হিম্মৎ খাঁ কিছু বুঝবার পূর্বেই জ্যোতির্ময়ের রিভলভার তার বুক থেকে সরে গর্জে উঠলো এবং সঙ্গে সঙ্গে ভূতলে লুটিয়ে পড়লো একজন লৌহশলাকাধারী শয়তান। পরমুহূর্তে দ্বিতীয় ব্যক্তিও লুটিয়ে পড়লো।
হিম্মৎ খাঁ এমন একটা অবস্থার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। সে উপস্থিত কোনো একটা অস্ত্রের সন্ধানে তাকালো এদিক ওদিক।
হিম্মৎ খাঁর সঙ্গীদ্বয়ও পালাতে যাচ্ছিলো কিন্তু পালাবার সময় পেলো না তারা। জ্যোতির্ময়ের রিভলভারের গুলী তাদের হৃৎপিন্ড বিদীর্ণ করলো।
দিপালীর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। রাজকুমার জ্যোতির্ময়কে সে একজন নিরীহ লোক মনে করেছিলো, কিন্তু এ মুহূর্তে তার রুদ্রমূর্তি দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
হিম্মৎ খাঁও কম অবাক হয়নি, সে জ্যোতির্ময়কে কান্তা রারের একজন বড়রকমের খদ্দের মনে করে এসেছে এতোদিন। জ্যোতির্ময় আসার পর থেকে তার কান্তা বারের উপার্জন বেড়ে গেছে দ্বিগুণভাবে, কাজেই ওকে হিম্মৎ খাঁ সব সময় সমীহ করে এসেছে একান্তভাবে। আজ হঠাৎ এই মুহূর্তে সেই খদ্দেরকে অদ্ভুত এক মূর্তিতে দেখে হতবাক হবার কথাই বটে।
কিন্তু বেশিক্ষণ সময় লাগলো না হিম্মৎ খাঁর সামলে উঠতে। সে আক্রমণ করলো ক্ষুব্ধ শার্দুলের মত জ্যোতির্ময়কে। কিন্তু জ্যোতির্ময় ক্ষিপ্রগতিতে একপাশে সরে গিয়ে হিম্মৎ খাঁর বুক লক্ষ্য করে রিভলভার উঁচিয়ে ধরলো–সাবধান, একটুও নড়বে না, তাহলে ওদের মত তোমাকেও এক্ষুণি যমালয়ে পাঠাব।
বন্দীর দুচোখে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। এততক্ষণ তার চোখ দুটো চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অস্ফুট কণ্ঠে বললো সে–দস্যু বনহুর!
হিম্মৎ খাঁ মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলো, তার কণ্ঠ দিয়েও বেরিয়ে এলো–দস্যু বনহুর!
জ্যোতির্ময় গম্ভীর কঠিন কণ্ঠে বললো-হা, আমি তোমাদের যমদূত দস্যু বনহুর।
দিপালীর দুচোখে শুধু বিস্ময় নয়, দুচোখে তার বিরাট একটা জিজ্ঞাসা, একটা প্রশ্ন। সেও মনে মনে বলে উঠলো—রাজকুমার জ্যোতির্ময় তাহলে দস্যু বনহুর!
বনহুরের রিভলভারের আগা তখন হিম্মৎ খাঁর বুকে ঠেকে আছে।
হিম্মৎ খাঁ একচুল নড়তে পারছে না।
তার সহচরদের রক্ত গড়িয়ে আসছে পায়ের নিচে। হিম্মৎ খাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। বনহুর ওকে লক্ষ্য করে বললো–মনে রেখো শয়তান, ওদের মতো তোমাকে এতো সহজে পরপারে পাঠাবো না। চলো এগিয়ে চল, নিজের হাতে খুলে দাও মিঃ হেলালীর দেহের লৌহশিকল।
দিপালী অবাক হয়ে দেখছে–একি সে স্বপ্ন দেখছে না সত্য, ভেবে পাচ্ছে না। জ্যোতির্ময় যে দস্যু বনহুর, এ কথা সে ভাবতে পারছে না কিছুতেই।
হিম্মৎ খাঁর কণ্ঠনালী শুকিয়ে এসেছে। সে নিরুপায়ভাবে এগিয়ে গেলো, তারপর নিজের হাতে মিঃ হেলালীর দেহের বন্ধন মুক্ত করে দিলো।
বনহুর এবার মিঃ হেলালীর দেহের মুক্ত লৌহশিকল পরিয়ে দিলো হিম্মৎ খাঁর শরীরে, তারপর বললো-এই গোপন কক্ষে তুমি বন্দী থাকো–এখানে কেউ তোমাকে সাহায্য করতে আসবে না। যতোদিন মিঃ হেলালীকে বন্দী করে রেখেছিলে ততোদিন তোমাকে পৃথিবীর বুকে নরক জ্বালা পোহাতে হবে। প্রতিদিন তোমার দেহে একশত করে বেত্রাঘাত করা হবে আর তোমাকে জীবিত রাখার জন্য এই মৃতদেহগুলো থেকে গলিত মাংস ভক্ষণ করানো হবে……
দিপালী ছুটে আসে, ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠে–রাজকুমার, আমার বাবাকে আপনি ক্ষমা করুন।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দস্যু বনহুর–ক্ষমা! ক্ষমা করবো তোমার বাবাকে? শয়তানকে ক্ষমা করা চলে তবু তোমার বাবাকে ক্ষমা করা চলে না।
এবার বনহুর মিঃ হেলালীর দেহের দিকে তাকিয়ে তাকে লক্ষ্য করে বলে–আপনি ভুল করেছিলেন এবং সে কারণেই প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করলেন।
মিঃ হেলালী বনহুরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন–আপনি দস্যু হয়ে এতো মহৎ, কি বলে যে আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাবো……
থাক সে কথা! এখন আপনি কান্তা বারে গিয়ে পুলিশ অফিসে ফোন করুন। আপনাকে আমি সাহায্য করছি চলুন। দিপালী, তুমিও মিঃ হেলালীকে সাহায্য করবে বলে আশা করি।
দিপালী কাতর চোখে বারবার হিম্মৎ খাঁর দিকে তাকাচ্ছিলো এবং তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো অশ্রুধারা।
বনহুর বললো-দিপালী, তুমি ওর আসল পরিচয় জানো না? হিম্মৎ খাঁ তোমার বাবা নয়, সে তোমাকে ছোটবেলায় চুরি করে এনেছিলো। সে একজন চির অসৎ ব্যক্তি। পরে সব তোমাকে খুলে বলবো, কারণ এখন মিঃ হেলালীর দ্রুত চিকিৎসার দরকার। হা আর একটি কথা, রাজকুমার জ্যোতির্ময়ের ছদ্মবেশে আমি অনেক সময় তোমার সঙ্গে মিথ্যা অভিনয় করেছি, সেজন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করো দিপালী, তাছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না। তোমার অজান্তে আমি তোমার কাছ থেকে বহু তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছি…
আপনি তাহলে মস্তকহীন নরহত্যার…
হাঁ দিপালী, ও আমার নরহত্যা নয়-রক্তের নেশা! রক্তের নেশায় আমি উম্মত্ত হয়ে পড়েছিলাম। দিপালী, তোমাদের কান্তা বারেরই একটি সুন্দর কক্ষে সেই নর শয়তানদের মস্তকগুলো স্তূপাকার করে সাজিয়ে রেখেছি।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠে দিপালী–কান্তা বারের অভ্যন্তরে সেই কাটা মস্তকগুলো পাকার করে সাজিয়ে রেখেছেন?
হাঁ, হাঁ দিপালী। পুলিশ এলে তাদের কাছে জানাবে, তারা সন্ধান করে নেবে কোথায় সেই মস্তকের স্তূপ রয়েছে।
