মিসেস চৌধুরী বনহুর আর সিমকীকে লক্ষ্য করে বললেন–বাঃ চমৎকার জুটি বনে গেছেন। সন্ধ্যার সমুদ্র উপভোগ করছেন বুঝি?
বনহুর হেসে বলে-হাঁ, কতকটা তাই।
মিঃ চৌধুরী বললেন—কুমার বাহাদুর, আপনার সঙ্গিনীটি নিশ্চয়ই বাঙ্গালি বলে মনে হচ্ছে না? কিন্তু…
বনহুর সিমকীর মুখে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললো–আপনাদের অনুমান মিথ্যা নয়, আমার সঙ্গিনী মারাঠী মেয়ে কিন্তু আপনারা যা মনে করেছেন তা নয়।
মিসেস চৌধুরী বললেন–তাহলে?
জাহাজেই সঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছি……
ও তাই বলুন, উনি তাহলে মন্থনার রাজপুত্রবধু নন,–বললেন মিঃ চৌধুরী।
না। বললো বনহুর।
মিসেস চৌধুরী যেন এতোক্ষণে কিছুটা স্বস্তি পেলেন। এ কদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এদের দুজনাকে নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক চলছে। স্বামী বলেন, রাজকুমারের স্ত্রী ঐ মেয়েটি আর মিসেস চৌধুরী বলেন, না তা নয়, ঐ মেয়েটি প্রদীপ কুমারের স্ত্রী হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা এগিয়ে এসেছেন নিজ নিজ সন্দেহের সমাধান করতে।
মিসেস চৌধুরী জিতে বললেন–দেখলে কে জিত গেলো। আমি ঠিক বলেছি না, ও মেয়েটি প্রদীপ কুমারের স্ত্রী হতে পারে না কখনও…
মিঃ চৌধুরী বললেন—বেশ, স্ত্রী না হলেও হবে তত একদিন। আমি ঠিক বলেছি কিনা উনাকে জিজ্ঞাসা করো। আচ্ছা প্রদীপ কুমার, জাহাজের সঙ্গিনী হলেও ওকে আপনি ভাবী স্ত্রী বলে গ্রহণ করে নিয়েছেন তো?
বনহুর এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–মিঃ চৌধুরী, আপনি পরাজিত হয়েছেন আপনার স্ত্রীর কাছে, কারণ আমি বিবাহিত। কাজেই এ ধরনের কোনো প্রশ্নই উঠে না।
এবার মিঃ চৌধুরীর মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠলো, তিনি আড়নয়নে স্ত্রীর মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই মিসেস চৌধুরী বললেন–দেখলে তো কার জিত হলো? এবার চল।
মিঃ চৌধুরী ও মিসেস চৌধুরী চলে গেলেন।
বনহুর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
মিস সিমকী এতোক্ষণ হা করে ওদের কথাবার্তা শুনছিলো, এবার বনহুরকে লক্ষ্য করে। বললো—উনারা কি বলছিলেন আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে?
ও! ওঁরা বলছিলেন তরুণী আপনার কে হন?
আপনি কি বললেন?
বললাম আমার বোন হন উনি।
সিমকী এতে তেমন খুশি হলো বলে মনে হলো না বরং মুখটা একটু গম্ভীর হলো।
বনহুর বললো–মিস সিমকী, সত্যি বলতে কি আমার বোন নেই, আপনি যদি আমার বোন হতেন এবং সব সময় আপনি আমাকে ভাইয়ের মত ভালবাসতেন তাহলে কত না খুশি হতাম।
সিমকী গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো, তারপর বললো- বেশ, তাই হোক।
হাঁ, আপনি আমাকে ভাই বলে ডাকবেন, আর আমি আপনাকে ছোট বোন বলে গ্রহণ করবো।
আচ্ছা, সেই ভাল।
সিমকী বিষণ্ণ মুখে ফিরে যায় তার নিজের ক্যাবিনের দিকে।
বনহুর যেন হাঁফ ছেড়ে বাচলো এতোক্ষণে।
সিমকী চলে যেতেই একটি নারীমূর্তি বেরিয়ে এলো আড়াল থেকে।
চমকে না উঠলেও একটু হকচকিয়ে গেলো বনহুর, কারণ মেয়েটি অতি সন্তর্পণে এগিয়ে। এলো বনহুরের পাশে। মেয়েটির মুখে আলো পড়তেই বনহুর তাকে চিনতে পারলো সে চঞ্চলা। বনহুর কিছু বলবার পূর্বে চঞ্চলা বললো–প্রদীপ কুমার, সত্যি আপনি ওকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিলেন।
বনহুর কোনো জবাব না দিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো চঞ্চলার দিকে।
চঞ্চলা বললো আবার–কই, জবাব দিচ্ছেন না যে?
বললো বনহুর–আপনার প্রশ্ন সম্পূর্ণ অহেতুক, তাই।
মানে?
মানে তাকে আমি ফিরিয়ে দেইনি বরং তাকে বোনের মর্যাদা দিয়েছি।
সত্যি আপনি অদ্ভুত মানুষ।
কতকটা তাই।
প্রদীপ কুমার, আমি জানতাম আপনি সিমকী মেয়েটাকে ভালবাসতে পারেন না।
ভ্রূ কুঞ্চিত করে তাকায় বনহুর চঞ্চলার দিকে– কেন?
তা আপনি নিজেই জানেন। যাক সে কথা, কেন এলাম এবার বলি।
বলুন?
কিন্তু কথাটা অত্যন্ত গোপনীয়।
আমি গোপনতা রক্ষা করবো।
যা বলবো তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আপনার কাছে। কিন্তু একটি শর্ত আছে।
বলুন কি শর্ত?
ঠিক আপনি আমার কথামতো কাজ করবেন?
যদি আমার রুচিমতো হয় নিশ্চয়ই করবো।
প্রথমে কথা হলো সিমকীর সঙ্গে আপনি প্রেমের অভিনয় করবেন এবং ঘন ঘন যাবেন তাদের ক্যাবিনে!
তারপর?
আপনি জানতে পারবেন কে সিমকী আর কে তার মা..
হঠাৎ বুকে হাতচাপা দিয়ে আর্তনাদ করে উঠে চঞ্চলা, সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে যায়।
বনহুর ওকে ধরে ফেলতেই দেখতে পায় চঞ্চলার পিঠে বিদ্ধ হয়ে আছে একটি সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা। ছোরাখানা যে কখন এসে বিদ্ধ হলো, টেরই পায়নি বনহুর।
চঞ্চলার আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে অদূরে ডেকের ধারে বসে গল্পেরত যাত্রীদল শশব্যস্তে ছুটে আসে সবাই। ঘিরে দাঁড়ায় বনহুর আর চঞ্চলাকে।
তখন বনহুরের হাতের উপর ঢলে পড়েছে চঞ্চলার দেহখানা। পিঠ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে বনহুরের হাত দুটো ভিজে জপজপে হয়ে উঠেছে।
সবাই এই দৃশ্য লক্ষ্য করে হতভম্ব হয়ে গেলো যেন।
কারো মুখে কোনো কথা সরছে না।
বনহুর ডাকলো, মিস চঞ্চলা, একি হলো! কে আপনাকে এভাবে ছোরাবিদ্ধ করলো? বলুন, বলুন মিস চঞ্চলা?
চঞ্চলার মুখখানা যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে উঠেছে। তার ঠোঁট দুটো একটু নড়ে উঠে কিন্তু কোনো কথা বলতে পারে না। মাথাটা ঢলে পড়ে বনহুরের বুকের একপাশে।
বনহুর ওকে শুইয়ে দেয় ডেকের উপর এবং শুইয়ে দেবার পূর্বে তার পিঠ থেকে ছোরাখানা অপর একজনকে তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে।
ততোক্ষণে সিমকী আর তার মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে পড়ে সেখানে, উভয়ের চোখে উত্তেজনার ছাপ। তারা ব্যস্ত এবং ব্যাকুল কণ্ঠে বললো-কে একে এভাবে হত্যা করলো?
