মিঃ হেলালী, দেয়ালে ঠেশ দিয়ে ধুকছিলেন।
বনহুর তাকে ধরে বললো–চলুন উপরে চলুন। এসো দিপালী, ওর ঐপাশে ধরুন।
দিপালী এসে মিঃ হেলালীর একটি হাত কাঁধের উপর তুলে নিলো।
বনহুর আর দিপালীর সহায়তায় সুড়ঙ্গপথে এগিয়ে চললেন মিঃ হেলালী। ক্ষুধা-পিপাসায় তিনি এতো বেশি কাতর হয়ে পড়েছিলেন যে, একটি কথাও বলতে পারছিলেন না। টেনে টেনে অতিকষ্টে পা তুলে এগুচ্ছিলেন।
একসময় পৌঁছে যায় ওরা সুড়ঙ্গপথের শেষ মুখে। সেখানে একটি লিফট ছিলো।
বনহুর মিঃ হেলালীকে লিফটে তুলে ধরলো।
দিপালীও এসে দাঁড়ালো লিফটের উপরে।
একটা বোতামে চাপ দিতেই লিটখানা সাঁ সাঁ করে উপরে উঠতে লাগলো।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
লিফট এসে থেমে গেলো। লিফটের দরজা আপনা আপনি খুলে গেলো।
বনহুর এবং দিপালী মিঃ হেলালী সহ নেমে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে লিফট নেমে গেলো নিচে।
দিপালী বললো–কান্তা বারে এখনও বহু শয়তান আত্নগোপন করে আছে।
বনহুর বললো-সবাইকে আমি তাদের উপযুক্ত যায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছি, কাজেই কান্তা বার শূন্য। কান্তা বারের অতল গহ্বরে তিল তিল করে শুকিয়ে মরবে হিম্মত খা। লিফটের চাবি আমি ভেঙে দিয়েছি। লিফটখানা আর কোনোদিন উপরে উঠে আসবে না বা কেউ কোনোদিন ঐ অন্ধকার কারাকক্ষের সুড়ঙ্গপথে নিচে নেমে যেতে পারবে না।
মিঃ হেলালীকে সঙ্গে করে কান্তা বারের সুসজ্জিত একটি কক্ষে এসে দাঁড়ালো বনহুর আর দিপালী।
দিপালী অবাক হয়ে গেলো।
সে জ্ঞান হবার পর কান্তা বার কোনোদিন এমন নীরব দেখেনি। কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই। সবাই গেলো কোথায়?
বনহুর মিঃ হেলালীর হাতে রিসিভার তুলে দিয়ে বললো–পুলিশ অফিসে ফোন করুন।
মিঃ হেলালী বললেন–আমার কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেছে, আমি কোনো কথা বলতে পারছি না।
বেশ, আমিই করছি। বনহুর নিজেই পুলিশ অফিসে ফোন করলো –হ্যালো…কে কথা বলছেন?
ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো মিঃ হাসানের…আমি ইন্সপেক্টর হাসান বলছি…হ্যালো আপনি কে এবং কোথা থেকে বলছেন…
…দস্যু বনহুর…কান্তা বার থেকে বলছি…
মিঃ হাসানের হাত থেকে রিসিভার খসে পড়তে যাচ্ছিলো, তিনি রিসিভার শক্ত করে ধরে বললেন…দস্যু বনহুর…তুমি…তুমি…হাঙ্গেরী ..কারাগার থেকে পালিয়েছে…
…না, হাঙ্গেরী কারাগারে আমি ছিলাম না…যাকে হাঙ্গেরী কারাগারে রাখা হয়েছে, সে ঠিকই সেখানে রয়েছে…আপনারা পুলিশ বাহিনী এবং পুলিশ ভ্যান নিয়ে এক্ষুণি কান্তা বারে চলে আসুন… মিঃ হেলালী মুক্তি পেয়েছেন…তাঁর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন…শীঘ্র চিকিৎসার প্রয়োজন…– মিঃ হাসান যেন থ বনে গেছেন। দস্যু বনহুর স্বয়ং তার কাছে পুলিশ অফিসে ফোন করেছে, এটা যেন সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য, কারণ দস্যু বনহুর হাঙ্গেরী কারাগারে বন্দী আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে যে ফোন করলো কে সে?
মিঃ হাসান পুলিশ ফোর্স নিয়ে কান্তা বারে যাবেন কিনা ভেবে অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি কয়েক স্থানে ফোন করলেন। প্রথমে করলেন মিঃ জায়েদী, মিঃ জাফরী এবং কয়েকজন পুলিশ অফিসারের কাছে।
সবাই মিঃ হাসানের ফোন পেয়ে বিস্মিত-হতবাক স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা জানেন দস্যু বনহুর হাঙ্গেরী কারাগারে বন্দী আছে কিন্তু একি কথা, দস্যু বনহুর কান্তা বার থেকে এই মুহূর্তে ফোন করেছে, এ যে একেবারে অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
ওয়্যারলেসে মিলিটারী ক্যাম্পে জানিয়ে দিলেন মিঃ হাসান, এক্ষুণি যেন কিছুসংখ্যক মিলিটারী নিয়ে ক্যাপ্টেন হুদা চলে আসেন।
সমস্ত পুলিশ মহলে সাড়া পড়ে গেলো।
শহরময় ছুটোছুটি শুরু হলো পুলিশ আর মিলিটারী ভ্যানে!
মিঃ জায়েদী এবং মিঃ জাফরী পুলিশ বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন কান্তা বারের সম্মুখে।
ততক্ষণে ক্যাপ্টেন হুদা কিছুসংখ্যক মিলিটারী সহ এসে পৌঁছে গেছেন।
একসঙ্গে সবাই মিলে অস্ত্র বাগিয়ে ধরে কান্তা বারে প্রবেশ করে। মিলিটারীরা সমগ্র কান্তা বার ঘেরাও করে ফেলে।
মিঃ জায়েদী এবং মিঃ জাফরী পুলিশ বাহিনীকে কান্তা বারের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়বার নির্দেশ দিয়ে নিজেরা রিভলভার উদ্যত করে প্রতিটি কক্ষে সন্ধান চালাতে শুরু করেন।
কিন্তু বেশিক্ষণ সন্ধান করতে হয় না, কান্তা বারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই নজরে পড়ে একটি কক্ষের সোফায় জীর্ণ ক্ষত-বিক্ষত দেহে মিঃ হেলালী বসে রয়েছেন। তাকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারেন না পুলিশ প্রধানদ্বয়।
তবে বেশিক্ষণ বিলম্বও হয় না চিনতে, মিঃ জায়েদীই প্রথমে বলেন–কে আপনি? মিঃ হেলালী না?
ক্ষীণ জড়িত কণ্ঠে বললেন মিঃ হেলালী–হাঁ আমি…. হেলালীই বটে….আপনারা আমাকে শীঘ্র বাঁচান……
মিঃ জায়েদী মিঃ হেলালীর বুকে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন- বুঝেছি শয়তান দস্যু বনহুর আপনাকে বন্দী করে রেখেছিলো…… বলুন কোথায় সে?
মিঃ জাফরীর দুচোখেও আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিলো। তিনি মিঃ হেলালীর করুণ অবস্থা দেখে রাগে ফেটে পড়ছিলেন। মনে করেছেন দস্যু বনহুর মিঃ হেলালীকে আটক রেখে তার উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে তাকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছে। মিঃ জাফরী চিৎকার করে বলেন কোথায় সেই নরহন্তাকারী দস্যু?
মিঃ হেলালী বললেন—দস্যু বনহুরকে আপনারা অযথা গালমন্দ করছেন। সে-ই আমাকে উদ্ধার করেছে।
মিঃ হেলালীর কথা কারো কানে গেলো না, সবাই তখন হন্তদন্ত হয়ে দস্যু বনহুরের সন্ধান করে চলেছে।
