মিঃ জাফরীর মুখোভাব লক্ষ্য করে অন্যান্য পুলিশ অফিসার বিস্মিত হলেন।
মিঃ জাফরী বললেন–সর্বনাশ, আমিও শেষ পর্যন্ত এমন একটা ভুল করে বসলাম! এ দস্যু বনহুর নয়, নিশ্চয়ই এ সেই ব্যক্তি যাকে একবার ভুল করে হাঙ্গেরী কারাগারে আটক করা হয়েছিলো।
একসঙ্গে পুলিশ অফিসারগণ অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন–বলেন কি, এ দস্যু বনহুর নয়?
না বললেন মিঃ জাফরী। তার মুখোভাবে একটা লজ্জাসঙ্কোচ-দ্বিধা ভরা ভাব। তিনি পুলিশ অফিসারদের নিয়ে হাঙ্গেরী কারাগার ত্যাগ করলেন।
শাহান শাহ থেকে প্রদীপ কুমারকে দস্যু বনহুর ভ্রমে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। মুক্তি পেলো রাজকুমার প্রদীপ।
এমন একটা অবস্থার জন্য পুলিশ মহল তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন এবং তাঁকে। জাহাজযোগে দেশে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলেন।
সন্ধ্যায় জাহাজ শাহান শাহ কান্দাই বন্দর ত্যাগ করবেন।
রাজকুমার প্রদীপকে তার ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে বেরিয়ে এলেন মিঃ জাফরী ও তার দুজন সহকারি। ঠিক ঐ মুহূর্তে একটা অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো তাদের কানে।
অদ্ভুত সে অট্টহাসি! চমকে উঠলেন মিঃ জাফরী এবং তার সঙ্গীরা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে তাকালেন চারদিকে। হঠাৎ এ শব্দ কোথা থেকে ভেসে এলো বুঝতে পারলেন না তারা।
জাহাজ ছাড়ার সংকেতধ্বনি হয়েছিলো, তাই পুলিশ প্রধানগণ বিলম্ব না করে নেমে পড়লেন। জাহাজখানা ততোক্ষণে কান্দাই বন্দর ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
প্রদীপ কুমার বসে ছিলো তার ক্যাবিনে। শরীর-মন দুই-ই খারাপ।
সন্ধ্যা ঘনীভূত হয়ে এসেছে।
জাহাজের ক্যাবিনে ক্যাবিনে আলোগুলো জ্বলে উঠেছে।
প্রদীপ কুমার ভাবছে তার বন্দী জীবনের দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা। দস্যু বনহুর ভ্রমে হাঙ্গেরী কারাগারে তার প্রতি কম নির্যাতন চালানো হয়নি। প্রতিদিন তাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হতো। সমস্ত দিন পর তাকে যে খাবার দেওয়া হতো তা অতি সামান্য এবং নগণ্য। অতি কষ্টে তা গলধঃকরণ করতে হতো। কিছুদিন পূর্বে একবার তাকে এমনিভাবে বন্দী হতে হয় এবং হাঙ্গেরী কারাগারে মাসের পর মাস কত না কষ্ট পোহাতে হয়েছিলো। আবার তার ভাগ্যে সেই ভুলের পালা–সেই নির্যাতন, সেই অন্যায় অবিচার
হঠাৎ একটা অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো তার কানে জাহাজখানা তখন বন্দর ত্যাগ করে অনেক দূর সরে এসেছে। প্রদীপ কুমার ফিরে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো সে। জমকালো পাশাকপরা সেই ছায়ামূর্তি, যাকে সে বহুদিন পূর্বে দেখেছিলো। আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো—আপনি! হাঁ, আমি দস্যু বনহুর।
প্রদীপ কুমারের দুচোখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে, সে সহসা কিছু বলতে পারলো না। যদিও সে কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু গলাটা যেন রুদ্ধ হয়ে এসেছে ভিতর থেকে।
দস্যু বনহুর এগিয়ে এসে ওর কাঁধে একখানা হাত রাখলো, একটু হেসে বললো-কুমার বাহাদুর, আমি দুঃখিত যে, পুলিশ মহল বারবার একই ভুল করে অযথা আপনাকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। আপনার দুর্ভাগ্য, কারণ আপনি হুবহু আমারই মত দেখতে।
প্রদীপ কুমার কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না যেন, সে পূর্বের মতোই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে দস্যু বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর বললো-পুলিশ মহল এবার নিজেদের ভুলের জন্য নাক-কান মলেছে, আর কোনোদিন এমন ভুল আর হবে না।
এবার প্রদীপ কুমার কথা বললো—আমি পুলিশ মহলকে বিশ্বাস করি না।
সে কথা অবশ্য সত্য কিন্তু মনে হয় আর তাদের এমন ভুল হবে না, কারণ তারা ডায়রীর পাতায় লিখে রেখেছে দস্যু বনহুরের দক্ষিণ বাহুতে……বলে বনহুর নিজের হাতের জামার অংশ তুলে ধরে বললো–এই জটের কথা উল্লেখ করা আছে, কাজেই আপনি নিশ্চিন্ত।
প্রদীপ কুমার দুচোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর আসন গ্রহণ করে একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো, তারপর একমুখ ধোয়া ত্যাগ করে বললো-আপাততঃ আমি আপনার সঙ্গে আছি।
প্রদীপ কুমারের মুখমণ্ডলে একটি দীপ্ত খুশিভরা ভাব ছড়িয়ে পড়ে। বলে প্রদীপ কুমার আপনি সঙ্গে থাকলে অনেক খুশি হবো।
দস্যু বনহুরকে পেয়ে প্রদীপ কুমার সত্যিই খুশি হলো, কারণ প্রদীপ কুমার জানে দস্যু বনহুর তার কোনো ক্ষতি করবে না বরং তাকে সহায়তা করবে। বেশ কিছুদিন হাঙেরী কারাগারে বন্দী থেকে প্রদীপ কুমার হাঁপিয়ে পড়েছিলো। দেহের দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে মনটাও তার দুর্বল হয়ে পড়েছিলো অনেকটা।
কান্দাই থেকে মন্থনা দীপ বহুদূরের পথ। প্রায় তাকে জাহাজ শাহান শাহে কাটতে হবে। কাজেই এ অবস্থায় বনহুরকে পাশে পাওয়া তার পক্ষে সৌভাগ্য বলা যায়।
বনহুর আপন মনে সিগারেট পান করছিলো। তার পাশেই আর একটি আসনে বসে আছে। প্রদীপ কুমার।
ক্যাবিন নিস্তব্ধ।
শুধু জাহাজের একটানা ঝকঝক শব্দের সঙ্গে সাগরবক্ষের জল রাশির উচ্ছল শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্রদীপ কুমার আন মনে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে।
বনহুর হঠাৎ বলে উঠলো–প্রদীপ কুমার, আপনি আমার উপর ভীষণ অসন্তুষ্ট, তাই নয় কি?
প্রদীপ কুমার ফিরে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে-না না, আমি মোটেই অসন্তুষ্ট নই, কারণ আপনি এ ব্যাপারে দোষী নন। বরং আমি নিজকে গৌরবান্বিত মনে করি এজন্য।
প্রদীপ কুমারের কথায় বনহুরের মুখমণ্ডল খুশিতে ভরে উঠলো, বললো-সত্যি!
হাঁ
বনহুর প্রদীপ কুমারের সঙ্গে হাত মিলালো।
