বনহুরের মুখে একটা আনন্দের আভাস ফুটে উঠলো। দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তার চোখ দুটো। সে খুশিতে হীরার দক্ষিণ হাতখানা চেপে ধরলো-মিস হীরা, আপনি হীরাঝিলের সব কলঙ্ক মুছে ফেলতে চান? সত্যি, সত্যি বলছেন……
হাঁ। এসো আমার সঙ্গে, আমি আজ তোমাকে সব দেখাবো, হীরাঝিলের সব রহস্য আজ প্রকাশ করে দেবো, তারপর……
বনহুর বললো-চলুন মিস হীরা।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো।
হীরা এগুলো আগে আগে।
একটা কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালো হীরা।
তার পিছনে বনহুর।
হীরা তার জামার ভিতর থেকে বের করলো একটি চাবি।
অবাক হয়ে দেখলো বনহুর চাবিটা সম্পূর্ণ সোনার তৈরি।
হীরা চাবি দিয়ে তালাটা খুলে ফেললো।
সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেলো।
বনহুর দেখলো কক্ষের ভিতরে আরও একটি কক্ষ। সে কক্ষটাও তালাবদ্ধ।
হীরা এবার দ্বিতীয় একটি চাবি বের করলো। এ চাবিটাও সোনার তৈরি, সেই চাবি দিয়ে খুলে ফেললো দ্বিতীয় কক্ষের তালাটা।
দরজা খুলে যেতেই একটা লিফট নজরে পড়লো।
হীরা লিফটে চেপে দাঁড়িয়ে বনহুরকে সেই লিফটে চাপার জন্য ইংগিত করলো।
বনহুর হীরার নির্দেশ পালন করলো।
লিফটের বোতম টিপতেই লিফট নিচে নেমে চললো। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, এমন একটা কক্ষে এসে লিফট থামলো, যে কক্ষটা সম্পূর্ণ লৌহ কারাগার ছাড়া কিছু না।
বনহুর আর হীরা লিফট থেকে নেমে দাঁড়ালো।
হীরা একটি সুইচ টিপে আলো জ্বালালো।
সঙ্গে সঙ্গে যে দৃশ্য বনহুরের নজরে পড়লো তা অবর্ণনীয়। এখানে সব মহিলাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। সবাই প্রায় অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় আছে। প্রায় সবাই যুবতী-ষোল থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে সবার বয়স হবে।
বনহুর লজ্জায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। চোখের সামনে মা-বোনদের এ অবস্থা সে সহ্য করতে পারলো না।
হীরা বুঝতে পারলো বনহুরের মনোভাব, বললো-এরা সবাই আমার বাবা এবং শয়তান মিঃ প্রিন্সের শিকার।
বনহুর বলে উঠলো-আমি জানতাম হীরাঝিলের অভ্যন্তরে এমনি নারকীয় দৃশ্যের অবতারণা অহরহ ঘটছে।
হীরা বললো-চলে, এরপর আরও দেখবে চলো।
হীরা এরপর বনহুর সহ যে কক্ষে এসে দাঁড়ালো সে কক্ষে অগণিত নারী-পুরুষকে দেয়ালে লৌহশিকলে আটকে রাখা হয়েছে। প্রত্যেকের দেহ কঙ্কালসার।
বনহুর হীরাকে জিজ্ঞেস করলো-এদের অপরাধ?
হীরা বললো-এরা বাবার সম্বন্ধে মন্দ উক্তি উচ্চারণ করেছিলো এবং বাবার আদেশ পালনে অবাধ্য হয়েছিলো।
হু। বনহুর গম্ভীরভাবে বললো।
হীরা বললো-চলো।
বনহুর হীরাকে অনুসরণ করলো।
এবার যে কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালো হীরা, সে কক্ষে শুধু ছোট শিশুদের আটক করে রাখা হয়েছে। সবার বয়স অনুমান পাঁচ থেকে দশ বছরের বেশি নয়। ফুটফুটে সুন্দর চেহারা, চোখেমুখে আভিজাত্যের ছাপ বিদ্যমান।
বনহুর বললো–এদের এখানে পৃথক রাখা হয়েছে কেন?
বিদেশে চালান দেবার জন্য এদের এখানে বাছাই করে রাখা হয়েছে। এরা সবাই বাঙ্গালীদের ছেলেমেয়ে।
হাঁ, আমি এদের চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছি এরা বাঙ্গালী।
এসো, আরও আছে।
চলুন।
হীরা আর বনহুর এগিয়ে যাচ্ছে।
হীরাঝিলকে বাইরে থেকে সুন্দর একটি স্বপ্নপুরী মনে হয়, তার ভিতরটা এমন জঘন্য, কেউ কল্পনা করতে পারবে না।
এবার হীরা যে কক্ষে এসে দাঁড়ালো সে কক্ষে দৃষ্টি পড়তেই বনহুর চমকে উঠলো, অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলো-রহমান!
অবাক চোখে দেখলো বনহুর, কয়েকজন বন্দীকে মেঝেতে হাত-পা বেঁধে বুকের উপর পাথরচাপ দিয়ে চীৎ করে ফেলে রাখা হয়েছে। সামনের লোকটি রহমান। পাশে দৃষ্টি ফেলতেই দেখলো রামসিং-এর অবস্থাও তাই। আজ দু’দিন এভাবে পাথরচাপা দিয়ে ওদের রাখা হয়েছে।
এ কক্ষে যাদের এভাবে পাথরচাপা দিয়ে রাখা রয়েছে তাদের অবস্থা একেবারে কাহিল, কারো সংজ্ঞা নেই বলে মনে হচ্ছে।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে এগিয়ে এলো, তারপর ঝুঁকে পড়ে ডাকলো-রহমান! রহমান……
ধীরে ধীরে চোখ মেললো রহমান, বনহুরকে দেখে তার চোখ দুটো যেন দীপ্ত হয়ে উঠলো, ক্ষীণ ণ্ঠে বললো-সর্দার…পা…নি…
হীরা অবাক দৃষ্টি নিয়ে দেখছিলো, এবার বলে উঠলো-একে তুমি চেনো?
হাঁ, আমার বন্ধুলোক এরা।
বনহুর এবার রহমানের বুক থেকে পাথরখানা সরিয়ে ফেললো। তারপর রামসিং-এর বুক থেকে পাথর সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
পাথরগুলো অত্যন্ত ভারী থাকায় বনহুরের খুব কষ্ট হলো, সমস্ত দেহ ঘামে ভিজে গেলো।
বনহুর যখন পাথরগুলো ওদের বুক থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলো তখন হীরার দু’চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে। এ পাথরগুলো কমপক্ষে চারজন বলিষ্ঠ লোক মিলে ওদের বুকের উপর রেখেছে, সেই পাথর বনহুর একা নামিয়ে নিলো!
বনহুর শুধু রহমান ও রামসিংকেই মুক্ত করলো না, সে প্রত্যেকটা বন্দীর বুক থেকে পাথর সরিয়ে ফেললো।
সবাইকে মুক্ত করে বনহুর বসে পড়লো ধপ করে একটা পাথরের উপর। মাথা বেয়ে ঘাম ঝরছে, বনহুর হাতের পিঠে ঘাম মুছে ফেললো।
হীরা নিজের রুমাল দিয়ে বনহুরকে বাতাস করতে লাগলো।
রহমান, রামসিং তখন ধীরে ধীরে উঠে বসছে।
অন্যান্য বন্দীর বুক হাল্কা হওয়ায় তারাও প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিচ্ছে। কেউ বা উঠে বসেছে, কেউ বা পাশ ফিরে শুয়ে বুকে হাত বুলাচ্ছে।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো ওপাশে একজন একটুও নড়ছে না। উঠে এগিয়ে গেলো, হাত দিয়ে গায়ে ঝাঁকুনি দিতেই বুঝতে পারলো তার দেহে প্রাণ নেই।
হীরাকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর- শেষ হয়ে গেছে।
