আজ সেও এসে সিমকীর পাশে দাঁড়ালো, বললো কেঁদো না মা, আমি তোমার পাশে আছি।
সময়মতো জাহাজ শাহান শাহ এসে মন্থনা দ্বীপে পৌঁছলো।
জাহাজ শাহান শাহ বন্দরে ভিড়তেই অপেক্ষমান আত্নীয়স্বজন এগিয়ে এলো যার যার আত্নীয়স্বজনকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে নামিয়ে নিতে।
বন্দরে একটা আনন্দপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিলো, কারণ যার যার আত্নীয়স্বজন নিজেদের জনকে পেয়ে খুশিতে আত্নহারা হয়ে উঠেছে। নিজের নিজের জনকে বুকে জড়িয়ে আনন্দধ্বনি করছে।
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন মন্থনার রাজা এবং মহারাণী তাদের পুত্র প্রদীপ কুমারকে নামিয়ে নিতে। চোখেমুখে তাদের খুশির উচ্ছ্বাস, কততদিন পর তারা সন্তানকে কাছে পাবেন কিন্তু হায়রে দুরাশা, কোথায় তাদের সেই সন্তান। একটু পরেই তারা জানতে পারেলেন প্রদীপ কুমার জাহাজ থেকে উধাও হয়েছে। কোথায় গেলো সে কেউ জানে না।
সংবাদ শুনে হায় হায় করে উঠলেন মহারাজ এবং মহারাণী। মুহূর্তের মধ্যে মন্থনা বন্দরে একটা শোকের হাওয়া বইতে শুরু করলো।
চঞ্চলার আত্নীয়স্বজনও এসে যখন শুনলো চঞ্চলার মৃত্যু সংবাদ তখন আরও একটা কান্নার রোল পড়লো।
সমস্ত বন্দর জুড়ে একটা অশান্তির স্রোত বয়ে চললো। জাহাজ থেকে কফিনে বরফ দেওয়া চঞ্চলার মৃতদেহ নামানো হলো।
সিমকীও এক সময় নেমে এলো জাহাজ থেকে। আওরঙ্গ কথা দিয়েছিলো, সব সময় তার সঙ্গে থাকবে তাই সিমকীর জিনিসপত্র মাথায় নিয়ে নেমে এলো সে সিমকীর পিছনে পিছনে।
অবশ্য সিমকী বলেছিলো, তুমি কেন যাবে আমার সঙ্গে আওরঙ্গ, আমি তো আর তোমার মেয়ে নই? বলেছিলো আওরঙ্গ, তুমি আমার মেয়ের মতো দেখতে, তাই তোমাকে ছাড়তে পারবো না মা আমি।
বেশ চলো কিন্তু মনে রেখো আমার সঙ্গে গেলে যা দেখবে তা কারো কাছে বলবে না।
তওবা তওবা, মেয়ের কাছে বাপ থাকবে আর মেয়ের কথা বলবে সে লোকের কাছে, কি যে বলো মা!
আচ্ছা চলো।
বুড়ো আওরঙ্গ খুশি হয়ে চললো সিমকীর সঙ্গে।
বন্দরের বাইরে বেরিয়ে এলো সিমকী। চোখে গগলস, হাতে এটাচ ব্যাগ। সঙ্গে আওরঙ্গ, তার মাথায় সুটকেস আর বেডিং।
আওরঙ্গ জাহাজের সারেঙ্গ ছিলো এককালে, এখন সে শাহান শাতে খালাসির কাজ করতো। ওকে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় এক সময় তার দেহখানা বলিষ্ঠ ছিলো। মাথায় ওর কাঁচা-পাকা একরাশ চুল। মুখে চাপদাড়ি। বয়সের তাড়নায় চোখেমুখে একটা ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ পড়েছে। দেখলে মায়া হয়। সিমকী তাই ওকে ফিরিয়ে দিতে পারলো না।
বন্দরের অদূরে দাঁড়িয়েছিলো একটা ঘোড়াগাড়ি। সিমকী হাত তুলে ইশারা করতেই কোচোয়ান গাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসে।
কোচোয়ানটা যেন সিমকীর জন্যই অপেক্ষা করছিলো।
গাড়িটা এগিয়ে আসতে সিমকী চেপে বসে! আওরঙ্গকে গাড়ির পিছনে পা-দানিতে দাঁড়াতে বলে সিমকী।
গাড়ি চলতে থাকে।
আওরঙ্গ একটু অবাক হয়, সিমকী তো তার গন্তব্যস্থানের কথা বললো না। তবে কি এ গাড়িখানা তাদের নিজের? হয়তো তাই হবে। যাক, এসব নিয়ে তারা মাথা ঘামানোর দরকার কি। যদি দুবেলা দুমুঠো খেতে পায়, একটু মাথা গুজবার আশ্রয় পায়, তাহলেই তার পক্ষে যথেষ্ট। পৃথিবীতে ওর আপনজন বলতে কেউ নেই।
আওরঙ্গ শাহানশাহে খালাসির কাজ করে যা দুচার টাকা পেতো তা দিয়ে কোনোরকমে পেটের খোরাকটা চলতো। পোশাক পরিচ্ছদ তার বহু পুরোন, বহুকালের। যখন সে সারেং ছিলো তখন যে কাপড় ছিলো তাই তার শরীরে, একটু বোকাটে ধরনের।
ঘোড়াগাড়ির পা-দানিতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলো সে তার উপস্থিত অবস্থার কথা। পুঁটলিটা ঝুলিয়ে রেখেছে পাশের হ্যান্ডেলের সঙ্গে, ঐ পুঁটলিই তার সম্বল। ওর মধ্যে আছে তার পুরোন জামাকাপড় আর একটা ছেঁড়া কম্বল।
মন্থনা দ্বীপে কোনোদিন আওরঙ্গ আসেনি, তাই সে অবাক হয়ে দেখছিলো চারদিকে তাকিয়ে।
ঘোড়াগাড়িখানা রাজপথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সিমকী আওরঙ্গকে ডেকে বলছে-আওরঙ্গ, ঠিকমতো দাঁড়িয়ে আছে তো?
আওরঙ্গ জবাব দিচ্ছে–আছি মা, ঠিক দাঁড়িয়ে আছি।
দেখো পড়ে যেওনা যেন।
না না, পড়বো না মা, বুড়ো হলেও হাতে জোর আছে।
ওর কথা শুনে হাসে সিমকী।
ঘোড়াগাড়িখানা এপথ সেপথ ঘুরেফিরে একটা গলির মধ্যে প্রবেশ করলো। গলিটা কেমন যেন অন্ধকার মনে হচ্ছে।
গাড়িখানা এগুচ্ছে।
কোচোয়ান তার আসনে বসে ঘোড়া দুটোকে চালনা করছে।
পিছনের পা-দানিতে দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধ আওরঙ্গ।
ঘোড়াগাড়িখানা গলিপথ অতিক্রম করে বেরিয়ে এলো বাইরে। এবার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো আওরঙ্গ। সে আজীবন সমুদ্রে মুক্ত বাতাসে কাটিয়েছে। বদ্ধ গলি তার কাছে অসহ্য।
মুক্ত প্রান্তর অতিক্রম করে গাড়িখানা এগিয়ে চললো। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর সম্মুখে একটি বিরাট বন নজরে পড়লো।
গাড়িখানা সেই বন অভিমুখে এগুতে লাগলো।
আওরঙ্গ বললো-মা জি, আর কতোদূর যেতে হবে?
গাড়ির ভিতর থেকে সিমকীর কণ্ঠ ভেসে এলো-আর বেশি দূর নয় আওরঙ্গ। এইতো : সম্মুখে যে বন বা জঙ্গল দেখছে সেখানে।
আওরঙ্গ মনে মনে একটু ভড়কে গেলেও মুখে সে কোনো কথা বললো না। জঙ্গলের মঙ্গে ওর বাড়ি, এ কেমন কথা!
গাড়িখানা দ্রত ছুটছে।
এলোপাতাড়ি এবড়ো থেবড়ো পথ। গাড়িখানা বেজায় ঝাঁকুনি খাচ্ছিলো। শক্ত করেই ধরে আছে আওরঙ্গ গাড়ির পিছন হ্যান্ডেলখানা। মাঝে মাঝে যদিও সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলো তবু সে যাতে পড়ে না যায় সেজন্য হুশিয়ার ছিলো সব সময়।
