আর ঘুমাতে পারলো না বনহুর, সমস্ত রাত সিগারেটের পর সিগারেট পান করে চললো। এ্যাসট্রের মধ্যে জমে উঠলো অর্ধদগ্ধ সিগারেটের স্তূপ।
ভোর হলো এক সময়।
বনহুর বাথরুমে প্রবেশ করে সুন্দরভাবে হাতমুখ পরিস্কার করে ধুয়ে নিলো, তারপর ফিরে এলো ক্যাবিনের মধ্যে। তোয়ালে দিয়ে মুখখানা মুছে নিয়ে তাকালো সম্মুখে যেখানে প্রদীপ কুমারের জামা-কাপড় ঝুলছে।
পরে নিলো সে প্রদীপের পোশাকগুলো। ক্যাবিনের আয়নার সম্মুখে দেখলো সে একেবারে প্রদীপ কুমার বনে গেছে। তার চেহারার এতোটুকু পার্থক্য নেই যে সে প্রদীপ কুমার নয়।
এমন সময় বয় এসে খাবার দিয়ে গেলো।
বনহুর খাবার খেলো, তারপর একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে নিয়ে বেরিয়ে এলো ক্যাবিনের বাইরে। ডেকের ধারে এসে দাঁড়ালো, দৃষ্টি তার সম্মুখে সাগরবক্ষে সীমাহীন জলরাশির দিকে।
জাহাজখানা আর এক সপ্তাহ পর মন্থনা দ্বীপে এসে পৌঁছবে। কিন্তু একি বিভ্রাট হলো, প্রদীপ কুমারকে কে বা কারা উধাও করলো।
বনহুর সিগারেট পান করছে আর ভাবছে, একটা নারীকণ্ঠের অট্টহাসি গতরাতে তাকে শুধু চমকেই তোলেনি, বিস্মিতও করেছে। নিশ্চয়ই কোনো রহস্যময় মায়াচক্র জড়িয়ে আছে সেই হাসির সঙ্গে। বনহুর সম্মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার নজরে পড়লো দুটি তরুণী ওদিকে রেলিংয়ে ঠেশ দিয়ে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। এরা হিন্দল থেকে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ জাহাজখানা যখন কান্দাই থেকে ছাড়ে তখন এ তরুণীদ্বয় জাহাজে ছিলো না। অবশ্য এ জাহাজে প্রায় বারো-তেরোজন মহিলাযাত্রী ছিলো পূর্ব হতেই। একটি তরুণীর সঙ্গে ইতিমধ্যে তার পরিচয় ঘটেছিলো। তরুণী তার বিধবা মাকে নিয়ে সিমলাই যাচ্ছে। জাতিতে তারা মারাঠা। মেয়েটি শিক্ষিতা, কাজেই সে মারাঠা ভাষা ছাড়াও সুন্দর ইংরেজি বলতে পারে। এর নাম সিমকী, সুন্দর স্বচ্ছস্বাভাবিক ওর চালচলন।
মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো টেলিভিশন ক্যাবিনে। তারপর প্রায়ই সিমকীর সঙ্গে দেখা হতো জাহাজের ডেকে। বনহুর সিগারেটের ধোঁয়ার ফাঁকে তাকিয়ে আছে আড়নয়নে–মেয়ে দুটি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো।
হঠাৎ ফিরে দাঁড়ালো ওরা।
বনহুর দেখলো দুজন তরুণীর মধ্যে একজন সিমকী, অপরজন নতুন মেয়ে!
নতুন মেয়েটির সঙ্গে হাসছিলো সিমকী। আর কি যেন বলাবলি করছিলো। হয়তো সমুদ্রে জলরাশির উচ্ছল তরঙ্গ নিয়েই আলাপ হচ্ছিলো দুজনার মধ্যে।
বনহুর ওদের দেখেও না দেখার ভান করে রইলো। আপন মনে সে সিগারেট পান করে চলেছে।
সিমকী আর নতুন তরুণী চলে গেলো ওদিকে।
বনহুর এবার কিছু ভেবে নিলো, তারপর পা বাড়ালো ক্যাবিনের দিকে। কিন্তু ক্যাবিনে প্রবেশ করে সে আসন গ্রহণ করতে পারলো না, একটা অস্বস্তি তার মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। সে পুনরায় বেরিয়ে এলো ক্যাবিন থেকে।
ক্যাবিনের বাইরে বেরিয়ে আসতেই তার পায়ের কাছে একখানা সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা এসে গেঁথে গেলো। থমকে দাঁড়ালো বনহুর, তারপর উবু হয়ে ছোরাখানা তুলে নিলো সে হাতে। আশ্চর্য হয়ে দেখলো ছোরার বাটে ছোট একটি কাগজের টুকরা বাধা রয়েছে।
বনহুর ছোরার বাট থেকে কাগজের টুকরাখানা খুলে নিয়ে মেলে ধরলো চোখের সামনে। ততে স্পষ্ট লেখা আছে–
প্রদীপ কুমার, বন্ধুকে হারিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাই না? কিন্তু আপনার বন্ধু স্বাভাবিক মানুষ নয়। তার পরিচয় আপনি জানেন না। জানলে তাকে পাশে আশ্রয় দিতেন না। আপনি অযথা মন খারাপ করবেন না। তাকে আমি কৌশলে বন্দী করেছি। আপনার হিতাকাক্ষী —-চন্দনা
বনহুরের ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে। সে বার দুই চিঠিখানা পড়ে নিয়ে প্যান্টের পকেটে রেখে ফিরে যায় ক্যাবিনে।
পুনরায় চিঠিখানা বৈর করে মেলে ধরে চোখের সম্মুখে, তারপর হঠাৎ হেসে উঠলো হাঃ হাঃ হাঃ করে।
উঠে দাঁড়ায় বনহুর কিন্তু ফিরে তাকিয়েই বিস্মিত হয়–তার পিছনে সিমকী সঙ্গিনী সহ দাঁড়িয়ে আছে। বনহুর মনোভাব চেপে নিয়ে একটু হেসে বলে-ও আপনি!
সিমকীই জবাব দেয়-হাঁ, আমি সিমকী। এলাম আমার বান্ধবীকে নিয়ে আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। কিন্তু আপনার বন্ধুকে দেখছিনা তো?
বনহুর পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো-বন্ধু! হাঁ আমিও কিন্তু ওকে দেখছি না। হয়তো জাহাজের কোথাও থাকবে! বসুন মিস সিমকী।
সিমকী ও তার বান্ধবী আসন গ্রহণ করলো। বললো সিমকী—এ আমার বান্ধবী চঞ্চল।
বনহুরও আসন গ্রহণ করে বললো—চমৎকার নামটা ওর। হয়তো উনি খুব চঞ্চল, তাই…
হাঁ, ঠিকই বলেছেন মিঃ প্রদীপ কুমার, ছোটবেলায় আমার বান্ধবী অত্যন্ত চঞ্চল ছিলো কিনা। কিরে, অমন চুপ করে আছিস্ কেন, কথা বল্ কিছু।
হেসে বললো বনহুর–আপনার বান্ধবীকে দেখে কিন্তু মোটেই চঞ্চলা মনে হচ্ছে না। বড় সাধু মেয়ে বলেই…
বনহুরের কথার মধ্যে বাধা দিয়ে বুলে উঠে সিমকী–আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল মিঃ প্রদীপ কুমার। যাক, এবার আমরা কেন এলাম তাই বলি?
নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই বলুন?
আমার বান্ধবী কিন্তু আপনার বন্ধু মিঃ আলমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো। আপনারা দুজন একই চেহারার, একই কণ্ঠে, একই…
চট করে বলে উঠে চঞ্চলা–একই মনের মানুষ। তাই আমি চাই আপনাদের দুজনের সঙ্গে পরিচিত হতে, বিশেষ করে আরও এক সপ্তাহ যখন আমরা একই জাহাজে আছি।
