হীরার মুখ বিষণ্ণ হলো, সে বললো-সব আমার বাবার কীর্তি।
বনহুর বললো–আর একদিন বিলম্ব হলে এদের সকলের অবস্থা ঐ লোকটার মত হতো। বনহুর নিজে রহমান এবং রামসিং এর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
রহমান বললো সর্দার, আপনি বেঁচে আছেন এটা আমরা ভাবতে পারিনি। আমরা যখন বন্দী হলাম তখন দেখেছি আপনি সেই ধূমপূর্ণ কক্ষটির মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছেন……
রামসিং ক্ষুধা-পিপাসায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছিলো, তবু সর্দারকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠেছিলো, বললো-সর্দার….. সর্দার……।
রামসিং, তোমার বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছে?
না সর্দার, আপনাকে পেয়ে আমার সব কষ্ট ঘুচে গেছে। আপনি বেঁচে আছেন তাই বড় আনন্দ হচ্ছে,..
হীরা অবাক হয়ে শুনছিলো ওদের কথাবার্তা। এবার বললো সে-বুঝেছি, তোমরা একসঙ্গে এসেছিলে এবং একসঙ্গে ধরা পড়েছে। আরও জানি কেন তোমরা এসেছিলে?
এবার বনহুর ফিরে তাকালো হীরার মুখে-সত্যি আপনি জানেন আমরা কেন এসেছিলাম?
জানি, শাম্মীর কাছেই শুনেছিলাম পাকিস্তানে কেন তুমি এসেছো, কি তোমার উদ্দেশ্য।
তাহলে আমার উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে?
হাঁ হবে। এই নাও চাবি, সব বন্দীকে তুমি মুক্ত করে নিয়ে যাও। আমার হীরাঝিল কলঙ্ক থেকে মুক্ত থোক।
বনহুর হাত বাড়ায় হীরার দিকে।
ঠিক ঐ মুহূর্তে এককানা ছোরা এসে বিদ্ধ হয় হীরার বুকের ঠিক মাঝখানে।
একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে হীরা।
বনহুর ওকে ধরে ফেলে।
হীরার বুকের রক্তে বনহুরের হাত দুখানা লালে লাল হয়ে উঠে। তাকায় বনহুর সম্মুখের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়কণ্ঠে বলে উঠে-শামস হুসাইন তুমি মরোনি?
না! কথাটা জড়িতভাবে উচ্চারণ করলো শামস হুসাইন। বনহুর দেখলো শামস হুসাইনের দু’ চিবুক বেয়ে তখনও তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, বুকের কাছে জামাটা রক্তে লালে লাল হয়ে গেছে। মাতালের মত টলছে শামস হুসাইন।
বনহুর বুঝতে পারলো শামস হুসাইন তখন মরেনি। সংজ্ঞা হারিয়ে ছিলো মাত্র। ছোরাখানা শামস হুসাইনই হীরাকে লক্ষ্য করে মেরেছে। বনহুর বিলম্ব না করে হীরার বুক থেকে ছোরাখানা তুলে নেয় আলগোছে।
হীরা যন্ত্রণায় বুক চেপে ধরে।
বনহুর হীরাকে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
আমি দৃষ্টি নিয়ে তাকায় শামস হুসাইনের মুখের দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে-তখন মরলে বেঁচে যেতিস… এখন আবার মর তবে… বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরে বনহুর শামস হুসাইনের গলাটা, তারপর সজোরে ছোরাখানা বসিয়ে দেয় ওর বুকে।
শামস হুসাইনের মুখ থেকে এতো বেশি রক্তপাত হয়েছিলো যার জন্য ওর দেহে কোনো শক্তি ছিলো না। বনহুর যখন ওর গলাটা চেপে ধরলো তখন দেহটা ওর মাতালের মত দুলছিলো। ছোরাবিদ্ধ শামস হুসাইন লুটিয়ে পড়লো ভূতলে। একটা তীব্র গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরিয়ে এলো শামস হুসাইনের মুখ থেকে।
বনহুর আপন মনেই বলে উঠলো-এবার আর দাঁড়াতে পারবি না শয়তান! ছুটে গেলো বনহুর হীরার পাশে, যত্ন সহকারে ওর মাথাটা তুলে নিলো কোলের উপর। ডাকলো–মিস হীরা….
ধীরে ধীরে চোখ মেললো হীরা, জড়িত কণ্ঠে বললো- শামস হুসাইন…. আমাকে….. বাঁচতে…. দিলো….না….আমার হীরা… ঝিল…..।
বলুন? বলুন মিস হীরা? বনহুর ব্যাকুল কণ্ঠে শুনতে চাইলো হীরার শেষ কথাগুলো।
রহমান, রামসিং এরা বিস্ময় বিমূঢ়ভাবে তাকিয়ে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, সবাই হতবুদ্ধি হয়ে গেছে যেন।
হীরার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে, তবু সে চেষ্টা করছে চোখ দুটোকে মেলে রাখতে। বললো আবার সে…..হীরা…. ঝিলের…..বন্দী……দের…..তুমি মুক্ত করে……দিও….
দেবো। দেবো হীরা…. বলো, বলল হীরা আর কি বলতে চাও?
বনহুর আপন মনেই হীরাকে তুমি বলে সম্বোধন করে বসলো।
হীরা হাত তুলে একদিকে দেখিয়ে বললো…ওই….ওই দিকে….গোপন….দরজা আছে…… ….দিকে….যা….।
কথা শেষ করতে পারলো না হীরা, মাথাটা ওর একপাশে কাৎ হয়ে পড়লো।
বনহুরের মুখমণ্ডল বেদনায় করুণ হয়ে উঠলো, বললো- রহমান, এই মেয়েটি আমাকে রক্ষা করেছিলো যার জন্য আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারলাম। কিন্তু আফসোস, ওকে রক্ষা করতে পারলাম না….
একটু থেমে নিজেকে সংযত করে নিলো-তারপর হীরার মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো-বললো, বনহুর-হীরা আমাকে পথের সন্ধান দিয়ে গেলো। ঐদিকে কোনো গোপন দরজা আছে, সেই দরজাপথে বন্দীদের উদ্ধার করতে হবে।
.
হীরাঝিলের সব বন্দী উদ্ধার পেয়েছে। পাকিস্তানের অন্যান্য বন্দীশালায় এখনও কিছু বাঙ্গালী আটক আছে বটে, কিন্তু তাদেরও আমি দু’দিনে মুক্ত করে নেবো। এখন বাকি নাসিমাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া। কথাগুলো বলে থামলো বনহুর।
রহমান, রামসিং, কাওসার, হারুন এরা সবাই মনোযোগ সহকারে শুনছিলো তাদের সর্দারের কথাগুলো। রহমান বললো এবার-সর্দার, প্রায় বছর হয়ে এলো আমরা কান্দাই ছেড়ে এসেছি, মন আমাদের অস্থির হয়ে গেছে।
রামসিং বলে উঠলোহ সর্দার, এবার আমরা আস্তানায় ফিরে যেতে চাই।
বনহুর একটু হেসে বললো-শুধু কি তোমাদেরই মন দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়েছে? আমার মনে কি কিছু হচ্ছে না? আমারও মন আর এদেশে টিকছে না, রহমান?
বলুন সর্দার?
আগামী সপ্তাহে কান্দাই অভিমুখে রওনা দেবো ভেবে নিয়েছি, তার পূর্বে নাসিমাকে বাংলাদেশে তার বাবার কাছে পৌঁছে দিয়ে এসো।
