বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে অস্ফুট শব্দ করে উঠলো-মিস শাম্মীকে আপনি খুন করেছিলেন।
হাঁ, আমি নিজের হাতে তাকে হত্যা করি। কিন্তু মিঃ প্রিন্স তখন আমার পাশে ছিলো। শাম্মীকে তুমি যে আংটি উপহার দিয়েছিলে, সেই আংটিটা মিঃ প্রিন্সই আত্নসাৎ করে।
মিস শাম্মীর হত্যা-ব্যাপারে মিঃ প্রিন্সের কি স্বার্থ ছিলো? বরং তাকে হত্যা করে হোটেল গুলবাগ সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়ে।
স্বার্থ তার কিছু ছিলো না। তবে আমাকে পাওয়ার আশায় সে আমাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছিলো। কিন্তু……..
কিন্তু সে আপনাকে পায়নি, এইতো?
হাঁ, আমি তাকে প্রলোভন দেখিয়ে এ ব্যাপারে আকষ্ট করেছিলাম।
মিঃ প্রিন্সের সঙ্গে আপনার কি করে পরিচয় ঘটেছিলো মিস হীরা?
সব বলবো লিয়ন, সব বলবো। আগে আমি যা বলছি বলে নিই।
আচ্ছা বলুন?
শাম্মীকে হত্যা করেও আমি শান্তি পেলাম না। কারণ ছবির আসল মানুষটির সন্ধান পেলাম না আমি। হাঁ, আমি একটা ভুল করেছিলাম, মিঃ প্রিন্সকে যদি আমার মনের সব কথা খুলে বলতাম বা ছবিখানা তাকে দেখাতাম তাহলে ছবির মানুষটির সন্ধান পেতাম। কারণ আমি পরে জানতে পারি, শাম্মীর কাছে যার ছবি আমি পাই সে ঐ হোটেলেই এগারো তলার পাঁচ নম্বর ক্যাবিনে থাকতো। আমি যখন জানতে পেলাম তখন তুমি সরে গেছে হোটেল গুলবাগ থেকে…..
ও, আপনি তাহলে হোটেল গুলবাগে আমার সন্ধান করেছিলেন?
একবার নয়, কতবার করেছি। শুধু তোমাকে একবার দেখবো বলে কিন্তু সে আশা আমার তখন পূর্ণ হয়নি। আমি লাহোর শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। করাচীতেও এমন কোনো হোটেল নেই যে সেখানে তোমার সন্ধান করনি। হঠাৎ তোমার দেখা পেলাম আচম্বিতে আমারই হীরাঝিলে। আমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি আমি যার সন্ধান করে ফিরছি, সেই আমার পিতার হত্যাকারী। থামলো হীরা।
বনহুর বললো-যদি জানতেন তাহলে নিশ্চয়ই সেই হত্যাকারীকে শাস্তি দেবার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠতেন?
না, কারণ আমার বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিলো না।
বাবার প্রতি কন্যার শ্রদ্ধা না থাকাটা অতি বিস্ময়কর বটে।
না, সবক্ষেত্রে নয়। বাবার আচরণ যদি বাঞ্ছনীয় না হয় তাহলে আমি দুঃখ পাওয়ার চেয়ে খুশি হয়েছি বেশি, একথা অবশ্য তোমাকে পূর্বেও বলেছি। কাজেই তোমার উপর কোনো রাগ বা আক্রোশ নেই। হাঁ, যা বলবো বলে তোমাকে এখানে এনেছি এবার সেই কথা বলি।
তাই বলুন মিস হীরা। বনহুর কথাটা বলে সিগারেটের টিন থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করলো।
আমার বাবা আর মিঃ প্রিন্স বন্ধুলোক ছিলেন। একসঙ্গে এরা কারবার করতেন বহুদিন থেকে। প্রথম প্রথম আমি মনে করতাম, আমার বাবা এবং মিঃ প্রিন্স ভাল ব্যবসাই করেন। কিন্তু একদিন জানতে পারলাম আমার বাবার ব্যবসা সৎ ব্যবসা নয়। মদ ও গাঁজার চোরা কারবার করেন তারা। আরও জানতে পারলাম বাবা মেয়েদের নিয়েও ব্যবসা করেন। মিঃ প্রিন্স তার পার্টনার। মন আমার বিদ্রোহী হয়ে উঠলো, একটা মদ, গাঁজা এবং নারী ব্যবসায়ীর কন্যা আমি। কলেজে পড়তাম, শিক্ষা কিছু পেয়েছি, কাজেই অন্যায়ে আমার মন বিষিয়ে উঠলো। আমার বাবা আমাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। ব্যবসা করে বহু টাকা তিনি উপার্জন করেছিলেন, আমার নামে তাই তিনি এই হীরাঝিল তৈরি করেন।
একটু থামলো হীরা, তারপর আবার সে বলতে শুরু করলো-আমার মা ছিলেন অতি আদর্শবতী মহিলা। বাবা কিভাবে অর্থ উপার্জন করেন তিনি জানতেন না। কিন্তু বাবা আমাকে ফাঁকি দিতে পারেননি, আমি যখন বড় হয়ে সব জানতে পারলাম তখন গোপনে সন্ধান নিতে শুরু করলাম। আমাদের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে হীরাঝিল। লোকের মুখে হীরাঝিলের কাহিনী শুনতাম, বাবা কোনোদিন হীরাঝিল সম্বন্ধে আমার মাকে বা আমাকে কিছু বলতেন না, বরং বাবা আমাদের কাছে হীরাঝিল সম্বন্ধে বেশ সতর্ক থাকতেন। তবে হীরাঝিল যে আমার নামে করেছেন, একথা তিনি সবার কাছে বলতেন। হীরাঝিল সম্বন্ধে অনেক রকম কথা আমার কানে আসতো কিন্তু আসল রহস্য কি জানতাম না। হীরাঝিল সম্বন্ধে অনেক রকম কথাই শুনতাম আমি। তাই একদিন গোপনে হীরাঝিলে পৌঁছলাম। পুরুষের ছদ্মবেশে এলাম হীরাঝিলে। পৌঁছে ভালই লাগলো, বাইরে থেকে কিছু বুঝবার যো নেই। প্রথম নজরে খুশিই হলাম, বাবা আমার নামে হীরাঝিল তৈরি করে আমাকে কত ভালবাসতেন তা প্রমাণ করেছেন। অবশ্য বেশিক্ষণ এ আনন্দ আমার স্থায়ী হয়নি সেদিন। হীরাঝিলের অভ্যন্তরে যে নারকীয় দৃশ্য আমি দেখলাম তা অবর্ণনীয়।
হীরার দু’চোখে যেন আগুন ঝরে পড়লো। হয়তো সে নতুন করে সেদিনের দৃশ্য অনুভব করছে। একটু থেমে আবার শুরু করলো-দেখলাম কিভাবে আমার বাবা মদ ও গাঁজার চোরা ব্যবসা করেছেন। দেখলাম আমার বাবা নিজে কি করে নিরীহ অসহায় বন্দী নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছেন। মন আমার বিদ্রোহী হয়ে উঠলো, আমি আর এক মুহূর্ত হীরঝিলে থাকতে পারলাম না। হীরাঝিলের সৌন্দর্য আমার চোখে বিষময় লাগলো, আমি পালিয়ে গেলাম যেমন গোপনে এসেছিলাম তেমনি গোপনে।
হীরার মুখমণ্ডল রক্তাভ হয়ে উঠেছে, অধর দংশন করে সে, তারপর বলে-এমন পিতার মৃত্যুতে কোন কন্যা খুশি না হবে বলো। তাই আমিও খুশি হয়েছি। এখন আমি চাই হীরাঝিলের সব কলঙ্ক মুছে ফেলতে। হীরঝিল হবে পবিত্র, নিষ্পাপ স্থান…
