নাসিমা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে ওর মুখখানার দিকে। মশালের আলোত অদ্ভুত লাগছে ওকে। কঠিন দীপ্ত সুন্দর মুখ দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো বনহুর-সব আমি সহ্য করতে পারি কিন্তু মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি অবিচার করবে এ আমি সহ্য করতে পারি না। সে যে জাতীয় মানুষই হোক।
ওর কথাগুলো যেন নাসিমার হৃদয় স্পর্শ করছিল। এমন পুরুষ সে দেখেনি কোনদিন, তাই সে হতবাক হয়ে শুনতে থাকে ওর কথাগুলো।
ক্রমান্বয়ে মশালের আলো নিভে আসে।
বনহুর বলে-এবার শুয়ে পড়ুন মিস নাসিমা। রাত অনেক হয়েছে। হাই তোলে বনহুর, কারণ সে আজ অত্যন্ত পরিশ্রম করেছে।
নাসিমা বললো-আপনিও শুয়ে পড়ুন।
হাঁ আমিও শোব। মিস নাসিমা আর কিছুদিন আপনাকে কষ্ট করতে হবে।
তাতে আমার দুঃখ নেই। শুধু ভয় হয় আপনার যদি কোন বিপদ ঘটে তাহলে…..
তাহলে এই অন্ধকারময় গুহায় আপনি একা অসহায় কি করবেন এই তো?
মরতে আমার ভয় নেই। এ গুহায় তিল তিল করে শুকিয়ে মরবো তবু আপনাকে মরতে দিতে চাই না। আপনি মানুষ নন, একটি দীপ্তময় প্রতিভা। আপনাকে হারালে পৃথিবী এক মহামূল্য সম্পদ হারাবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আপনি…….
হঠাৎ নাসিমার চোখ দু’টো ওদিকে অন্ধকারে চলে যায়, চিৎকার করে উঠে নাসিমা।
বনহুর সবেমাত্র শুয়ে পড়েছিলো, লাফ দিয়ে উঠে বসে তাকায় যেদিকে তাকিয়ে নাসিমা চিৎকার করে উঠেছিলো, দেখতে পায় দুটি চর্টের আলো ওদিকের ফাটলের মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
নাসিমা ভয়াতুরভাবে এগিয়ে গিয়ে বনহুরের বুকে মুখ লুকায়, দেহখানা তার থর থর করে কাঁপছে।
টর্চের আলো দুটো যেন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
বনহুর নাসিমাকে নিবিড় করে আঁকড়ে ধরলো। ভুলে গেলো নাসিমা তার কেউ নয়, সে কথা।
[পরবর্তী বই ফাংহায় দস্যু বনহুর]
অট্টহাসি – ৭৩
জ্যোতির্ময় চমকে উঠলো।
দিপালী বললো—ভয় নেই রাজকুমার, সেই হতভাগ্যটিকে নির্যাতন করা হচ্ছে।
উঃ! কি পিশাচ তোমরা!
হাঁ রাজকুমার, আমরা পিচাশই বটে। দিনের পর দিন আমরা নিরীহ মানুষের বুকের রক্ত নিংড়ে নেই। এমনি করে কত জীবন যে আমাদের এখানে নিঃশেষ হয়ে গেছে……একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে দিপালী।
জ্যোতির্ময় কোনো উত্তর না দিয়ে এগুতে থাকে।
সুড়ঙ্গপথে এগুচ্ছিলো ওরা।
সুড়ঙ্গপথে তেমন কোনো আলো ছিলো না। আধো অন্ধকারে অতি সতর্কতার সঙ্গে পথ চলছিলো জ্যোতির্ময় আর দিপালী।
হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি পরিলক্ষিত হলো।
থমকে দাঁড়িয়ে ছায়ামূর্তি পরিলক্ষিত হলো।
জ্যোতির্ময় কিছু বলতে যাচ্ছিলো, দিপালী ওর হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে অপর হাতের। একটি অংগুলি ঠোঁটে চাপা দিয়ে বললো—চুপ!
দিপালীর থেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্ময় নিজেও থেমে পড়েছিলো!
ছায়ামূর্তি অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই বললো দিপালী–আর একটু হলেই সর্বনাশ হতো।
অবাক কণ্ঠে বললো জ্যোতির্ময়–কেন?
দিপালী চাপাকণ্ঠে বললো-বাবা ঐদিকে গেলো। একটু থেমে বললো সেচলুন রাজকুমার, ফিরে যাই।
জ্যোতির্ময় বললো—না, এতোদুর এসে ফিরে যেতে আমি চাই না দিপালী।
কিন্তু……।
কোনো কিন্তু নেই, চলো।
বাবা আছে সেখানে……
থাকলোই বা…….।
এবার স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে একটা তীব্র আর্তনাদ। অতি যন্ত্রণাদায়ক মর্মস্পর্শী করুণ কণ্ঠস্বর। সমস্ত সুড়ঙ্গপথ যেন সে আর্তনাদের শব্দে শিউরে উঠছে।
দিপালী বললো–ও দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারবো না রাজকুমার। আপনি যান, আমি এখানে অপেক্ষা করছি। কিন্তু সাবধান, কেউ যেন দেখে না ফেলে।
জ্যোতির্ময় বললো-আমি নিজে সতর্ক এবং সাবধান আছি দিপালী, তুমি আমার জন্য কিছু ভেবো না।
এগুলো জ্যোতির্ময়।
দিপালী দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে।
আর সামান্য পথ এগুলেই সুড়ঙ্গপথ শেষ হবে এবং একটি আধো অন্ধকার কক্ষ দেখা যাবে। সেখানেই রাখা হয়েছে সেই বন্দী লোকটিকে। হাত-পা লৌহশিকলে আবদ্ধ, সমস্ত শরীরে কষাঘাতের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। স্থানে স্থানে কেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। জামা-প্যান্ট ছিঁড়ে ঝুলে পড়েছে।
জ্যোতির্ময় আড়ালে এসে দাঁড়ালো। সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই শিউরে উঠলো সে, দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো রাজকুমার।
কখন যে দিপালী তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো বুঝতে পারেনি জ্যোতির্ময়। দিপালী জ্যোতির্ময়ের কাঁধে হাত রাখলো।
চমকে উঠলো জ্যোতির্ময়, অস্ফুট কণ্ঠে বললো–তুমি।
হাঁ, এলাম।
কি নির্মম দৃশ্য!
ঠিক ঐ মুহূর্তে দুজন লোক একটি লৌহকড়াই ধরে নিয়ে এলো। লৌহকড়াইর মধ্যে গনগনে আগুন জ্বলছে। আগুনে গোঁজা রয়েছে দুটো লৌহ সাঁড়াশি।
দিপালী আর জ্যোতির্ময় বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। ওদের দুচোখে ফুটে উঠেছে একটা ভীতিকর ভাব।
জ্যোতির্ময় কিছু বলতে যাচ্ছিলো।
দিপালী ওর মুখে হাতচাপা দিলো।
সেখানে আরও তিনজন এসে দাঁড়িয়েছে। দিপালী আর জ্যোতির্ময় তাকিয়ে দেখলো, তাদের মধ্যে রয়েছে কান্তা বারের দুজন লোক আর দিপালীর বাবা হিম্মৎ খাঁ।
হিম্মৎ খাঁ আদেশ দিলো–ওকে চিরদিনের মত অন্ধ করে দাও।
অমনি দুজন লোক যারা লৌহকড়াই বহন করে আনলো তারা অগ্নিদগ্ধ লৌহশলাকা দুটো তুলে নিলো হাতে, তারপর ভয়ঙ্কর একটা শব্দ করে এগুতে লাগলো বন্দীর দিকে।
ঐ সময় হঠাৎ জ্যোতির্ময় দিপালীকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলো এবং মুহূর্তে প্যান্টের পকেট থেকে একটি রিভলভার বের করে চেপে ধরলো হিম্মৎ খাঁর বুকে।
