অনেক চেষ্টা করে কোন রকম রক্তের দাগ বা সন্দেহজনক কিছু নজরে পড়লো না। নাসিমার মন ক্রমেই চঞ্চল হয়ে উঠছে। একে ক্ষুধা পিপাসায় সে অত্যন্ত কাতর।
ভাবে নাসিমা ও তাকে এ গুহায় রেখে পালিয়ে গেছে। আর কোনদিন ফিরে আসবে না। নাসিমা এই অন্ধকারময় গুহায় তিল তিল করে শুকিয়ে মরবে। কোনদিনই সে এ গুহা থেকে বেরুতে পারবে না।
সমস্ত দিনটা কেটে যায় তবু ফিরে আসে না বনহুর। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করে ওর কিন্তু কেঁদে কি হবে। চারিদিকে শুধু পাষাণ প্রাচীর, চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পাবে না।
তবু নাসিমা চিৎকার করে ডাকতে লাগলো-কে কোথায় আছে আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও……কে…কোথায় আছো আমাকে বাঁচাও……
প্রতিধ্বনি ফিরে এলো কিন্তু কারো সাড়া এলো না।
উপরের ঐ ফাঁকটুকুর দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছে। ঐ ফাঁকটুকুই এখন যেন তার ভরসা। ক্ৰমে সন্ধ্যা হয়ে আসছে, বেশ বুঝতে পারছে আকাশটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে এলো ভিতরটাও জমাট অন্ধকারে ভরে উঠেছে ক্রমান্বয়ে।
কাল সে ছিলো, আজ সে একা। এই নির্জন গুহায় কি করে তার রাত কাটবে। —
হঠাৎ নাসিমার দু’চোখে আলোর বন্যা ছড়িয়ে পড়লো। কে যেন উপর থেকে গুহার মধ্যে আলো ফেলছে। নাসিমা-ভীত. জড়োসড় হয়ে গুহার এক পাশে আশ্রয় নিলো, ভাল ভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো, সেটা মশালের আলো। কেউ যেন মশাল নিয়ে নিচে নেমে আসছে।
প্রথমে ভয় পেলেও, অল্পক্ষণ পরেই নাসিমা দেখতে পেলো, ও আসছে। পাথর বেয়ে বেয়ে ধীরে ধীরে নামছে বনহুর। দাঁত দিয়ে একটা পুটলী ধরে আছে, বাম হাতে একটি জ্বলন্ত মশাল। ডান হাতে পাথর এটে ধরে ধরে নামছে।
বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। বনহুরকে ফিরে আসতে দেখে দু’চোখে তার আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিলো।
বনহুর যতক্ষণ পর্যন্ত কষ্ট করে নামছিলো ততক্ষণ নাসিমা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত তাকিয়েছিলো তার দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর নিচে নেমে এলো বনহুর। জ্বলন্ত মশালটা একটা ফাটলে গুঁজে রেখে ফিরে তাকালো নাসিমার দিকে।
নাসিমার দুচোখে আনন্দ দূতি খেলে যাচ্ছে।
বনহুর বললো-নাসিমা এই নাও তোমার জন্য খাবার এনেছি।
নাসিমা এততক্ষণে খুশির উচ্ছ্বাসে বনহুরের চেহারাটা ভালভাবে লক্ষ্য করেনি এবার ওর সমস্ত শরীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো-আপনার একি চেহারা হয়েছে?
একটু হেসে বললো বনহুর-আজ নতুন দেখছেন বলে অবাক হচ্ছেন। এরপর বোজ দেখবেন……থাক সে সব পরে হবে এখন এগুলো খেয়ে নিন তো? বনহুর জামার মধ্যে থেকে খাবারগুলো বের করে নাসিমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো-নিন।
নাসিমা হাত বাড়িয়ে নিয়ে গুহার মেঝেতে বসলো। তারপর বললো-আপনিও খেয়ে নিন।
হাঁ আমিও খাবো। সত্যি বড় ক্ষুধা পেয়েছে। বনহুর নিজেও খেতে শুরু করলো।
নাসিমা লক্ষ্য করলো অন্যান্য খাবারের চেয়ে সে ফলগুলোই শুধু খাচ্ছে। খাওয়া শেষ করে বললো-নিন ফল খেয়ে নিন।
আপনি শুধু ফল খেলেন-রুটি মাংস খাবে না?
না, ওগুলো আপনার জন্যই এনেছিলাম।
তা হয় না আপনিও খান।
হু। মাত্র দেড় টাকা রোজগার করে ছিলাম, তাই দিয়ে সামান্য রুটি মাংস এনেছি ওটুকু আপনি খান।
আমি অনেক খেলাম।
আমিও অনেক খেলাম মিস নাসিমা।
ফল খেয়ে পেট ভরে কখনও?
আমার ভরে।
আপনাকেও কুটি মাংস খেতে হবে। নাসিমা এবার রুটি আর মাংস খানিকটা ছিঁড়ে নিয়ে বনহুরের মুখের কাছে তুলে ধরে বলে-নিন্-হা করুন দেখি।
বনহুর অবাক চোখে তাকালো নাসিমার মুখের দিকে, মনে পড়লো মনিরার মুখখানা, এমনি করে সে তাকে খেতে না চাইলেও খাইয়ে দিতো। বনহুর এবার কোন রকম আপত্তি না করে। খেতে শুরু করলো।
মশালটা তখনও দপদপ করে জ্বলছে।
নাসিমা বললো-ভাগ্যিস মশালটা এনেছিলেন, না হলে নামতেন কি করে? একটু থেমে বললো আবার নাসিমা, কি যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সত্যি বলুন তো আমাকে না বলে অমন করে চলে গিয়েছিলেন কেন।
বললে হয়তো আমাকে যেতে দিতেন না কিংবা নিজেও আমার সঙ্গে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।
সে কথা মিথ্যা নয়, মোটেই আমি আপনাকে একা যেতে দিতাম না।
তাহলে আমি ঠিকই করেছিলাম।
আচ্ছা আমরা দু’জনা কি এক সঙ্গে বেরুতে পারবো না কতদিন এখানে থাকতে হবে?
মিস নাসিমা ভেবেছিলাম দু’একদিন এখানে আত্মগোপন করে থাকতে হবে-কিন্তু তা হলো না।
কেন?
ফাংহার নিরীহ মানুষদের প্রতি ফাংহা সরকারের নির্মম আচরণ আমার ধমনির রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আজ যেখানে আমি কাজ করে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা পেয়েছি-সেখানেই দেখেছি ফাংহার আসল রূপ। ……কি করে মানুষ হয়ে মানুষ পিটে মারে……
মশালের আলোতে নাসিমা দেখলো বনহুরের চোখ মুখে এক অদ্ভুত দীপ্তভাব।
নাসিমা বলে-এরাতো আপনার দেশের মানুষ নয়, এদের জন্য আপনার এতো দরদ কেনো?
হঠাৎ হেসে উঠে বনহুর।
নাসিমা অবাক চোখে তাকায় তার মুখে।
বনহুরের হাসির শব্দে নিস্তব্ধ গুহা মধ্যে প্রতিধ্বনি বাজে। নাসিমার দু’চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ে কারণ ওকে সে এমন করে হাসতে দেখেনি কোনদিন।
বনহুর হাসি থামিয়ে বলে-মিস নাসিমা সমস্ত পৃথিবীর মানুষ আমার কাছে এক।
না, আমি ঠিক তা বলছি না।
বলছি এরা তো বাঙালী নয়!
আবার আপনি ভুল করছেন মিস নাসিমা। কারণ মানুষ সবাই মানুষ। বাঙ্গালী, বিহারী, খ্রিস্টান, নিগ্রো, সবাই মানুষ পাকিস্তানীদের প্রতি আমার কোন আক্রোশ নেই, কারণ এরা সবাই অপরাধী নয়। আমি চাই যে দোষ করবে সেই শাস্তি পাবে। একটু থেমে আবার বললো বনহুর-বাংলাদেশে যে সব অবাঙ্গালী আছে, আমি চাই না বিনা দোষে তাদের উপর অত্যাচার চলুক। আমি চাই না পাকিস্তানে যে বাঙালী আছে, তাদের প্রতিও এরা অবিচার করুক। আমি চাই না-আমি মানি না, আমি সহ্য করতে পারি না, কোন অন্যায়, অনাচার, অবিচার……।
