এবার বললো বনহুর–সামান্য দুচার দিনের পরিচয়। এ জাহাজে আমরা সবাই মুসাফির মাত্র, কাজেই এখানে এ ধরনের কোনো প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া আমি বিবাহিত, আমার স্ত্রী আছে,
আপনি বিবাহিতা?
হ।
কি যেন ভাবলো চঞ্চলা, তারপর বললো—-সত্যি আপনাকে আমার বড় ভাল লাগে।
এ আমার সৌভাগ্য মিস চঞ্চলা।
জানেন আমার বান্ধবী সিমকী কি বলে?
কি বলেন উনি?
আপনি নাকি ওকে ভালবাসেন।
বনহুর মৃদু হাসে।
কই, কথা বলছেন না তো?
কি বলবো?
সিমকী আপনাকে ভালবাসে সত্যি?
হয়তো বাসে, যেমন আপনার ভাল লাগে।
দেখুন প্রদীপ কুমার, ওকে মোটেই বিশ্বাস করবেন না।
কারণ?
কারণ সে সম্পূর্ণ ছলনাময়ী।
মিস চঞ্চলা।
হা প্রদীপ কুমার।
কেন? ভ্রূকুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো বনহুর।
চঞ্চলা সরে আসে আরও কাছে-এর পূর্বে সে একজনকে ভালবাসতো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও সে ফাঁকি দিয়েছে। বলুন তো কত নীচ সে!
বনহুর গম্ভীরভাবে চঞ্চলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর বললো—-আপনি কাউকে ভালবাসেননি মিস চঞ্চলা?
বিশ্বাস করুন আমি ভালবাসার মত আজও কাউকে খুঁজে পাইনি।
তাই নাকি?
হাঁ
বড় আফসোস, আজও আপনি আপনার মনের মত মানুষ খুঁজে পাননি।
কিন্তু আপনাকে আমার বড় ভাল লেগেছে।
বললাম তো এ আমার সৌভাগ্য।
দেখুন আপনিও মন্থনার রাজকুমার আর আমিও ধনকুবের হিমেন্দু নাথের কন্যা। যদিও আপনি বিবাহিতা তবু আমি আপনাকে ভালবাসবো। ভালবাসা অপরাধ নয়……চলি, কেমন?
আচ্ছা আসুন।
বেরিয়ে যায় চঞ্চলা।
বনহুর ভ্রূ কুঞ্চিত করে ভাবে, এ যে আর একটি রহস্যজালের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো সে। চঞ্চলা আর সিমকী এরা দুবান্ধবী এবং এরা দুজনই মন্থনা দ্বীপবাসিনী। এরা জানে, সেই মন্থনার রাজকুমার প্রদীপ। প্রদীপ কুমার আর এদের গন্তব্য স্থান হলো একই জায়গায়। বনহুর যেন বিপদে পড়লো, তার অনিচ্ছা সত্বে সে যেন একটা গভীর রহস্যজাল জড়িয়ে পড়ছে। যখন জাহাজ শাহান শাহ মন্থনা দ্বীপে গিয়ে পৌঁছবে তখন প্রদীপ কুমারকে নেবার জন্য আসবে তার বাবা-মা, স্ত্রী মীরা কিন্তু কোথায় সেই প্রদীপ কুমার! কে সেই নারী যে তাকে দস্যু বনহুর ভ্রমে হরণ করেছে? কি উদ্দেশ্য আছে বা ছিলো তার?
বনহুর ক্রমে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ে।
বেরিয়ে আসে সে বাইরে, ডেকের পাশে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ সমুদ্রে তরঙ্গায়িত জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ নয়নে, তারপর পা বাড়ায় সে সিমকীর ক্যাবিনের দিকে।
সিমকীর ক্যাবিনের নিকটে পৌঁছতেই ক্যাবিনের মধ্য হস্তে ভেসে আসে অদ্ভুত এক নারীকণ্ঠ। থমকে দাঁড়ায় বনহুর, তাকিয়ে থাকে ক্যাবিনের বন্ধ দরজার দিকে। নারীকণ্ঠ কিন্তু স্বাভাবিক নয়, কেমন যেন লাগছে। কি বলছে, কে বলছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
হঠাৎ পিছনে পদশব্দ হতেই বনহুর আড়ালে আত্নগোপন করলো।
এগিয়ে এলো সিমকী আর চঞ্চল, ওরা দুজন হাসি-গল্প করতে করতে ক্যাবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালো। বনহুর ঐ মুহূর্তে ক্যাবিনের মধ্যে আর কোনো কথাবার্তা শুনতে পেলো না।
চঞ্চলা সিমকীর সঙ্গে কথা শেষ করে নিজের ক্যাবিনের দিকে চলে যায়।
সিমকী দরজায় হাত রাখতেই দরজা খুলে গেলো, সে প্রবেশ করলো ভিতরে। চাপকণ্ঠে কি যেন কথাবার্তা হলো মা ও মেয়ের মধ্যে, বনহুর ঠিক বুঝতে পারলো না।
সে আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালো ক্যাবিনের দরজায় ভিতরে আসতে পারি?
সিমকীর গলা শোনা গেলো–নিশ্চয়ই, আসুন আসুন।
বনহুর ক্যাবিনে প্রবেশ করলো।
সিমকী দীপ্ত উজ্জ্বল মুখে অভ্যর্থনা জানালো–প্রদীপ কুমার আপনি!
হাঁ, এলাম আপনার মার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য।
সিমকী হেসে বললে-পরম সৌভাগ্য আমাদের। কদিন হতেই আপনাকে বলেছি চলুন আমার মার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই কিন্তু আপনি এখন নয় তখন, তখন নয় কাল করে সময় কাটিয়েছেন।
তারপর মাকে লক্ষ্য করে মারাঠা ভাষায় বললো-এসো মা এসো, ইনি হলেন মন্থনার রাজপুত্র প্রদীপ কুমার।
দুহাত জুড়ে নমস্কার করে বৃদ্ধা।
সিমকী বলে-ইনি আমার মা মিসেস এ্যানিসা।
বনহুর ওকে ঠিক বৃদ্ধার অনুকরণে প্রণাম জানালো, তারপর হেসে বললো–আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে অনেক খুশি হলাম।
সিমকী বললো–আমার মা ইংরেজি জানে না, কাজেই সে আপনার কথা মোটেই বুঝতে পারছে না। ধন্যবাদ, আমি আমার মাকে আপনার কথাটা বুঝিয়ে বলছি।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো সিমকীর মার মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা দেয়নি। সে যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো তেমনি দাঁড়িয়ে আছে।
সিমকী মারাঠা ভাষায় তার মাকে বনহুরের কথাটা বুঝিয়ে বললো। ওর মার মুখ হাস্যোদীপ্ত হয়ে উঠলো। সেও মারাঠা ভাষায় কিছু বললো।
বনহুর তার এক বর্ণও হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হলো না। কারণ সে মারাঠা ভাষার সঙ্গে মোটেই পরিচিত ছিলো না।
সিমকী মায়ের কথাগুলো বুঝিয়ে বলে, কতকটা দোভাষীর কাজ করে সে।
কিছু সময় কাটে তাদের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে, এক সময় বিদায় নেবার জন্য বনহুর উঠে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধা কিছু বললো!
সিমকী বুঝিয়ে দিলো–প্রদীপ কুমার, আপনাকে দেখে আমার মা অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। এই জাহাজে না এলে আপনাকে দেখবার সৌভাগ্য হতো না। আপনি আবার আশা করি আসবেন।
বনহুর বললো-আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি নিজেও কম আনন্দিত হইনি। নিশ্চয়ই আবার আসবো।
তখনকার মত বিদায় গ্রহণ করে বনহুর সিমকীর ক্যাবিন থেকে।
