রাণী!
হা চন্দনা।
রাণী, প্রথমেই আমার সন্দেহ হয়েছিলো, তার কথাবার্তা, চাল-চলন মোটেই সাধারণ মানুষের মতো ছিলো না। প্রত্যেকটা কথায় ছিলো তার অদ্ভুত এক বলার ভঙ্গী….
চন্দনা, এখন কি করবো?
জানি, এ ভুলের জন্য চরম এক অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। দস্যু বনহুর আমাদের এই বোকামি লক্ষ্য করে নিশ্চয়ই মনে মনে বিদ্রূপ করেছে। চন্দনা, আমি যদি পূর্বে কোনোদিন দস্যুটাকে এক নজর দেখতাম তাহলেই এমন ভুল হতো না।
রাণী, তুমি কি করে বুঝলে যাকে তুমি আটক করেছে সে দস্যু বনহুর নয়?
তার সঙ্গে কথাবার্তায় আমি বুঝেছি। কারণ দস্যু বনহুর যে সে নয়, এটা সে নিজেই তার প্রমাণ।
সত্যি, তুমি অদ্ভুত নারী রাণী–কোনটা আসল, কোনটা নকল তা তার কথাবার্তার মধ্যেই আবিষ্কার করে নিয়েছো। রাণী, আমার কিন্তু এখনও সন্দেহ আছে তুমিই তো ভুল করছো না?
তার মানে? ভ্রূ কুঞ্চিত করে তাকালো রাণী চন্দনার মুখের দিকে।
চন্দনা বললো–যাকে তুমি প্রদীপ কুমার বলে ভুল করছো আসলে সেই দস্যু বনহুর?
না, তেমন ভুল আমার হবে না।
রাণী, চঞ্চলার মৃত্যু…।
ঐ বিশ্বাসঘাতকিনীর নাম মুখে এনো না চন্দনা। ওকে হত্যা না করলে সে নিশ্চয়ই আমার গোপন রহস্য ফাঁস করে দিতো। হাঁ, ওর মৃতদেহ এসে পৌঁছেছে?
এখনও এসে পৌঁছায়নি।
ওকে সমাধিস্থ না করে আমার হিমাগারে রেখে দিও। কোনোদিন ওর পিতা ফিরে এলে তাকে তার কন্যা ফেরত দেবো।
রাণী, তুমি সত্যি পাষাণী। যাকে তুমি নিজের হাতে হত্যা করছে, তারই মৃতদেহ কি করে তার স্নেহময় পিতার হাতে তুলে দেবে?
রাণী হঠাৎ হেসে উঠলো, অদ্ভুত সে অট্টহাসি, তারপর হাসি থামিয়ে বললো–পাষাণীই শুধু নই চন্দনা যে কাজ আমি করি তা নরপিশাচিনীর চেয়েও জঘন্য! চঞ্চলার জন্য আমি দুঃখিত কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না।
আচ্ছা রাণী, দস্যু বনহুর তোমার কি ক্ষতি করেছে যে কারণে তুমি তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে?
সে কথা আজ নতুন করে শুনতে চাস তুই?
হাঁ রাণী।
দস্যু বনহুর আমার আত্নসম্মানে আঘাত করেছে। সে মনে করে এ পৃথিবীতে তার মতো দ্বিতীয় কোনো দস্যু নেই যার সঙ্গে তার তুলনা হয়।
এ কারণেই তুমি তাকে…
হাঁ চন্দনা, আমি যতোক্ষণ তাকে বন্দী করতে সক্ষম না হয়েছি ততক্ষণ আমার স্বস্তি নেই। এটা আমার মনের ইচ্ছা, বুঝলি?
যদিও আগে হতেই আমি বুঝেছিলাম তবু আবার নতুন করে বুঝলাম, শুনলাম তোমার মুখে।
চন্দনা, দস্যু বনহুরকে দেখিনি তবে শুনেছি মন্থনার রাজকুমার প্রদীপের চেয়েও সুন্দর। তার সেই সৌন্দর্যের মোহে সবাই আকৃষ্ট হয়ে তাকে ভালবেসে ফেলে। শুনেছি সেই সুযোগ নিয়েই সে সকলের….
সর্বনাশ করে, এই তো?
সর্বনাশ না করলেও আমি বলি সে যা করে তা অন্যায়। বহু নারীর হৃদয় সে জয় করে নিয়েছে তাদের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কাউকেই ধরা দেয় না। দাঁতে দাঁত পিষে বলে রাণী–নারীদের নিয়ে সে খেলা করে, এ তার চরম অপরাধ। জানিস চন্দনা, আমার বান্ধবী হীরা বাঈকে সে ধোকা দিয়েছে। রাজকুমারী হীরা আজও ঐ দস্যুর প্রেমে আত্নহারা। সে এখনও তার মূর্তি হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে একদিন নাকি সে ফিরে আসবে তার কাছে।
চন্দনা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে–হীরা বাঈ! কে সে হীরা বাঈ রাণী?
সিন্ধের রাজকুমারী হীরা।
সেই হীরা তোমার বান্ধবী?
হাঁ চন্দনা, ছোটবেলায় একসঙ্গে কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সিন্ধের এক মেলায়। যদিও সে রাজকুমারী তবু তার যে ব্যবহার আমি পেয়েছি তা কোনোদিনই ভুলবো না।
রাণী, কই ওর সম্বন্ধে তুমি তো কোনোদিন বলোনি?
একটু হেসে বললো রাণী—এতো সময় আমার হাতে কই চন্দনা।
না, ওর সম্বন্ধে তোমাকে বলতেই হবে, কারণ যে নারী দস্যু বনহুরকে প্রাণ দিয়ে। ভালবেসেছিলো অথচ তার কাছে পেয়েছে উপেক্ষা….
উপেক্ষা নয়, অবজ্ঞা বলতে পারিস। আজ নয়, আর একদিন বাবা তোকে হীরা বাঈয়ের কথা।
মনে থাকবে তো?
নিশ্চয়ই থাকবে।
শোনো রাণী, একটা কথা তোমাকে এখনও বলা হয়নি।
কি কথা?
আওরঙ্গ নামে এক বৃদ্ধ সারেঙ্গ আমার সঙ্গে এসেছে। বেচারা বড় দুঃখী। আমাকে ও মেয়ের মতো ভালবাসে। যদি তুমি মত দাও তাহলে আমি ওকে আমার কাছে রাখতে পারি?
বেশ, তোর যদি এতো দয়া হয় রাখতে পারি। কিন্তু মনে রাখিস্ কোনো চালাকি-টালাকি নেই তোর ওর মধ্যে?
না না, সে সব আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই তবে সঙ্গে এনেছি। বড় ভাল, বড় সহজ-সরল লোক, তাছাড়া বুড়োমানুষ।
ঠিক ঐ মুহূর্তে একজন অনুচর এসে কুর্ণিশ জানিয়ে বললো–রাণীজি, লাশের বাক্স এসে গেছে।
রাণী চন্দনাকে লক্ষ্য করে বললো-যাও চন্দনা, চঞ্চলার মৃতদেহ কফিন সহ হিমাগারে রেখে দাওগে।
চন্দনা কোনো কথা না বলে চলে যায়।
*
চমকে উঠে আওরঙ্গ, তার সম্মুখে চারজন লোক একটি কফিন বহন করে এনে রাখলো। বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো আওরঙ্গ, হঠাৎ যেন সে আঁতকে উঠে। সিমকী সেই যে চলে গেছে এতোক্ষণও ফিরেনি। কক্ষমধ্যে যারা কাজ করছিলো তারা কেউ কেউ এখনও কাজ করছে, আর কেউ কেউ চলে গেছে নিজ নিজ কাজ সমাধা করে অন্য কাজে।
আওরঙ্গ বসে বসে হাঁপিয়ে উঠছিলো, সে মাথাটা দু হাঁটুর মধ্যে খুঁজে ঝিমুচ্ছিলো। কফিন রাখার শব্দে এবং লোকজনের কথা বার্তায় তন্দ্রা ছুটে যায় তার, সজাগ হয়ে বসে। ভাবে আওরঙ্গ এ কফিন এলো কোথা থেকে। সে অবশ্য চঞ্চলার মৃতদেহের সম্বন্ধে জানতো কিন্তু চোখে সে দেখেনি, তাই বুঝতেও পারেনি কিছু।
