*
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের। জেগে উঠতেই অনুভব করলো পাশে কেউ নেই। ভাল করে হাতড়িয়ে দেখলো তার অনুমান মিথ্যা নয়, সমস্ত ক্যাবিন অন্ধকার।
বনহুরের বেশ মনে আছে, সে এবং প্রদীপ কুমার যখন ঘুমাবার জন্য বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে পড়ে তখন ক্যাবিনে ডিমলাইট জ্বলছিলো। কিন্তু এখন ক্যাবিনে কোনো আলো নেই। আলো নিভলো কেমন করে আর প্রদীপ কুমারই বা গেলো কোথায়?
বনহুর বিছানা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো।
আজ এক সপ্তাহ হলে তারা এ ক্যাবিনে আছে। প্রতিদিন রাতে পাশাপশি শোয় ওরা। কতু কথা হয় ওদের দুজনের মধ্যে। প্রদীপ কুমার এবং দস্যু বনহুরের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব জমে উঠেছে। প্রদীপ কুমার তার মনের কথা বলেছে বনহুরের কাছে। বনহুর মনোযোগ সহকারে শুনেছে সব কথা।
বনহুর হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপলো, কিন্তু আলো জ্বললো না।
বনহুর ভাবলো বাথরুমে যায়নি তো? তাই সে ডাকলো প্রদীপ কুমার…প্রদীপ কুমার…
কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ এলো না।
কয়েক মিনিট পায়চারী করলো বনহুর, তবে কি সে ক্যাবিনের বাইরে কোথাও গেছে?
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন প্রদীপ কুমার ফিরে এলো না তখন বনহুর ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। সমস্ত জাহাজ অন্ধকার, শুধু সার্চলাইটের তীব্র আলোর ছটা সাগরবক্ষে রশি বিস্তার করে এগিয়ে যাচ্ছে।
ডেকের ধারে এসে দাঁড়ালো বনহুর, চারিদিকে নিকষ অন্ধকার। আকাশে দুচারটে তারা মিটমিট করছে।
অপূর্ব না হলেও আকাশটা মনোরম মনে হচ্ছিলো। কালো শাড়ির মাঝে যেন জরির বুটি গুলো ফুটে উঠেছে।
বনহুর বেশিক্ষণ ডেকের ধারে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারলো না। কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো সে নিজের মনে। আজ এক সপ্তাহ কেটে গেলো এ জাহাজে কিন্তু এমন তত ঘটেনি কোনোদিন। আজ সমস্ত জাহাজ এমন অন্ধকার কেন আর প্রদীপ কুমারই বা গেলো কোথায়? ফিরে এলো বনহুর ক্যাবিনে। অন্ধকারেই হাতড়িয়ে সিগারেট কেসটা হাতে তুলে নিয়ে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে গুজলো বনহুর, তারপর সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একটা সোফায় বসে পড়লো। প্রদীপ কুমারের অনেক কথাই মনে আলোড়ন জাগালো। বলেছিলো সে, তার বাবা-মা এবং স্ত্রী তার জন্য উন্মাদ প্রায় হয়ে উঠেছে। কারণ সে প্রায় পুরো দুমাস আটক ছিলো হাঙ্গেরী কারাগারে। এতোদিন সে কেন দেশে ফিরে যায়নি জানে না কেউ। সে হাঙ্গেরী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই টেলিগ্রাফ করে দিয়েছিলো, আমি সুস্থ আছি এবং অচিরেই দেশে ফিরে আসছি। প্রদীপ কুমার আরও বলেছিলো তার টেলিগ্রাফ পেয়ে নিশ্চয়ই তার বাবা-মা এবং স্ত্রী মীরা উন্মুখ প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছে।
বনহুরের ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো। প্রদীপ কুমারের কোনো বিপদ ঘটেনি তো। সে এমনই ঘুমিয়ে পড়েছিলো যার জন্য এতোটুকু টের পায়নি ও গেলো কোথায়।
বনহুর ক্যাপ্টেনের ক্যাবিনের দিকে পা বাড়ালো। ক্যাপ্টেন তার টেবিলে বসে একটা ম্যাপ দেখছিলেন। সম্মুখে দিকদর্শন যন্ত্রে বিরাট আকার মেশিনটা দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুর ক্যাপ্টেনের কাঁধের উপর দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সম্মুখের দিকে। কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে বললো-ক্যাপ্টেন।
চমকে ফিরে তাকালেন ক্যাপ্টেন মিঃ হুড়। কারণ এতো রাতে কে এলো তার ক্যাবিনে।
ক্যাপ্টেন ফিরে তাকাতেই বললো বনহুর-জাহাজখানা অন্ধকার কেন জানতে পারি কি?
ক্যাপ্টেন পুনরায় ম্যাপে মনোযোগ দিয়েছিলেন, তিনি ম্যাপখানার উপর দৃষ্টি রেখেই বললেন—মেইন সুইচ নষ্ট হয়ে গেছে।
বনহুর বললো-আলো জ্বলবে কখন?
মেইন সুইচ ঠিক হলেই আলো জ্বলবে।
কিন্তু কখন ঠিক হবে?
যতক্ষণ না মেরামত হয়। যান ক্যাবিনে বসে থাকুন গে।
ক্যাপ্টেনের নীরস ব্যবহারে বনহুর ক্ষুদ্ধ হলো না। সে ফিরে এলো ক্যাবিনে। ইচ্ছা করেই সে প্রদীপ কুমার সম্বন্ধে কোনো কথা বললো না বা কিছু জিজ্ঞাসা করলো না।
ক্যাবিনে আসতেই দপ করে আলো জ্বলে উঠলো। সমস্ত জাহাজ-খানা আলোকিত হলো। বনহুর ডিমলাইটের সুইচ অপ করে পাওয়ার ফুল আলো জ্বালালো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বিছানার দিকে, কোনো কিছু নজরে পড়ে কিনা। হঠাৎ বালিশের পাশে নিচে একটি ছোট রুমাল তার নজরে পড়লো।
বনহুর ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রুমালখানা তুলে নিলো হাতে। রুমালখানা হাতে নিতেই বুঝতে পারলো সেই রুমালখানায় ক্লোরফরম মাখানো আছে। নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের নাক ঢাকলো বনহু, তারপর ডান হাতে সেই ছোট রুমালখানা মেলে ধরে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো। এক কোণে একটি রেশমী সুতার ছোট ফুল এবং অপর কোণায় ডি, আর, দুটি মাত্র ইংরেজি শব্দ। বনহুর বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই প্রদীপ কুমারকে কে বা কারা ক্লোরফরম অবস্থায় ক্যাবিন থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু যাবার সময় তার রুমালখানা ভুলবশতঃ ফেলে গেছে।
বনহুর রুমালখানা প্যান্টের পকেটে রেখে ফিরে দাঁড়াতেই একটা নারীকণ্ঠের অট্টহাসি ভেসে এলো তার কানে।
চমকে উঠলো বনহুর?
একি আশ্চর্য, নারীকণ্ঠের হাস্যধ্বনি……বনহুর বিস্মিত হলো, বেরিয়ে এলো সে ক্যাবিনের বাইরে। এদিক ওদিক তাকালো কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পেলো না।
চারিদিকে এখন আলো ঝলমল করছে, সব নজরে পড়ে।
বনহুর ফিরে এলো পুনরায় ক্যাবিনে। সমস্ত মন জুড়ে গভীর একটা রহস্যময় চিন্তাধারা ততালপাড় করতে লাগলো।
