ফিরে এলো সে ক্যাবিনে কিন্তু তার মন জুড়ে বিরাট একটা রহস্যময় চিন্তা ঘুরপাক করতে লাগলো।
এক সময় সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো সাগরের বুকে।
ক্যাবিনখানার মধ্যেও সন্ধ্যার অন্ধকার ঝাপসা হয়ে এসেছে। বনহুর সিগারেট পান করতে করতে পায়চারী করছে আর চিন্তা করছে কিছু পূর্বে সিমকীর মায়ের ক্যাবিন থেকে যে নারী কণ্ঠ তার কানে এসেছিলো তারই কথা। অদ্ভুত সে নারীকণ্ঠ ছিলো, নিশ্চয়ই কোনো মেশিনের সাহায্যে সে শব্দ দূরে পাঠানো হচ্ছে বা দূর দেশের কোথাও হতে জাহাজের ঐ ক্যাবিনে আসছে। সিমকীর মা বৃদ্ধা যে গলার সুর সে শুনেছে সে স্বর তার নয়। সে মুহূর্তে সিমকীও ছিলো না ক্যাবিনের ভিতরে। তবে কি ব্যাপার………
বনহুর গভীরভাবে ভাবছে, ঐ সময় আধো অন্ধকারে এসে দাঁড়ায় একটি ছায়ামূর্তি তার ক্যাবিনে।
বনহুর ফিরে তাকিয়ে বলে উঠে–কে?
আমি সিমকী।
ও।
কই, ভিতরে আসতে বলছেন না তো?
এই তো এসেছেন।
অন্ধকারে কেন?
ও তাই তো……বনহুর সুইচের দিকে হাত বাড়াতেই সিমকী ওর হাতখানা ধরে ফেলে –না থাক।
বনহুর অবাক হয়।
সিমকী বলে-অন্ধকার বেশ লাগছে।
কিন্তু…
যদি কেউ এসে পড়ে, এই তো?
তা তো নিশ্চয়ই, কারণ আপনি নারী আমি পুরুষ, আমার ক্যাবিনে আপনাকে এই অন্ধকারে দেখলে সবাই,
আঁতকে উঠবে, না?
ঠিক আঁতকে নয়।
তবে?
কতকটা বিস্মিত হবে বলতে পারেন।
এ আপনার মনের দুর্বলতা।
হয়তো তাই।
প্রদীপ কুমার।
বলুন?
আপনার অনুমতি পেলে বসতে পারি।
নিশ্চয়ই বসুন, তবে আমার মনে হয় আলোটা জ্বালালে ভাল হয়। আপনার মাও তো এসে পড়তে পারেন?
ও আপনাকে ভাবতে হবে না। সিমকী আসন গ্রহণ করতে করতে কথাটা বলে।
বনহুরও আর একটি আসনে বসে পড়ে কতকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও। হঠাৎ অসময়ে সিমকীর আগমন তার মোটই পছন্দ হয়নি, তবু মনোভাব গোপন রেখে বলে-আপনার মা খুব ভাল।
দেখুন মাও কিন্তু আপনার সম্বন্ধে অনেক ভাল বললেন। মাকে যাই মনে করুন মা কিন্তু আসলে বড় লোভী।
তার মানে?
মানে আপনি রাজকুমার তারপর বিবাহিত তবু আমার মায়ের লোভ পড়েছে আপনার উপর, যা কোনোদিন আমাদের মত মেয়ে আশাই করতে পারে না। জানেন মা কি বলেছে আপনার সম্বন্ধে?
কি বলেছেন?
যদি আপনার মত একটি ছেলে সে জামাই হিসেবে পেত।
ও, এই তাঁর লোভ? হাসে বনহুর।
সন্ধ্যার অন্ধকারে বনহুরের হাসির শব্দ ক্যাবিনটাকে মনোরম করে তোলে।
সিমকী অভিভূত হয়ে পড়ে।
বলে সিমকী—মার বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর লোভ..সত্যি যা কোনোদিন সম্ভব নয় তাই সে আশা করে।
মিস সিমকী, আমার চেয়েও সুন্দর এবং গুণবান জামাই আপনার মা পেতে পারেন, কাজেই আশা করাটা তার পক্ষে অসম্ভব নয় মোটেই।
কিন্তু আমি জানি কোনোদিন সে আশা পূরণ হবে না। প্রদীপ কুমার, ভালবাসা কি পাপ? আমি যদি আপনাকে ভালবাসি তা কি অন্যায় হবে?
না।
সত্যি বলছেন?
সেটা আপনার নিজস্ব ব্যাপার।
কিন্তু আপনি?
একটু হাসির শব্দ শোনা গেলো, বললো বনহুর–মাত্র কদিনের পরিচয়, এর মধ্যে আপনি আর আমি কতটুকু ঘনিষ্ঠতা লাভ করতে পারি? হয়তো এরপর আর আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎলাভ নাও ঘটতে পারে।
যদি আপনি ইচ্ছা করেন তাহলে সবই সম্ভব। প্রদীপ কুমার, সত্যি আপনার জন্য আমি নিজকে উজাড় করে দিতে পারি। আপনি কি আমার জন্য একটুও আপনার ভালবাসা দিতে পারেন না?
এর জবাব আজ নয়, আর একদিন দেবো মিস সিমকী।
সত্যি, আপনিই এক পুরুষ যাকে আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম। কোনো লোভ মোহ নেই আপনার মধ্যে। অদ্ভুত মানুষ আপনি।
সিমকী কথাগুলো বলে নিজেই সুইচ টিপে আলো জ্বালালো!
বনহুর পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললো–চলুন ডেকে গিয়ে দাঁড়াই।
সিমকী বললো—চলুন।
বনহুর আর সিমকী ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় জাহাজের ডেকে রেলিংয়ের পাশে।
এ দিকটায় তেমন কোনো লোকজন ছিলো না। বেশ নিরিবিলি। খানিক দূরে কয়েকজন যাত্রী নারীপুরুষ ডেকের ধারে বসে বসে হাসিগল্প করছিলো।
বনহুর আপন মনে সিগারেট থেকে ধূম্র নির্গত করে চলেছে।
সিমকী বললো-আচ্ছা প্রদীপ কুমার, আপনার বন্ধু আলমের নিরুদ্দেশ সংবাদ ক্যাপ্টেনকে জানিয়েছেন কি?
বনহুর সিমকীর মুখে তাকালো, বললো–না, প্রয়োজন মনে করিনি।
প্রদীপ কুমার, আপনি কি বন্ধুর জন্য চিন্তিত হননি?
নিশ্চয়ই হয়েছি।
তাহলে কি করে নিশ্চুপ রইলেন?
জানি তাকে খুঁজে পাবো না।
আচ্ছা প্রদীপ কুমার, আপনি মনে করেন আপনার বন্ধু আলম এ জাহাজে নেই?
এ ব্যাপারে আপনি যেমন ভাবছেন আমিও ঠিক তেমনি ভাবছি।
দেখুন আপনাকে দেখে মনে হয় বন্ধুর জন্য আপনি মোটেই চিন্তিত নন।
এ কথা সত্যিই, কারণ বন্ধুর জন্য চিন্তা করে কোনো ফল হবে না, তাই,
সত্যি আপনি আমাকে হাসালেন, কেউ কোনোদিন এমন কথা বলে না।
চলুন মিস সিমকী ঐ ভদ্রলোকদের সঙ্গে বসে আলাপ করিগে।
কেন, এখানে বুঝি ভাল লাগছে না আপনার?
তা লাগছে বইকি কিন্তু ওদের সঙ্গে বসে আলাপ করলে মন্দ কি?
ওদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আপনার?
জাহাজে আসার পর যাত্রীদের অনেকের সঙ্গেই আলাপ হয়েছে কিন্তু আপনার মত অন্তরঙ্গতা হয়নি কারো সঙ্গে।
এমন সময় ৮নং ক্যাবিনের যাত্রী দুজন এসে দাঁড়ায়, ওরা স্বামী-স্ত্রী মিঃ আর এ চৌধুরী ও তার স্ত্রী মিসেস চৌধুরী।
মিঃ চৌধুরী আর মিসেস চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো বনহুরের জাহাজে আসার তৃতীয় দিনে। ভদ্রলোক ভারি অমায়িক লোক। তেমনি তার স্ত্রী মিসেস চৌধুরী জাহাজের প্রথম ক্লাসের ৮নং ক্যাবিনের যাত্রী তারা, তাই গায়ে পড়ে আলাপ করতে এসেছিলো ৩নং ক্যাবিনের প্রদীপ কুমারের সঙ্গে। প্রদীপ কুমার মন্থনার রাজপুত্র, এ কথা জানার পর জাহাজের অনেকেই গায়ে পড়ে আলাপ করতে আসতো কিন্তু প্রদীপ কুমার তখন উধাও হয়েছে। কাজেই বনহুরকে প্রদীপ কুমারের ভূমিকায় অভিনয় করতে হচ্ছে।
