ততক্ষণে অন্যান্য গাড়ির পুলিশ বাহিনী, গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পাশ কেটে অতি সাবধানে বনহুরের গাড়ির দিকে এগুচ্ছে।
তারা রাইফেলের মুখ আকাশের দিকে তুলে ফাঁকা ফায়ার করে চলেছে, যেন বন্দী পালাতে ভয় পায়।
বনহুর কালবিলম্ব না করে, নাসিমাকে তুলে নিলো দু’হাতের উপর, তারপর লাফিয়ে পড়লো সে গাড়ি থেকে নিচে গভীর খাদের মধ্যে।
*
খুব চোট লেগেছে তোমার না? নাসিমাকে প্রশ্ন করলো বনহুর।
নাসিমা বনহুরের কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল কারণ বনহুর যখন নাসিমাকে তুলে নিয়ে আচমকা গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়েছিল তখন সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর তার জ্ঞান ফিরে এসেছে।
বনহুর যখন গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে তখন সে জানতো হয় মৃত্যু নয় জীবন, যা হয় একটা হবে। তবু পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী হবে না এবং নাসিমাকে তুলে দেবে না। আর এও জানতে পাহাড়ের বড় বড় খাদের মধ্যে নরম মাটিও থাকে।
বনহুর যা ভেবেছিল তাই হয়েছে।
লাফিয়ে পড়ার পর সে অনুভব করলো পায়ের নিচে তার কোমল মাটি। খোদাকে স্মরণ করে সে লাফ দিয়েছিলো, তাই হয়ত খোদার রহমে সে বেঁচে গেলো এ যাত্রা। বনহুর তাই প্রথমে খোদাকে হাজার হাজার ধন্যবাদ জানিয়ে নিলো।
তবে বাম পায়ে কিছুটা চোট লেগে ছিলো বনহুরের অল্পক্ষণেই সে সামনে নিয়েছিলো, অমন আঘাত সে জীবনে বহু পেয়েছে। কাজেই ব্যথা তার কাছে তেমন কিছু নয়। তার দুঃচিন্তা হয়েছিল নাসিমাকে নিয়ে। তারপর নাসিমার যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো, তখন বনহুর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো। যা হোক নাসিমার জীবনটাও তা হলে রক্ষা পেয়েছে।
বনহুর আবার প্রশ্ন করলো-মিস নাসিমা আপনি এখন কেমন বোধ করছেন?
ভালই আছি। কথাটা বলে সে তাকালো চারিদিকে, বললো নাসিমা আমরা এখন কোথায়?
বললো বনহুর-ফাংহার পর্বতমালার কোন এক গহ্বরে।
নাসিমার মনে পড়ে সব কথা। …….পুলিশ ভ্যানে তারা ছিল। হঠাৎ সম্মুখে একটা শব্দ, আচমকা গাড়িগুলো থেমে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে বনহুর পাশের পুলিশটার মুখে চোখে মুষ্টিঘাত শুরু করলো। তারপর শুরু হলো প্রচণ্ড লড়াই, তারপর আচমকা বনহুর তাকে হাতের উপর তুলে নিয়ে পাশের গভীর খাদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো। পর পর কয়েকটা গুলির শব্দ কানে এসেছিলো কিন্তু আর কিছু মনে নেই…..নাসিমা বললো-চারি দিকে এতো অন্ধকার লাগছে কেন?
গভীর খাদের মধ্যে আলো কোথায় পাবেন বলুন? এখন আপনি কোন রকম অসুস্থ বোধ করছেন না তো?
না। উঠে বসতে যায় নাসিমা।
বনহুর বলে-না, আপনি উঠবেন না। যেমন আছেন তেমন শুয়ে থাকুন।
আপনার কোথাও আঘাত লাগেনি তো?
না, খোদা আমাকে রক্ষা করেছেন। সবচেয়ে আমি বেশি খুশি হয়েছি আপনি সুস্থ আছেন সে জন্য।
নাসিমা বললো তখন-সত্যি আপনার কত দয়া।
আমার নয়, সব সেই দয়াময়ের দয়া। বললো বনহুর। একটু থেমে বললো আবার মিস নাসিমা এই অন্ধকারময় গহ্বরে আমাদের কতক্ষণ কাটাতে হবে কে জানে।
নাসিমা উঠে বসে বললো-অন্ধকারে আমার কেমন লাগছে।
বনহুর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললো-আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মিস নাসিমা। এখানে আমাদের জন্য অন্ধকারই শ্রেয়।
কিন্তু……।
বলুন?
আপনার বড় ক্ষুধা পেয়েছে।
আমার জন্য এতো ভাবছেন কেন। বরং আপনার বড় ক্ষুধা পেয়েছে জানি।
মেয়েরা অনেক কিছু সহ্য করতে পারে।
এতো বিপদেও নাসিমার মনে তার জন্য কত চিন্তা। যে কদিন সাগাই পোড়াবাড়িতে তারা ছিলো, নাসিমা তার জন্য নিজের হাতে রোজ খাবার তৈরি করেছে। নিজে না খেয়ে পরিবেশন করে খাইয়েছে। আজ নাসিমার কথায় সেই দিনগুলো বনহুরের চোখের সম্মুখে ভেসে উঠলো। বললো বনহুর-নাসিমা বাঙ্গালী মেয়েদের দুটো জিনিস আমাকে মুগ্ধ করে সে দুটো হলো একটি তাদের সেবা আর একটি হলো সতীত্ববোধ।
নাসিমা বলে-এ দু’টো যেন নারী জাতির শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
হাঁ সে কথা মিথ্যা নয় মিস নাসিমা। কারণ আমি দেখছি আমার মা; আমার স্ত্রীর মধ্যে এমনি এক দীপ্ত প্রতিভার বিকাশ।
অন্ধকার না হলে বনহুর নাসিমার মুখ ভাব লক্ষ্য করে বিস্মিত হতো। বনহুর যখন তার স্ত্রীর কথা তুললো তখন আচমকা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিলো ওর মুখ।
বনহুর বললো-মিস নাসিমা?
বলুন?
হঠাৎ চুপ করে গেলেন কেন?
না কিছু না।
কোন অসুবিধা হচ্ছে আপনার?
না।
বললাম তো কিছু না।
মিস নাসিমা আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, বলেছি আপনার কোন……।
বলুন থামলেন কেনো?
কোন ভয় নেই।
ভয়! আপনি পাশে থাকতে ভয়। ভয়কে আমি জয় করেছি……
বাইরেও অন্ধকার হয়ে আসছে বোধ হয়, সন্ধ্যা হয়ে এলো রাতটা এই গুহার মধ্যেই কাটাতে হবে।
এটা গুহা?
হা। পর্বতমালার কোন একটা গুহা।
এখানে এলাম কি করে?
আপনাকে সহ খাদটির মধ্যে লাফিয়ে পড়ার পর সেখান থেকে সরে আসি, কারণ ওরা কোন ক্রমে আমাদের দেখে ফেললে, যেমন করে থোক খাদ থেকে উঠিয়ে পাকড়াও করবে, তাতে কোনো কোন সন্দেহ ছিলো না।
এতোক্ষণে নাসিমা বুঝতে পারে বনহুর তার সংজ্ঞাহীন দেহটা নিয়ে এই গুহায় আত্নগোপন করেছে। এটা কোন খাদ নয়, একটি গুহা এবং গুহাটি পৰ্বত্র মালার প্রায় তল দেশে তাতে কোন ভুল নেই। কারণ আকাশটার কিঞ্চিৎ দেখা যাচ্ছে মাথার উপরে বহু দূরে। ঐ ফাঁকটার দিকে তাকিয়েই বনহুর বললো এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
বনহুর বললো-রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল সকালে এখান থেকে বের হবার চেষ্টা নিতে হবে।
