদের রাণী ভুল করে আর একজনকে দস্যু বনহুর বানিয়ে বন্দী করে এনেছে……না না চন্দনা, আমি ওদের সামনে মুখ দেখাতে পারবো না। তাছাড়া ওরা জানে, ওদের রাণী কোনোদিন ভুল করতে পারে না।
রাণীর মুখমণ্ডল গম্ভীর ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। দস্যু বনহুরের চেয়ে সে কোনো অংশে কম নয়। বনহুরের নামে দেশবাসী যেমন আতঙ্কগ্রস্ত, তেমনি দস্যু রাণী নামেও মানুষ শিউরে উঠে। ধন কুবেরদের তো আতা খাঁচাছাড়া হয়।
