নাসিমা তখন ওপাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো, চোখ দুটো তার ছলছল করে উঠলো।
শুনতে পেলো পুনরায় বনহুরের কন্ঠ-আর শোন, নাসিমা যাবার সময় ওর সঙ্গে কিছু অর্থ নিয়ে যাবে, কারণ ওর বাবা এখন সম্পূর্ণ অসহায় বেকার অবস্থা। ওদের যেন বাংলাদেশে কোনো কষ্ট না হয়, তার ব্যবস্থা করে দিয়ে আসবে।
আচ্ছা সর্দার, আপনার নির্দেশমতই কাজ হবে। কথাটা বললো রহমান।
এবার বনহুর কাওসারকে লক্ষ্য করে বললো-তুমি ইরানের দু’খানা টিকটি সগ্রহ করবে। পরশুর প্লেনেই যেন রহমান নাসিমাসহ রওনা দিতে পারে। আর রামসিং, তুমি দুখানা গাড়ি প্রস্তুত রাখবে, আজ রাতে সাগাই বন্দীশিবির থেকে সব বন্দীকে উদ্ধার করবো।
হারুন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো, বনহুর এবার তাকে লক্ষ্য করে বললো-তুমি বাঘাকে নিয়ে এখানেই থাকবে, কারণ গোপন সুড়ঙ্গ কুঠরি থেকে সব সম্পদ আজ এখানে এসে পড়বে। এই সম্পদ আমি এক সপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তানের সমস্ত অসহায় দীন-দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করে দেবো।
অদূরে বাঘা বসে ছিলো।
বনহুর উঠে গিয়ে বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-বাঘা, তুই এখানে থাকবি। দেখিস, কেউ যেন আসতে না পারে।
বাঘা লেজ নেড়ে সম্মতি জানালো। বারবার সে তাকাতে লাগলো বনহুরের মুখের দিকে। বনহুর ওকে আদর করে উঠে পড়লো।
ততক্ষণে রহমান ও অন্যান্য সকলে বেরিয়ে গেছে সেই কক্ষ থেকে বনহুর এসে দাঁড়ায় ওপাশের ভাঙ্গা জানালাটার পাশে। ঐ জানালা দিয়ে তাকায় সে সীমাহীন আকাশের দিকে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেছে কান্দাই এর কথা, তার মা কতদিন তাকে দেখেনি। হয়তো তিনি কত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, না জানি কত কাদাকাটা করছেন। মনিরা, নূর, এরা কেমন আছে কে জানে। নুরী কেমন আছে, জাভেদ হয়তো এতোদিনে বেশবড় হয়ে গেছে। তাকে হয়তো চিনতেই পারবে না। ধীরে ধীরে মনের পর্দায় ভেসে উঠলো অগণিত অসহায় কান্দাইবাসীদের মুখ। তারা কতোদিন বনহুরের সাহায্য থেকে বঞ্চিত আছে। কে জানে, তারা কেমন আছে সবাই….
বনহুরের চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নাসিমা এসে দাঁড়ায় তার পাশে।
বনহুর ফিরে তাকায়, ওর মুখে মুখ পড়তেই দেখতে পায়, নাসিমার রক্তাভ গণ্ড আরও রক্তাভ হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো নত করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
বনহুর বললো-মিস নাসিমা!
নাসিমা চোখ তুলে তাকালো।
বনহুর দেখলো নাসিমার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
বললো বনহুর-আপনি কেঁদেছেন?
নাসিমা নীরব।
বনহুর ওর মুখখানা উঁচু করে ধরলো-মিস নাসিমা?
বলুন?
আপনি কেন কেঁদেছেন বলুন তো?
আমি সর্বহারা, সে কথাটা আজ বেশি করে মনে পড়ছে-তাই।
শুধু আপনি নন, বাংলাদেশের শত শত মা-বোন আজ সর্বহারা, নিঃস্ব, এমন কি তাদের পরম সম্পদ ইজ্জতটাও তারা হারিয়েছে। মিস নাসিমা, আপনার বাবা আছেন। আপনি নিজে এখনও পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক আছেন, এর চেয়ে ভাগ্যবতী নারী কে আছে, বিশেষ করে বাঙ্গালী হয়ে পাকিস্তানে? তবে হাঁ, এখনও পাকিস্তানের বুকে কিছু কিছু বাঙ্গালী আছেন, যাদের প্রতি তেমন কোনো আচরণ করা হয়নি। কিন্তু তারা নানা অসুবিধায় আছেন, এ কথা সত্য। একটু থেমে। বললো বনহুর-মিস নাসিমা, আপনার জন্য সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে….
নাসিমা কোনো কথা বললো না, বেরিয়ে গেলো সে মাথা নিচু করে।
বনহুর মৃদু হাসলো।
একটু পরেই দেখলো নাসিমা আবার ফিরে এলো। তার চোখে মুখে প্রফুল্ল ভাব। বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো-বেশ আমি যাবো কিন্তু আপনাকে যেতে হবে আমার সঙ্গে, তবেই যাবো। বলুন, কথা দিন যাবেন আমার সঙ্গে?
আমি গেলে যদি খুশি হন তাহলে বেশ তাই হবে।
পরদিনই কাওসার এসে হাজির হলো বনহুর বললো-প্লেনের টিকিট পেয়েছো?
হাঁ সর্দার! পকেট থেকে দুখানা টিকিট বের করে বললো-রহমানের কাছে দেবো?
আমাকেই দাও, আমিই ওকে পৌঁছে দিয়ে আসবো।
*
নাসিমা আর বনহুর পাশাপাশি আসনে বসে আছে। বনহুর একটা পত্রিকা পড়ছিলো।
প্লেনখানা তখন লাহোরের আকাশ অতিক্রম করে চলেছে।
নাসিমা পাশের শাশীপথে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। খণ্ড খণ্ড মেঘগুলো তাদের পাশ কেটে চলে যাচ্ছে। সাদা সাদা মেঘের উপর সূর্যের আলোকরশ্মি বড় সুন্দর লাগছিলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলো নাসিমা, ঠিক ঐ সময় বনহুর পত্রিকাখানা রেখে নাসিমার দিকে ফিরে তাকায়, একটু হেসে বলে- কি দেখছেন?
নাসিমা বলে উঠে-দেখুন কি সুন্দর দৃশ্য!
হাঁ, বড় সুন্দর।
নাসিমা আর বনহুর যখন কথাবার্তা চলছিলো তখন পিছন আসন থেকে দু’জন লোক লক্ষ্য করছিলো তাদের দুজনকে।
এরা দুজনই পাকিস্তানী গোয়েন্দা বিভাগের লোক। বনহুর আর নাসিমাকে অনুসরণ করেই এই দু’ গোয়েন্দা এই প্লেনে উঠেছে। ওরা ফাংহা বিমানবন্দরে পুলিশ মহলে ওয়্যারলেসে সংবাদ পাঠিয়ে দিয়েছে দু’জন বাঙ্গালী পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের ফাংহা বিমান বন্দরে গ্রেপ্তার করা হবে।
বনহুর আর নাসিমা নিশ্চিন্ত মনে বসে আছে।
প্লেন একসময় ফাংহা বিমান বন্দরের আকাশে পৌঁছে গেলো। ফাংহা বন্দরে ত্রিশ মিনিট প্লেন অপেক্ষা করার পর আবার আকাশে উড়বে।
বনহুর বললো-মিস নাসিমা, ফাংহা বিমান বন্দরটা বড় সুন্দর।
হাঁ, আমিও বাবার মুখে শুনেছিলাম, এমন ভাবে দেখার সৌভাগ্য হবে জানতাম না।
অল্পক্ষণেই ফাংহা বিমান বন্দরে প্লেখানা অবতরণ করলো।
