বনহুর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো, পুলিশ তাকে ফলো করছে। এবং তাকে এই মুহূর্তে গ্রেপ্তার করবে।
নাসিমা তখন প্লেনের জানা পথে বন্দরের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলো। ফাংহার যাত্রীরা নেমে পড়ছিলো প্লেন থেকে! নাসিমার বড় ইচ্ছা হচ্ছিলো একবার ফাংহা বন্দরে সে অবতরণ করে।
কিন্তু সে কিছু বুঝার পূর্বেই কিছু সংখ্যক পুলিশ প্লেনখানাকে ঘেরাও করে ফেলে, কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ প্লেনে উঠে বনহুর আর নাসিমা খানকে ঘিরে দাঁড়ায়।
বনহুর এবং নাসিমা বুঝতে পারে।
নাসিমার মুখমণ্ডল বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠে।
বনহুর একবার তাকিয়ে দেখে নেয়, পুলিশ বাহিনীও তাদের হাতের আগ্নেয় অস্ত্রগুলোর দিকে।
ফাংহা পুলিশ সুপার স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন। তিনি সবার আগে বনহুরের বুক লক্ষ্য করে রিভলভার উঁচু করে ধরে।
বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকায়; ফাংহা পুলিশ সুপারের মুখের দিকে।
পুলিশ সুপার তার অস্ত্র ঠিক রেখে বলে-আপনারা দু’জন বন্দী হয়েছেন। খবরদার আসন ত্যাগ করতে চেষ্টা করবেন না।
বনহুর আসনে বসেই বলে-কি কারণে আপনারা আমাদের বন্দী করলেন?
পুলিশ সুপার কঠিন কণ্ঠে বললেন-পুলিশ অফিসে পৌঁছে সব শুনতে পারবেন।
বনহুর একবার নাসিমার মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। ভীষণ ঘাবড়ে গেছে নাসিমা, মুখ চোখে একটা ভীতিভাব ফুটে উঠেছে তার। বনহুর কোন কথা না বলে চুপ করে বসে রইলেন।
ফাংহা পুলিশ বাহিনী, বনহুর আর নাসিমাকে গ্রেপ্তার করে ফেললো। প্লেন থেকে নামিয়ে নেওয়া হলো তাদেরকে। পুলিশ ভ্যান একটি নয়, সাত খানা পুলিশ ভ্যান অপেক্ষা করছিলো। মাঝের পুলিশ ভ্যানে বনহুর আর নাসিমাকে তুলে নিলো ওরা।
বনহুর হঠাৎ এ বিপদে মোটেই ঘাবড়ে গেলো না, সে জানতো এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে।
নাসিমা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কতকটা আশ্বস্ত হয়। এ মুখে সে কোন রকম ভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করে না।
পুলিশ ভ্যানগুলো ফাংহা বিমান বন্দর ত্যাগ করে বেরিয়ে এলো বাইরের রাজপথে। উঁচুনিচু আঁকা বাঁকা পথ। কারণ ফাংহা শহরটা প্রায় পাহাড়িয়া জায়গা। মাঝে মাঝে পথের দুপাশে বিরাট খাদ।
পুলিশ ভ্যানগুলো অতি সাবধানতার সঙ্গে এগুচ্ছিলো; বনহুর তাকিয়ে ছিলো ভ্যানের বাইরে কিন্তু মন ছিলো তার গভীর চিন্তায় মগ্ন নিজের জন্য তার কোন চিন্তা নেই কারণ সে যে-কোন উপায়ে উদ্ধার পেতে পারে। ভাবনা যত নাসিমাকে নিয়ে।
যেমন করে হোক নাসিমাকে তার রক্ষা করতেই হবে।
বনহুর আনমনে তাকিয়ে আছে ভ্যানের বাইরে।
নাসিমা তাকিয়ে দেখছে ও মুখে নেই কোন ভাবান্তর, নেই কোন দুঃশ্চিন্তার ছাপ।
ভ্যান সাতখানার মাঝের খানায় বনহুর আর নাসিমাকে ওরা বন্দী অবস্থায় তুলে নিয়েছে। যদিও বনহুর এবং নাসিমার হাতে কোন হাত কড়া লাগায় নি।
নাসিমা ফাংহ শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। এতো বিপদেও ভালই লাগছিলো তার ফাংহার সৌন্দর্য। শুষ্ক মরুভূমির মধ্যে উচ্চপর্বতমালা। তারই গা বেয়ে আঁকা বাঁকা প্রশস্ত পথগুলো সরিসৃপের মত চলে গেছে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে।
ফাংহা বিমান বন্দটা ঠিক পর্বতমালার দক্ষিণাংশে।
যেখানে আশে পাশে শুধু বিস্তৃত প্রান্তর। বিমান অবতরণে যেন কোন অসুবিধা না হয়, সে জন্য অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে বন্দরটি তৈয়ারি করা হয়েছে।
বনহুর আর নাসিমাকে নিয়ে পুলিশ ভ্যানগুলো বিমান বন্দরে ছেড়ে বহু দূরে এগিয়ে এসেছে। এখন যে পথ বেয়ে গাড়িগুলো এগুচ্ছিল সে পথ বড় দুর্গম বড় ভয়ঙ্কর।
একপাশে সুউচ্চ পর্বতমালা, অপর পাশে বিরাট খাদ।
বনহুর ভাবছে, কি ভাবছে সেই জানে।
দু’হাত দু’পা তার মুক্ত।
কিন্তু দু’পাশে দু’জন রাইফেলধারী পাহারাদার। পিছনে এবং সম্মুখে মিলে চারজন রাইফেল ধারী তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বসে আছে।
বনহুর আর নাসিমার ভ্যানের আগে এবং পিছনে তিনটে করে পুলিশ ভ্যান।
গাড়িগুলো ঠিক লাইন করে এগিয়ে যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ উঁচুনিচু পথে হোঁচট খেয়ে খেয়ে গাড়িগুলো এগুলো। হঠাৎ এক সময় সম্মুখের গাড়িখানার একটি চাকা ভীষণ শব্দ করে থেমে গেলো।
সঙ্গে সঙ্গে গাড়িখানা হুমড়ি খেয়ে থেমে গেলো।
পিছনের গাড়িগুলোও থামতে বাধ্য হলো।
বনহুর সেই মুহূর্তটিকে অবহেলা করলো না, পাশের পুলিশ অফিসারটির চোয়ালে বজ্র এক মুষ্টিঘাত লাগিয়ে তার হাত থেকে এক ঝটকায় রাইফেল কেড়ে নিয়ে পিছন বাট দিয়ে এক এক জনকে আঘাত করে চললো।
এতো দ্রুত কাজ করলো বনহুর যে, অন্যান্য গাড়ির পুলিশ বাহিনী কিছু যেন বুঝে উঠতে পারলো না। সম্মুখে গাড়িখানার হঠাৎ কি হলো, গাড়িগুলো আচমকা থামলো কেন এটাই তারা ভাবছিলো। ঠিক ঐ সময় বনহুর সুযোগ নিলো।
বনহুর যখন ক্ষিপ্রগতিতে পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে চললো, তখন অন্যান্য গাড়ি থেকে পুলিশ গুলি ছুঁড়তে পারছে না। কারণ গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে পুলিশ অফিসারদের দেহে বিদ্ধ হতে পারে।
যে জায়গায় গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে জায়গা অতি সংকীর্ণ অপ্রশস্ত। পর্বতের গা বেয়ে সরু পথ। কাজেই অন্যান্য গাড়ি থেকে সবাই এক সঙ্গে নেমে আসবে তারও কোন উপায় ছিলো না।
বনহুর তার গাড়ির পুলিশ অফিসার এবং পুলিশদের অল্পক্ষণেই কাহিল করে ফেললো। নিহতও হলো কয়েকজন।
