বনহুর নিজকে প্রস্তুত করে নিলো। তাকে এই গভীর রহস্যের সমাধান করতেই হবে। আজ মনে পড়লো কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। এবার কান্দাই ফিরে একটি দিনের জন্য সে বিশ্রাম গ্রহণ করবার সুযোগ পায়নি। সমস্ত দেশ জুড়ে একটা বিভীষিকাময় অবস্থা বিরাজ করছিলো। চারিদিকে অন্যায়-অনাচার-অবিচার-শোষণ-নিষ্পেষণ চলছিলো। জনগণ এক চরম অবস্থায় উপনীত হয়েছিলো। এ কারণে তাকে অক্লান্ত চেষ্টা চালাতে হয়েছে। একদল নরপশুর নির্মম আচরণে জনগণ হাঁপিয়ে উঠেছিলো, তাদেরকে দমন করতে হয়েছে তাকে। তার প্রচেষ্টা বিফল হয়নি, চোরাচালানী দল সম্পূর্ণ বিনাশ না হলেও সংখ্যায় অনেক কমে গেছে। কান্দাইবাসীদের মনে ফিরে এসেছে শান্তি আর আনন্দ। তবে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি দেশবাসী, কারণ এখনও দেশের মধ্যে আত্নগোপন করে আছে অনেকগুলো নেত্ৰীস্থানীয় নরপশু, যারা সরকারের সহকারী হিসেবে দেশবাসীর মঙ্গলের অভিনয়ের আড়ালে করে চলেছে তাদের সর্বনাশ।
বনহুর এদের সন্ধান জানলেও তাদের নিয়ে মাথা ঘামাতে পারেনি, কারণ সময় ছিলো না তার হাতে। প্রদীপ কুমারের বন্দী জীবন তাকে বেশ করে ভাবিয়ে তুলেছিলো। একবার নয়, দু দুবার বেচারা প্রদীপ শুধু তারই জন্য নাকানি-চুবানি খেয়েছে বা খাচ্ছে। একটা নিরীহ মানুষ কারাগারের কঠিন শাস্তি পেতে থাকবে আর সে আরামে দিন কাটাবে, তা হতে পারে না।
বনহুর তাই প্রদীপ কুমারের উদ্ধার ব্যাপার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলো। প্রদীপ কুমারের মুক্তি তাকে শুধু আনন্দই দেয়নি, তার মনে এনে দিয়েছিলো একটা শান্তি, একটা নিশ্চিন্ত ভাব। বনহুর তাই রহমানের কাছে বিদায় নিয়েই রওয়ানা দিয়েছিলো প্রদীপ কুমারের সঙ্গে, পথে যেন তার আর কোনো বিপদ না আসে। বেচারার জন্য আজ তাই বেশি করে ভাবনায় পড়েছে বনহুর। কোথায় আছে সে আর কি অবস্থাতেই বা আছে কে জানে!
বনহুর সমস্ত জাহাজখানা তন্নতন্ন করে খুঁজেছে কিন্তু প্রদীপ কুমারকে সে খুঁজে পায়নি। বড় আশ্চর্য লাগছে বনহুরের কাছে। এমনভাবে তার পরাজয় কোনোদিনই হয়নি।
কিন্তু তাকে অসীম ধৈর্য সহকারে প্রতীক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না জাহাজখানা মন্থনা দ্বীপে গিয়ে পৌঁছে। পুরো তিন সপ্তাহ কেটে গেছে, এখন মাত্র কয়েকটা দিন। এই কয়েকটা দিন কেমনভাবে কাটবে কে জানে।
চিন্তার অতলে তলিয়ে যায় বনহুর। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতেই পারে না সে। হঠাৎ গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। কেমন যেন একটা নীলাভ আলোকরশ্মি তার ক্যাবিনের জানালার পথে এসে পড়েছে ক্যাবিনের দেয়ালে। বনহুর দ্রুত তার শয্যা ত্যাগ করে ক্যাবিনের জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। জানালা বন্ধ ছিলো, তাই বনহুর জানালার শার্শীর ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ক্যাবিনের বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ভরা অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো আপন মনে– উড়ন্ত যান! একটি ছোট্ট উড়ন্ত যান দাঁড়িয়ে আছে জাহাজের ডেকে ঠিক সিমকীদের ক্যাবিনের সম্মুখে। উড়ন্ত যান থেকে নীলাভ আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছে।
সিমকীদের ক্যাবিনের দরজা খোলা বলে মনে হলো। ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এলো সিমকীর মা।
বনহুর লক্ষ্য করছে।
সিমকীও এসে দাঁড়ালো মায়ের পিছনে।
উড়ন্ত যানটির সম্মুখে এসে সিমকীর মা সোজা হয়ে দাঁড়ালো এবং সঙ্গে সঙ্গে তার দেহ থেকে খসে পড়লো বৃদ্ধার ড্রেস। বনহুরের দুচোখে রাজ্যের বিস্ময় ঝরে পড়ে। সিমকীর মার অদ্ভুত পরিবর্তন। আসলে সে বৃদ্ধ নয়, এক অপূর্ব সুন্দরী নারী বৃদ্ধার ড্রেসের নিচে ছিলো। অদ্ভুত এক ড্রেস।
সিমকীর মা উড়ন্ত যানের দিকে এগুলো।
সিমকী নত হয়ে তাকে অভিবাদন করলো।
সিমকীর মা উড়ন্ত যানে উঠে পড়তেই যানটি ভেসে উঠলো আকাশে, তারপর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
বনহুর ফিরে এলো তার বিছানার পাশে, কিন্তু শয্যা গ্রহণ করতে সে পারলো না। পায়চারী করতে করতে ভাবতে লাগলো কেন জাহাজের মধ্যে কোনো জায়গায় প্রদীপের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। ঐ উড়ন্ত যানে করেই তাকে জাহাজ শাহান শাহ থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে? কে এই সিমকী আর সিমকীর মায়ের বেশেই বা কে সেই নারী, যে নারী আজ উড়ন্ত যানে শাহান শাহ ত্যাগ করলো?
সমস্ত রাত অনিদ্রায় কাটলো বনহুরের।
ভোরে সোফায় হেলান দিয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছে এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ক্যাবিনে প্রবেশ করে ক্যাপটেন, তার পিছনে সিমকী।
বনহুরের নিদ্রা ছুটে যায়, সে দড়বড় করে উঠে দাঁড়ায়, চোখেমুখে বিস্ময় টেনে তাকায় সে ক্যাপটেন এবং পর মুহূর্তে সিমকীর মুখে।
ক্যাপটেন ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠে-রাজকুমার, আজ আবার এক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনা!
হাঁ, জানি না জাহাজে কি হলো। সেদিন আপনার বন্ধু হঠাৎ ক্যাবিন থেকে উধাও হলো। তারপর শাহান শাহের অন্য ক্যাবিনের যাত্রী মিস চঞ্চলার অকস্মাৎ মৃত্যু। আজ আবার মিস সিমকীর মায়ের নিরুদ্দেশ……।
ক্যাপটেনের কথা শেষ হয় না, তাকায় বনহুর পুনরায় সিমকীর মুখে। সিমকী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো কিন্তু দুচোখে তার একটা দ্যুতি খেলে গেলো, বললো—- মিস সিমকীর মা নিরুদ্দেশ, বলেন কি ক্যাপেটেন?
হাঁ, সমস্ত জাহাজে তল্লাশি চালিয়েও তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। ক্যাপটেনের গলায় হতাশার সুর।
