কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িখানা পৌঁছে গেলো বনের পাশে।
একটি পথ বনের মধ্যে চলে গেছে সোজাসুজিভাবে। ঐ পথে ঘোড়াগাড়িখানা চলতে লাগলো।
সিমকী আবার বললো—আওরঙ্গ, ঘাবড়ে যাচ্ছে না তো? বলেছি যা দেখবে কাউকে বলবে না?
না, বলবো না কাউকেই।
হাঁ, সব সময় মনে রাখবে এ কথাটা এবং সে কারণেই তোমাকে আমি সঙ্গে এনেছি।
সব মনে আছে আমার মা। বললো আওরঙ্গ।
সিমকী গলা বাড়িয়ে কথা বলছিলো, এবার সে সোজা হয়ে বসে।
দুপাশে গহন বন, মাঝখান দিয়ে সরু পথ। বনের মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশে সক্ষম নয়। একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে বনটার মধ্যে।
কিছুদূর এগিয়ে একটা পোড়োবাড়ি নজরে পড়লো। ঠিক পোড়ো-বাড়ি নয়, মন্দিরের ভগ্নাবশেষ।
গাড়িখানা সেই মন্দিরের সম্মুখে এসে থামলো। নেমে দাঁড়ালো সিমকী, আওরঙ্গও নেমে পড়েছে, সে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে চারিদিকে।
সিমকী হেসে বললো–খুব আশ্চর্য হয়ে গেছে, তাই না? এটাই আমার বাড়ি। তুমি থাকবে আমার কাছে কাছে, কেমন?
একটা ঢোক গিলে বললো আওরঙ্গ-আচ্ছা। চোখেমুখে তার বিস্ময় ও ভয় ফুটে উঠেছে। সে কোনোদিন বনজঙ্গলে আসেনি। এটাই তার প্রথম বনের মধ্যে আসা, কাজেই একটু ঘাবড়ে যাবার কথাই বটে।
সিমকী বললো–কদিন থাকলেই অভ্যাস হয়ে যাবে আওরঙ্গ। এসো আমার সঙ্গে।
মন্দিরের ভাঙা দরজা পেরিয়ে ভিতরে চলে গেলো সিমকী। আওরঙ্গ তাকে অনুসণ করলো।
কোচোয়ান গাড়ি নিয়ে ফিরে চললো আবার।
সিমকী ভাঙা মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আওরঙ্গকে লক্ষ্য করে বললো–সাবধান, কোনো কথা বলবে না।
আচ্ছা মা।
সিমকী এগিয়ে চলেছে।
যতো এগুচ্ছে আওরঙ্গ ততোই অবাক হচ্ছে, বাইরে থেকে ভাঙা মন্দির দেখা গেলেও ভিতরটা ভাঙা বা নোংরা নয়, সুন্দর ঝকঝকে সান বাঁধানো পথ। দুপাশে পাথুরে দেয়াল। দেয়ালে এক স্থানে মশাল গোঁজা আছে। মশালের উজ্জ্বল আলোতে ঝলমল করছে চারদিক।
কিছুটা এগুতেই দুজন অস্ত্রধারী প্রহরী পথ রোধ করে দাঁড়ালো।
সিমকী হাত বাড়িয়ে অংগুরি দেখাতেই ওরা অস্ত্র সরিয়ে নিয়ে পথ মুক্ত করে দিলো।
আওরঙ্গ অবাক হয়ে এগুচ্ছে। সিমকী বারণ করে দিয়েছে কোনো কথা সে বলবে না, তাই সে চুপচাপ রয়েছে। যতোই এগুচ্ছে ততোই বিস্মিত হচ্ছে আওরঙ্গ। তাকে সিমকী কোথায় নিয়ে এলো।
কিছুদূর এগুতেই আরও দুজন প্রহরী পথ রোধ করে দাঁড়ালো।
সিমকী তাদের সম্মুখেও হাত বাড়িয়ে ধরলো, সঙ্গে সঙ্গে পথ মুক্ত করে দিলো প্রহরী দুজন।
এক স্থানে এসে একটা ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে সিমকী এবার নিচের একটি বিরাট কক্ষমধ্যে এসে দাঁড়ালো। সেখানে অনেকগুলো জোয়ান বসে বসে অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করছিলো।
সিমকীকে দেখেই ওদের মধ্য থেকে একজন বললো-চন্দনা এসেছে? পরক্ষণেই লোকটা আওরঙ্গকে লক্ষ্য করে বললো–একে তো চিনতে পারছি না, কে এ?
সিমকী হেসে বললো-বেচারা আমাকে ওর মেয়ের মতো দেখে মেয়ে বানিয়ে নিয়েছে। বৃদ্ধ এককালে সারেঙ্গ ছিলো, উপস্থিত খালাসির কাজ করতো। আমি ওকে নিয়ে এলাম, বড় কষ্ট ওর……
তা একেবারে গুহার অভ্যন্তরে?
অবিশ্বাসের কিছু নেই। ও খুব ভাল…..শোনো হামিদ, একে রাখো, যখন রাণীর হুকুম পাবো তখন ওকে তার সম্মুখে হাজির করবো।
বললো হামিদ—একে দিয়ে কি কাজ হবে?
বড় বিশ্বাসী……জানো তো পিপীলিকাও কাজে আসে। আওরঙ্গ, তুমি এখানে বসো, বিশ্রাম করো।
আচ্ছা মা জি! বলে পাশের একটা টুলের উপর বসে পড়লো আওরঙ্গ।
সিমকী চলে গেলো।
ঠিক ওটা কক্ষ নয়, ভূগর্ভে একটি গুহা গুহার মধ্যে নানা রকম অস্ত্র থরে থরে সাজানো। নানারকম কলকারখানা আর বিরাট বিরাট পিপে ভর্তি নানারকম গোলাবারুদ।
*
দেয়ালে নানারকম পোশাক এবং ঢাল-তলোয়ার। আরও অনেক রকম সাজ-সরঞ্জাম রয়েছে। আওরঙ্গ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আর বারবার হাই তুলছিলো।
সিমকী সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা এগিয়ে চললো। কিছুটা সুড়ঙ্গপথ অতিক্রম করে সে নেমে এলো আরও নিচে।
একটি বিরাট গুহাকক্ষ।
কক্ষমধ্যে সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট একটি নারীমূর্তি। সমস্ত দেহ আলখেল্লায় ঢাকা। মুখের নিচের অংশ কালো রুমালে আচ্ছাদিত।
সিমকী এসে কুর্ণিশ জানালো।
সিংহাসনে উপবিষ্ট নারীমূর্তি বললো—-এসেছো?
সিমকী বললো-হাঁ রাণী, কিন্তু একটি দুঃসংবাদ।
দুঃসংবাদ! অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো নারীমূর্তি।
সিমকী বললো–শেষ পর্যন্ত প্রদীপ কুমার নিখোঁজ।
নারীমূর্তি ইংগিত করলো যারা তখন কক্ষমধ্যে দাঁড়িয়েছিলো তাদের বেরিয়ে যাবার জন্য।
সঙ্গে সঙ্গে অভিবাদন জানিয়ে নারীমূর্তির অনুচরগণ বেরিয়ে গেল।
নারীমূর্তি মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললো—তীব্রকণ্ঠে বললো–প্রদীপ কুমার নিখোঁজ?
হা রাণী।
আশ্চর্য……নারীমূতি আসন ত্যাগ করে সিংহাসনের পাশে পায়চারী করতে লাগলো তার দীপ্ত সুন্দর ভু জোড়া কুঁচকে উঠেছে।
সিমকী নির্বাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো নারীমূর্তির মুখে।
নারীমূর্তি বললো—চন্দনা, যাকে আমরা বন্দী করে এনেছি সে আসলে দস্যু বনহুর নয়।
সিমকী অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–বলো কি রাণী?
হাঁ চন্দনা, জীবনে এ আমার চরম পরাজয়। আশ্চর্য, এদের দুজনার চেহারা সম্পূর্ণ এক।
সিমকী বললো–তবে কি তুমি বলতে চাও যাকে তুমি বন্দী করে এনেছে সেই প্রদীপ কুমার?
হাঁ
কিন্তু……;
কোনো কিন্তু নেই, যার সঙ্গে তুমি প্রেমের অভিনয় করেছিলে তিনিই স্বয়ং দস্যু বনহুর।
