বেশ কিছুক্ষণ উভয়ে চুপ চাপ।
হাজার হলেও নাসিমা নারী, এমন নির্জন অন্ধকারময় গুহায় একটি পুরুষের সঙ্গে রাত কাটানো কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিলো সে। কিন্তু কোন উপায় নেই।
বনহুর বললো-জায়গাটা ভিজে বা স্যাঁত স্যাঁতে নয়, কাজেই আমাদের রাত কাটানো তেমন কোন অসুবিধা হবে না। মিস নাসিমা আপনি শুয়ে পড়ুন।
আর আপনি?
আমিও ঘুমাবো। বনহুর নিজে বড় ক্লান্ত বোধ করছিলো। কাজেই সে শুয়ে পড়লো হাতের উপর মাথা রেখে।
নাসিমা যেমন বলেছিলো তেমন বসে রইলো।
বনহুর নাসিমার পাশ থেকে কিছুদূরে শুয়ে ছিলো। তাকিয়ে বললো-আপনি কি শুয়েছেন?
নাসিমা বললো-না।
কেন?
নাসিমা কোন জবাব দিলো না।
বনহুর বললো আবার-শুয়ে পড়ুন।
না আমি বসেই রাত কাটিয়ে দেবো, বললো নাসিমা।
বনহুর একটু হেসে বললো-বুঝেছি আপনার কষ্ট হচ্ছে। এমনভাবে কোনদিন মাটির মধ্যে ঘুমাননি তো?
বনহুর নিজের শরীর থেকে জামাটা খুলে নাসিমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো-এটা বিছিয়ে শুয়ে পড়ুন।
নাসিমা জামাটা তুলে নিলো হাতে, একটা অনাবিল আনন্দ তার মনকে দীপ্ত করে তুললো। খুশি হলো সে অনেক।
একটু পরে জিজ্ঞেস করলো বনহুর-শুয়েছেন আপনি?
হ শুয়েছি।
এবার ঘুমিয়ে পড়ুন।
বনহুরের ঘুম ভেংগে গেলো।
চোখ মেলে তাকালো সে। ভোর হয়ে গেছে। উপরের সেই ফাঁক দিয়ে ভোরের আলোক রশ্মি এসে গুহা মধ্যে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বনহুর দেখলো নাসিমা অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
হঠাৎ চমকে উঠলো, তার শরীরের উপর তারই জামাটা সে কখন বিছিয়ে দিয়ে গিয়েছে, কিছুই জানে না বনহুর।
একটু হাসির রেখা ফুটে উঠলো বনহুরের ঠোঁটের কোণে, কি যেন ভাবলো সে, নাসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর উঠে দাঁড়ালো। জামাটা পরে নিলো গায়ে। এবার সে তাকিয়ে দেখলো কোন রকমে বাইরে বের হওয়া যায় কিনা। তার যেমন ক্ষুধা পেয়েছে তেমনি ক্ষুধা পেয়েছে নাসিমার। সুন্দর মুখখানা ওর বড় মলিন করুণ দেখাচ্ছে।
বনহুর পাথর বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
যদিও তার কষ্ট হচ্ছিলো, তবু সে, প্রাণপণ চেষ্টায় এক সময় উঠে এলো উপরে। প্রায় দেড়শত গজ নিচে ঘুমিয়ে আছে নাসিমা।
পাথর খণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে তাকালো চারিদিকে কোথাও কোন জন মানব নেই। অদূরে পাথরের গা বেয়ে যে পথটা চলে গেছে সেই পথও এখন জনহীন নির্জন। কাল ঐ পথ দিয়েই সাতখানা পুলিশ ভ্যান তাকে আর নাসিমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিলো। ভাগ্যিস পাশে তেমনি একটি গভীর খাদ ছিলো, না হলে বড় মুশকিল হতো বিশেষ করে নাসিমাকে নিয়ে বিপদে পড়তে সে। বনহুর এবার নিজের জামাটা খুলে ফেললো এবং ছিঁড়ে ফেললো এখানে সেখানে। পরনের প্যান্টটাও হাটু অবধি গুটিয়ে নিলো। চুলগুলো আংগুল দিয়ে এলো মেলো করে ফেললো।
চোখে মুখে ধূলো বালি লাগিয়ে ঠিক একটি শ্রমিক সেজে নিলো বনহুর। তারপর চলতে লাগলো শহর অভিমুখে।
কিছুদূরে এগুতেই দেখতে পেলো কতকগুলো শ্রমিক, এক জায়গায় পাথর কেটে কেটে পাকার করছে এবং কতকগুলো শ্রমিক ঝুড়ি বোঝাই করে ট্রাকে তুলছে।
বনহুর আরও এগুতে লাগলো।
নিকটবর্তী হতেই চমকে উঠলো, দেখলো একজন বৃদ্ধ পাথর কাঁধে গাড়িতে তুলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার দেহে বল না থাকায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে একজন পাহারাদার তার চাবুক দিয়ে ভীষণভাবে আঘাত করতে লাগলো।
বৃদ্ধ লোকটা মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগলো।
বনহুর স্তব্ধ হয়ে দেখছে কি নির্মম দৃশ্য।
নিরীহ গরীবদের প্রতি কি নিদারুণ অত্যাচার।
বনহুর ভালভাবে লক্ষ্য করেই বুঝতে পারলো সেখানে যারা শ্রমিকের কাজ করছে তারা সবাই অত্যন্ত গরিব শ্রেণীর লোক আর কতকগুলো লোক তাদের তদারক করে চলেছে, তাদের প্রত্যেকের হাতেই বেত বা চাবুক আছে। যার কাজে একটু দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে তাকেই ওরা আঘাতের পর আঘাত করে চলেছে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্থিরভাবে দেখলো। তার ধমনির রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠলো। দুচোখে আগুন ঠিকরে বের হলো অধর দংশন করলো সে আপনা আপনি। তারপর এগুলো বনহুর শ্রমিকগণ যেখানে কাজ করছে সেখানে এসে দাঁড়ালো।
বনহুরকে দেখে এগিয়ে এলো এক পাহারাদার। হাতের চাবুক গাছা দোলাতে দোলাতে বললো-কি হে কাজ করবে নাকি?
বনহুর স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো-হ।
তবে এসো এদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কাজ করো। পয়সা পাবে। কথাগুলো বললো পাহারাদারটি।
বনহুর বললো-কত পয়সা দেবেন তাতো বললেন না?
এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে আমরা দেই। যে ভাল কাজ করে সে কিছু বকশিশ পায় আর যে ভাল কাজ করতে না পারে তার মজুরির মধ্য থেকে কিছু কাটা যায়।
বনহুর ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো আর আপনাদের চাবুকের ঘা হয় তাদের পাওনা।
হাঁ তা ঠিক বলেছো। ঐ দেখো একজন কাজ করতে অক্ষম তাই তাকে পেটানো হচ্ছে। পরাদারটি আংগুল বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলো।
বনহুর দেখলো একজন শ্রমিককে নির্মমভাবে প্রহার করে চলেছে। ভ্রূকুঞ্চিত হলো বনহুরের।
পাহারাদারটি বললো-কি কাজ করবে?
হাঁ করবো। জবাব দিলো বনহুর।
চলো তবে কাজ শুরু করো।
চলুন।
বনহুর পাহারাদরটিকে অনুসরণ করলো।
প্রথম দিন কাজ শেষ করে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা পেলো। পয়সা নিয়ে সে একটি দোকান থেকে কিছু রুটিমাংস নিলো তারপর ফিরে চললল সে যেখানে রয়েছে নাসিমা খান।
*
ওদিকে নাসিমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে, কেউ নেই, সে গেলো কোথায়। বুকটা ধক ধক্ করে উঠে এক অজানা আশঙ্কায়। একটা দারুণ অবিশ্বাসের ছায়া পড়ে তার মনে, ওর মনে এতো চক্রান্ত ছিলো। তাকে এখানে একা ফেলে সে চলে গেছে। যাবার সময় একটি কথাও সে বলে গেলো না। নাসিমা দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কিছুক্ষণ নীরবে কাঁদলো সে তারপর হঠাৎ মনে পড়েলো, হয়তো সে আপন ইচ্ছায় যায়নি, তাকে কেউ জোর করে নিয়ে গেছে কিংবা কোন হিংস্র জীবজন্তু ভক্ষণ করেছে। নাসিমা আঁচলে চোখের পানি মুছে গুহাটার মধ্যে দেখতে লাগলো। দিনের আলোতে কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিলো বটে।
