বনহুর বললো–এটা তো সৌভাগ্যের কথা। আপনাদের মতো সঙ্গী পেলে আমরা ধন্য হবো। জানিনা আমার বন্ধু আলম এতোক্ষণ আসছে না কেন।
চঞ্চলা বললো–নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো কাজে তিনি গেছেন বলে মনে হচ্ছে।
বললো বনহুর- হয়তো তাই হবে। অবশ্য সে আমাকে না বলেই গেছে কিনা।
সিমকী বললো–আচ্ছা মিঃ প্রদীপ কুমার, আপনারা মন্থনা দ্বীপেই যাচ্ছেন তো?
হাঁ, মন্থনার মহারাজ আমার পিতা, মহারাণী আমার মাতা, মীরা আমার…বুঝতেই পারছেন আমি সেখানেই যাচ্ছি।
কিন্তু আপনার বন্ধু মিঃ আলম বলেছিলেন মন্থনা দ্বীপ পর্যন্ত নাও যেতে পারি।
ভ্রূ কুঞ্চিত হলো বনহুরের সিমকীর কথায়, বললো-তাই নাকি? আমার বন্ধুর মনে তাহলে অন্য রকম ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু আমি ভাবছি সে গেলো কোথায়? এতোক্ষণও না আসার কারণ কি?
এ কথা সে কথার মধ্য দিয়ে বনহুর নিজকে প্রদীপ কুমার বানিয়ে নিলো, সিমকী বা চঞ্চলা একটু বুঝতে পারলো না যে, সে প্রদীপ কুমার নয়।
নানা রকম গল্পসল্পের পর বিদায় নিলো সিমকী আর চঞ্চলা। বনহুর গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো। প্রদীপ কুমারকে যারা উধাও করেছে তারা যেই হোক এই তরুণী দুজন তাদের দলে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং প্রদীপ কুমারকে এই জাহাজেরই কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
বনহুর এ জাহাজে সন্ধান চালাবে, কাজেই এই তরুণীদ্বয়ের সঙ্গে প্রদীপ কুমারের অভিনয় করে ওদেরকে তার প্রতি নিঃসন্দেহ রাখতে হবে।
বনহুর ক্যাবিনের জানালার ফাঁকে তাকিয়ে রইলো সীমাহীন জলরাশির দিকে। বারবার প্রদীপ কুমারের মুখখানা ভেসে উঠতে লাগলো তার মনের পর্দায়। বেচারার চেহারাটাই হলো তার কাল। পুলিশ মহল তাকে একবার নয়, দুবার আটক করে কতো নাকানি-চুবানি খাওয়ালো। তারপর আবার তার জন্য এলো নতুন বিপদ। প্রদীপ কুমার ভ্রমে সে রেহাই পেলো আর বিপদ এলো প্রদীপ কুমারের জন্য। তাকে রাতের অন্ধকারে ক্লোরফরম করে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিন্তু কেন, কি উদ্দেশ্য রয়েছে এর পিছনে? কে সেই নারী যার হাস্যধ্বনি তাকে বিস্মিত করেছে। সিমকী না চঞ্চলার কণ্ঠের সে হাস্যধ্বনি ছিলো? বনহুর একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে।
কে যেন কাঁধে হাত রাখলো বনহুরের।
চমকে ফিরে তাকালো বনহুর।
সিমকী দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুর বললো–আপনি!
হাঁ, এক্ষুণি গেলাম অথচ পুনরায় ফিরে এলাম। আশ্চর্য হচ্ছেন বুঝি?
না।
জানেন কেন এলাম?
একা একা আছি, তাই আমার নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলো হাসি-গল্পে পরিপূর্ণ করতে…..
না, এসেছি একটা কথা বলতে।
বসুন।
এখন নয়, পরে বসবো। শুনুন মিঃ প্রদীপ কুমার।
মিষ্টার বাদ দিয়ে বললেই বেশি খুশি হবো।
আচ্ছা তাই বলবো। দেখুন, আমার বান্ধবী স্বাভাবিক মেয়ে নয়! সে কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই এ জাহাজে এসেছে। ওর কথাবার্তা, চাল-চলন আমার মোটেই পছন্দ হয় না। আপনি যতটুকু পারেন ওকে এড়িয়ে চলবেন। সিমকী এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললো, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠলো বনহুরের, রহস্যজালটা যেন ক্রমান্বয়ে আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বনহুর স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।
*
বনহুর ক্যাবিনের বিছানায় চীৎ হয়ে শুয়ে ভাবছিলো। তাকে বেশি করে ভাবিয়ে তুলেছিলো প্রদীপ কুমারের বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রী মীরার কথা। তারা বিপুল আগ্রহ নিয়ে ভাবছে কদিন পরই আসবে তাদের প্রিয় প্রদীপ কুমার। কতদিন পর তাকে ফিরে পাবে ওরা কিন্তু তা হলো না। মন্থনা দ্বীপে পৌঁছিবার পূর্বেই হারিয়ে গেলো সে আবার এ রকম কোনো বিপদ যাতে না ঘটে, এ জন্যই বনহুর এসেছিলো তাকে নিরাপদে মন্থনায় পৌঁছে দেবে বলে। কে জানতো ওর জন্য এমনি একটা বিপদ ওঁৎ পেতে ছিলো জাহাজ শাহান শাহের মধ্যেও। আজ দুদিন হলো নিখোঁজ হয়েছে প্রদীপ কুমার। বনহুর গোপনে জাহাজ খানার অনেক জায়গায় সন্ধান করেছে কিন্তু কোথাও প্রদীপ কুমারে চিহ্ন খুঁজে পায়নি। আশ্চর্য, কে বা কারা তার পাশ থেকে প্রদীপ কুমারকে উধারও করলো অথচ সে একটুও টের পায়নি……
বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো।
কি ভাবছেন প্রদীপ কুমার?
আপনি!
হাঁ এলাম! বললো চঞ্চলা।
বনহুর উঠে বসলো, তাকালো সে চঞ্চলার দিকে। একটা উচ্ছল ভাব ছড়িয়ে আছে তার চোখে মুখে, বললো বনহুর বসুন।
চঞ্চলা বসলো।
বললো বনহুর–আপনার বান্ধবীকে দেখছিনা তো?
ও আসেনি বলে আপনার বুঝি খারাপ লাগছে?
না না, তা লাগবে কেন। তবে আপনারা দুজন একসঙ্গে সব সময় জোড়া পাখির মত থাকেন কিনা, তাই…..
আচ্ছা প্রদীপ কুমার?
বলুন?
আপনার বন্ধুর জন্য বড় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাই না?
হাঁ…একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বনহুর, তারপর বলে–জানি না সে কোথা গেলো। যদি তাকে আর খুঁজে না পাই তাহলে আমি কিছুতেই শান্তি পাবো না।
সত্যি, আপনার বন্ধুর অন্তর্ধানে আমিও দুঃখিত। হঠাৎ তিনি এভাবে নিরুদ্দেশ হলেন……কথা শেষ না করে চুপ হয়ে যায় চঞ্চলা।
বনহুর কোনো কথা বলে না, সে মুখ নিচু করে কিছু ভাবতে থাকে।
চঞ্চলা বলে–প্রদীপ কুমার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, সঠিক জবাব দেবেন?
বলুন, নিশ্চয়ই দেবো।
আপনি আমার বান্ধবী সিমকীকে কাছে পেলে খুশি হন বুঝি?
হাসলো বনহুর, কেন জবাব সে দিলো না।
চঞ্চলা বলে উঠে–আপনাকে বলতেই হবে, সত্যি আপনি সিমকীকে ভালবাসেন কিনা?
