বনহুর একবার তাকালো ওদের দুজনার মুখের দিকে, কোনো জবাব সে দিলো না।
অল্পক্ষণে ক্যাপ্টেন এবং জাহাজের অন্যান্য কর্মচারী ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসেছে। সকলের চোখেমুখে ভীতি ও উত্তেজনার ছাপ।
ক্যাপ্টেন জিজ্ঞাসা করলো–ব্যাপার কি রাজকুমার? একি কান্ড হলো?
বনহুর ক্যাপ্টেনকে বললো-আমি সম্পূর্ণ এ ব্যাপারে অজ্ঞ। আমরা দুজন ডেকের ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, হঠাৎ সেই মুহূর্তে কোথা হতে এর পিঠে ছোরা এসে বিদ্ধ হলো আমি কিছু বলতে পারলাম না।
জাহাজে এ ব্যাপার নিয়ে ভীষণ একটা চঞ্চল এবং ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হলো। সমস্ত জাহাজে তল্লাশি চালিয়েও এর কোনো কু আবিষ্কার হলো না।
মৃতদেহ একটি ক্যাবিনে বরফ দিয়ে রাখা হলো, কারণ মন্থনায় না পৌঁছানো অবধি এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলো না।
বনহুর ছোরাখানা সবার অলক্ষ্যে সরিয়ে ফেলেছিলো, সে ক্যাবিনে গিয়ে ছোরাখানা তুলে ধরলো চোখের সামনে। এ সেই একই ধরণের, ছোরা যে ছোরা কদিন পূর্বে তার পায়ের কাছে গেঁথে গিয়েছিলো, যে ছোরার বাটে গাঁথা ছিলো একটি ছোট্ট চিঠি। যে বনহুর ভ্রমে প্রদীপ কুমারকে সরিয়ে নিয়েছে, সে-ই চঞ্চলার হত্যাকারী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রদীপ কুমারের হরণকারী এবং চঞ্চলার হত্যাকারী যে এ জাহাজেই আত্নগোপন করে আছে তা সঠিক বুঝতে পারলো বনহুর।
ছোরা দুখানা সে তার বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখলো, তারপর ফিরে দাঁড়াতেই একটি নারীকণ্ঠের অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো ক্যাবিনের মধ্যে।
বনহুর বিস্ময় নিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সম্মুখের শার্শী দিয়ে জাহাজের ডেকে। অদ্ভুত এ নারী, যে তার চোখে ধুলো দিয়ে জাহাজেই লুকিয়ে আছে কিন্তু কে সে?
বনহুর আপন মনে পায়চারী করে চললো। ভাবছে বনহুর, চঞ্চলাকেই তার কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিলো, হয়তো ছোরা নিক্ষেপকারিণী সেই হবে কিন্তু আসলে সে নয়, তবে কে সেই নারী……।
বনহুর পায়চারী করতে লাগলো।
নারীকণ্ঠের অট্টহাসির শব্দটা যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে। আজ পর্যন্ত এমন কোনো নারী বা পুরুষ নেই যে, তার চোখকে ফাঁকি দিয়েছে। কে এই অট্টহাসির অধিনায়িকা যে বনহুর ভ্রমে প্রদীপ কুমারকে উধাও করলো এবং বেচারী চঞ্চলকে হত্যা করলো? নিশ্চয়ই চঞ্চলা তাকে এমন কিছু বলতে যাচ্ছিলো যা বলবার পূর্বেই তাকে নিঃশেষ করা হলো। সিমকী আর তার মা, কে এরা? সত্যি কি এরা মারাঠা জাতি?
বনহুর সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে।
তার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে চঞ্চলার মুখখানা। কি নির্মম সে মুহূর্তটা। চঞ্চলা ভাবতেও পারেনি কয়েক সেকেন্ড পর সে এ পৃথিবীতে আর থাকবে না। বরফের চাপের নিচে রাখা হয়েছে ওকে কিন্তু সন্ধ্যার পূর্বেও সে গরম গরম কাপড় শরীরে ধারণ করেছিলো। বনহুর ভাবছে কত কথা, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সেই কি দায়ী…… ৪৩৬ –৫
ঐ মুহূর্তে একটি ছায়ামূর্তি সরে গেলো জানালার পাশ থেকে। বনহুর বেশ বুঝতে পারলো ছায়ামূর্তি কোনো নারী, পুরুষ নয়। বনহুর দ্রুত জানালার পাশে এসে উঁকি দিলা গলা বাড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো ছায়ামূর্তিটা দ্রুত চলে গেলো ক্যাপ্টেনের কামরার দিকে।
বনহুর কিছুক্ষণ ভাবলো এখন তার কি করা কর্তব্য। ছায়া-মুর্তিটাকে ফলো করে কোনো লাভ হবে কি? না, এ মুহূর্তে নয়।
ফিরে আসে বনহুর নিজের আসনের পাশে।
*
সমস্ত রাত বনহুর গোপনে সন্ধান করে চলে যেখানে যেখানে এবং যাকে যাকে তার সন্দেহ হয়েছিলো। সবশেষে সিমকীর ক্যাবিনের পাশে এসে দাঁড়ায়। ক্যাবিনের মধ্যে কোনো সাড়াশব্দ নেই। এক মিনিট দুমিনিট করে কাটে দু ঘন্টা! না, ভিতর থেকে কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
বনহুর এমন জায়গায় আগোপন করে আছে যেখানে কারো নজর পড়বে না। তবু বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় বনহুর সেই ক্যাবিনটার দিকে, যে ক্যাবিনে চঞ্চলার মৃতদেহ বরফচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।
ক্যাবিনটার পাশে এসে দাঁড়াতেই বনহুরের বুকটা নিজের অজান্তে দুলে উঠলো। চঞ্চলাকে সে ভুল বুঝেছিলো, কেমন যেন সন্দেহ এসেছিলো ওর উপর কিন্তু আসলেই কি চঞ্চলা সন্দেহহীনা ছিলো? যদি সে সম্পূর্ণ নির্দোষ হবে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে কেন? কে এই চঞ্চলা যার মধ্যে লুকোন ছিলো কোনো একটা গোপন রহস্য। বনহুর কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে এ ক্যাবিনে কোনো সাড়া পাওয়া যায় কিনা।
না, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও কোনো শব্দ সেই ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এলো না। মৃত ব্যক্তি তো আর কথাও বলবে না বা হেঁটেও বেড়াবে না, তবে কিসের শব্দের প্রতীক্ষা করছিলো বনহুর সে নিজেই জানে।
বনহুর নিজের ক্যাবিনে ফিরে আসবার জন্য পা বাড়ালো। তাকে সিমকীদের ক্যাবিনের সম্মুখ হয়েই আসতে হবেই।
যেমনি বনহুর সিমকীদের ক্যাবিনের সম্মুখে এসেছে অমনি একটা শব্দ তার কানে এলো, সেই অদ্ভুত নারীকণ্ঠ। কেমন যেন কথাগুলো অস্পষ্ট ধরনের।
বনহুর থমকে দাঁড়িয়ে চট করে ক্যাবিনের পিছনে এসে একটি থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। কান পাতে সে ক্যাবিনের পাশে। ক্যাবিনের মধ্যে জমাট অন্ধকার। পাশেই আনালা, কিঞ্চিৎ ফাঁক থাকা সত্বেও ক্যাবিনের ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। অতি চেষ্টা করেও বনহুর শব্দগুলোর এক বর্ণও বুঝতে পারলো না।
কণ্ঠ সিমকীর নয়, এতে কোনো ভুল নেই। তবে সিমকীর মায়ের কণ্ঠ বলেও মনে হলো না। বনহুর ফিরে এলো ক্যাবিনে, সে বুঝতে পেরেছে, ঐ শব্দটা কোনো ওয়্যারলেসে দূর থেকে ভেসে আসা নারী কণ্ঠস্বর।
