মিঃ হেলালীর পাশে দুজন পুলিশ তার সেবা করতে লাগলো। মিঃ জায়েদী, মিঃ জাফরী ও পুলিশ বাহিনী সমগ্ৰ কান্তা বারে অনুসন্ধান করে চললো।
সমস্ত কক্ষ প্রায় শূন্য।
হঠাৎ একটি কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে আরষ্ট হয়ে গেলেন মিঃ জায়েদী এবং মিঃ জাফরী। তারা দেখলেন সেই কক্ষমধ্যে কতকগুলো ছিন্ন মস্তক স্তূপাকার করে রাখা হয়েছে। একটা উৎকট গন্ধও তাদের নাকে প্রবেশ করলো। মিঃ জায়েদী এবং মিঃ জাফরী নাকে রুমালচাপা দিলেন। তারা বুঝতে পারলেন, গত কিছুদিন যাবৎ যে মস্তকবিহীন লাশগুলো কান্দাই শহরে পাওয়া গেছে সেইসব লাশের মস্তকগুলোই এখানে স্তূপাকার করে রাখা হয়েছে।
সুইপারের সাহায্যে ছিন্ন মস্তকগুলো গুছিয়ে রাখতেই চিনতে পারলেন এগুলো কোন্টা কার মাথা। এই নরমুন্ডগুলোর মধ্যে একটা রয়েছে হতভাগ্য মির্জা মোহাম্মদের। খাদ্য বিভাগীয় প্রধানের সহকারী ছিলেন তিনি।
অবশ্য মির্জা মোহাম্মদ কেমন লোক ছিলো, সে কথা সবাই জানতো। তিনি সরকারের লোক বলে সবাই তাকে একটু সমীহ করতো। কিন্তু সকলেই বিরূপ ছিলো তার উপর কারণ এই ব্যক্তি দেশের জনগণের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে খাদ্য গোপনে পাচার করতে দেশের বাইরে, তার বিনিময়ে পেতে লাখ লাখ টাকা।
শুধু মির্জা মোহাম্মদই নয়, এমনি ধরনের যারা দেশের গোপন শত্রু তাদের অনেকেরই ছিন্ন। মস্তক রয়েছে এই মুভস্যুপের মধ্যে।
তবুতো হত্যা–তাই হত্যাকারী অপরাধী নিঃসন্দেহে। কাজেই পুলিশ বাহিনী হত্যাকারীকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না!
এসব হত্যাকান্ড যে দস্যু বনহুরেরই কাজ তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর ব্যাপার, দস্যু বনহুরকে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে আটকে রাখা সত্বেও সে কিভাবে বেরিয়ে এলো!
মিঃ জাফরী হাঙ্গেরী কারাগারে ফোন করে আরও হতবাক হয়ে পড়েছেন। জেল প্রধান। জানিয়েছেন দস্যু বনহুর ঠিক জায়গায়ই বন্দী অবস্থায় রয়েছে। পুলিশ প্রধানগণ এ সংবাদে আরও বিস্মিত হয়েছেন, তবে কার এমন দুঃসাহস যে দস্যু বনহুর নামে নিজকে চালিয়ে নিয়ে চলেছে এবং এসব হত্যালীলা সংঘটিত করে চলেছে।
কান্তা বারে তন্ন তন্ন করে সন্ধান চালিয়েও দস্যু বনহুর নামী কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া গেলো না।
দিপালীকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তবু কোনো ফল হলো না।
মিঃ জাফরী এবং জায়েদী যখন দিপালীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন তখন হঠাৎ একটি পুলিশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো, সে ব্যস্ত কণ্ঠে বললো স্যার, কান্তা বারের একটি কক্ষে অনেকগুলো লোক আটক রয়েছে তারা কারা এবং কে তাদের সেখানে আটক করে রেখেছে জানা যাচ্ছে না।
শোনামাত্র মিঃ জাফরী বললেন-দেখুন মিঃ জায়েদী, আমি যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। ভেবেছিলাম কান্তা বারের লোকগুলো গেলো কোথায়? সব তো আর হাওয়ায় উধাও হয়নি।
মিঃ জায়েদী সহ মিঃ জাফরী এবং আরও কয়েকজন চললেন সেই কক্ষ অভিমুখে যে কক্ষমধ্যে আটক রয়েছে কান্তা বারের কর্মচারীরা!
দিপালীও না গিয়ে পারলো না, কারণ তার মনেও নানারকম প্রশ্ন আলোড়ন জাগিয়েছে। দস্যু বনহুরই তাহলে এসব কান্ড করেছে।
পুলিশ প্রধানদের সঙ্গে দিপালীও এগুলো।
যে কক্ষমধ্যে কান্তা বারের কর্ম চারিগণকে আটক করে রাখা হয়েছে সেই কক্ষে পৌঁছে সবার চোখে বিস্ময় জাগলো। এতোগুলো লোককে একই সঙ্গে কি করে জড়ো করা হয়েছে। সবাই সংজ্ঞাহীন এবং স্তূপাকার অবস্থায় রয়েছে দেখতে পেলেন পুলিশ অফিসারগণ।
দিপালীর চোখ দুটো গোলাকার হয়ে পড়েছে। রাজকুমার জ্যোতির্ময়ের এই কাজ! সে কখন কেমন করে এমনভাবে অতি সতর্কতার সঙ্গে এতোগুলো লোককে কাবু করে ফেলেছে?
দিপালীর ভাবনার শেষ নেই। সে আরও ভাবছে, রাজকুমারবেশী দস্যু বনহুর একটু পূর্বেই কান্তা বারে ছিলো, সেই বা গেলো কোথায়?
দিপালী জানালো, যারা এই কক্ষে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রয়েছে এরা সবাই দোষী। কান্তাবারের অভ্যন্তরে যে গোপন দুষ্কর্ম চলতো তার সহকর্মী এরা!
মিঃ জাফরী দিপালীকেও বাদ দিলেন না, আটক বন্দীদের সঙ্গে তাকেও বন্দী করে নিয়ে চললেন। যদিও দিপালী বলেছিলো আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।
*
মিঃ জাফরী এবং অন্যান্য পুলিশ প্রধান হাঙ্গেরী কারাগারে পৌঁছে দস্যু বনহুর ভ্রমে আটক বন্দীকে পরীক্ষা করেও নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না, কারণ এটাই যে দস্যু বনহুর তাতে তারা নিঃসন্দেহ ছিলেন।
মিঃ জাফরী নিজে হাঙ্গেরী কারাগারে প্রবেশ করে এক নম্বর লৌহ কারাকক্ষের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন জঁদরেল পুলিশ প্রধান এবং মিলিটারী ক্যাপ্টেন মিঃ হুদা।
মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। রুক্ষ একরাশ চুল ছড়িয়ে আছে ললাটের চারপাশে। দীপ্ত উজ্জ্বল নীল দুটি চোখ কেমন যেন নিষ্প্রভ উদাসীন। এগিয়ে এলো বন্দী।
মিঃ জাফরী তীক্ষ্ণ নজরে তাকালেন বন্দীর মুখের দিকে। হঠাৎ মনে পড়লো কোনো একটি কথা। মিঃ জাফরী লৌহশিকের ফাঁক দিয়ে হাত প্রবেশ করিয়ে একটানে ছিঁড়ে ফেললেন বন্দীর হাতের পাশের জামার কিছু অংশ। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লো দক্ষিণ বাহুখানা। মিঃ জাফরীর চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে উঠলো, কারণ তিনি জানেন দস্যু বনহুরের দক্ষিণ বাহুতে একটি বড় জট বা আঁচিলের চিহ্ন ছিলো। এর বাহুতে কোনো আঁচিল বা জট নেই।
