সিমকী একটা চেয়ারে বসে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
বনহুর মনে মনে হাসছে সিমকীর অভিনয় অভিজ্ঞতা তাকে অভিভূত করলো। দুঃখভরা কণ্ঠে বললো–মিস সিমকী, সত্যি আমরা সবাই দুঃখিত। হঠাৎ আপনার মা এমনভাবে নিরুদ্দেশ হবেন, আমরা কেউ ভাবতেও পারিনি। আমার বন্ধুর জন্যও ঠিক আপনার মতই আমার মনের অবস্থা কিন্তু কি করবো বলুন, ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কি উপায় আছে। একটু থেমে ক্যাপটেনকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর আপনি বিশেষভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে এই অদ্ভুত রহস্যের সমাধান করুন।
ক্যাপটেন বললো–আমি চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি রাজকুমার কিন্তু সব যেন কেমন রহস্যময় বলেই মনে হচ্ছে। জানি না কেন এমন হলো। ক্যাপটেন কথাগুলো বলে যেমন ব্যস্তভাবে এসেছিলো তেমনি ব্যস্ততার সঙ্গে বেরিয়ে যায়। সিমকী তখনও তেমনি বসে দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
বনহুর মৃদু হাসে।
এগিয়ে আসে সে সিমকীর পাশে, ওর কাঁধে হাত রেখে ব্যথাভরা কণ্ঠে বলে–মিস সিমকী, আপনি চিন্তা করবেন না, আমার মনে হয় আপনার মা ঠিকই জীবিত আছেন, হয়তো ভালভাবেই আছেন।
সিমকীর কান্না যেন বেড়ে যায়, সে বনহুরের হাতখানা টেনে নেয় দুহাতের মুঠায়, তারপর বলে–প্রদীপ কুমার, আমি এখন কি করবো বলুন? আমার মা ছাড়া আমি একটি দিনও থাকতে পারি না। কি করবো বলুন?
মিস সিমকী, আমাকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। মন্থনায় না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি আপনার সঙ্গে আছি এবং থাকবো।
সত্যি আপনি মহৎ ব্যক্তি।
মিস সিমকী, আপনার মায়ের জন্য আমি সন্ধান করবো।
সিমকীর মুখখানা কিছুটা প্রসন্ন হয়ে উঠে। সে উঠে দাঁড়ায়। বনহুরের হাতখানা তখনও তার হাতের মুঠায়, বলে সিমকী–আপনি আছেন বলেই আমি সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছি প্রদীপ কুমার, নাহলে সত্যি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্নহত্যা করতাম।
তা কি করে ভাবতে পারলেন মিস সিমকী! মা বুড়ো হলে এক দিন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এটা ঠিক। তিনি না মরে উধাও হয়েছেন তাতে ভেঙে পড়ছেন কেন। চলুন আপনাকে ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে আসি।
সিমকী রুমালে চোখ মুছে উঠে পা বাড়ালো।
বনহুর এগিয়ে চললো ওর পাশে পাশে। ক্যাবিনে পৌঁছে বললো সিমকী-বসবেন না একটু।
আপনি যদি খুশি হন নিশ্চয়ই বসবো।
বসুন। বললো সিমকী।
বনহুর বসলো। সিমকী বললো–রাতে আমার মা আমার পাশেই ঘুমিয়ে ছিলেন।
বনহুর বললো–ঠিক আমার বন্ধুর উধাও ব্যাপারের সঙ্গে আপনার মায়ের উধাও ব্যাপারটা যেন একই সঙ্গে জড়িত।
একটা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে সিমকী-হয়তো তাই হবে। প্রদীপ কুমার?
বলুন?
সত্যি মাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না?
নিশ্চয়ই পাবেন।
আপনি ঠিক বলছেন?
মনে হয় পাবেন।
আপনার কথা যেন সত্য হয় প্রদীপ কুমার।
বনহুর বহু নারীকে দেখেছে কিন্তু সিমকীর মত অভিনয় দক্ষ নারী সে কমই দেখেছে। বনহুর মনে মনে হাসলেও মুখোভাবে সে সম্পূর্ণ না জানার এবং না বোঝার ভান করে চললো।
*
জাহাজ মন্থনায় পৌঁছবার পূর্বদিন রাতে বনহুর ভীষণভাবে চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লো। কাল যখন বন্দরে জাহাজ ভিড়বে তখন রাজপুত্র প্রদীপ কুমারকে অভ্যর্থনা জানিয়ে এগিয়ে নিতে আসবে তার বাবা-মা স্ত্রী মীরা দেবী কিন্তু তখন সে কি করে অভিনয় করবে প্রদীপ কুমারের। না-না, তা হয় না, প্রদীপের বৃদ্ধ পিতামাতা এবং স্ত্রীকে সে ধোকা দিতে পারবে না। তবে কি সে স্পষ্ট বলবে। আমি তোমাদের ছেলে প্রদীপ নই। তা বললে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না। কিংবা পুত্রশোকে কোনো অঘটন ঘটতে পারে। তবু পারবে না সে এতোবড় মিথ্যা অভিনয় করতে।
হারিয়ে গেছে প্রদীপ কুমার, সেও হারিয়ে যাবে সবার অলক্ষ্যে জাহাজ শাহান শা থেকে।
সত্যিই পরদিন ভোরে বনহুরের ক্যাবিন শূন্য। সমস্ত জাহাজে ভীষণ একটা আলোড়ন শুরু হলো। রাজকুমার প্রদীপ গেলো কোথায়?
কে দেবে তার জবাব?
সিমকী তো মাথায় হাত দিয়ে ক্যাবিনের মেঝেতে বসে পড়লো। তার মুখে কোনো কথা নেই, সে যেন সম্পূর্ণ বোবা বনে গেছে। মিঃ আলম কিভাবে উধাও হয়েছে, কোথায় আছে, কেমন আছে, সব জানে সে তার মা কোথায় গেছে তাও তার অজানা নেই কিন্তু প্রদীপ কুমার গেলো কোথায়? সত্যিই সে উবে গেছে যেন।
সিমকী নিজে সন্ধান করলো সমস্ত জাহাজের সব জায়গায় কিন্তু কোথাও সে তাকে খুঁজে পেলো না।
ক্যাপ্টেন সিমকীকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো।
সিমকী জানালো, প্রদীপ কুমারই ছিলো তার ভরসা। মাকে হারিয়ে সে যতো ব্যথা না পেয়েছিলো তার চেয়ে বেশি ব্যথা পেয়েছিলো প্রদীপ কুমারের নিরুদ্দেশ ব্যাপারে।
বৃদ্ধ সারেঙ্গ আওরঙ্গও খবর শুনে এসে হাজির। সিমকীকে সে নিজের মেয়ের মতো মনে করতো। একদিন সিমকী আর তার মা যখন ডেকে দাঁড়িয়েছিলো তখন সারেঙ্গ আওরঙ্গ দূর থেকে তাদের দেখে এগিয়ে এসেছিলো, নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলো সে সিমকীর দিকে।
সিমকীর মা বিরক্ত হয়ে উঠেছিলো আওরঙ্গের এই অদ্ভুত আচরণে।
সিমকীও সেদিন কম অবাক হয়নি, সে বলেই বসেছিলো-অমন হা করে কি দেখছো আমার দিকে চেয়ে চেয়ে?
আওরঙ্গ বলেছিলো ব্যথারুণ কণ্ঠে–মা তোমার মত আমার একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটি জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলো, তারপর তাকে আর খুঁজে পাইনি। বলে হাতের পিঠে চোখ মুছে ছিলো আওরঙ্গ।
