না, জানিনা কেন আপনি আমার প্রতি এত মেহেরবান হয়েছেন?
শুধু তোমাকে আমার ভাল লেগেছে বলে।
এই সামান্য ভাল লাগার জন্য আপনি পিতৃহন্তাকে……
হাঁ, আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। বিশ বছর ধরে আমি তোমার প্রতীক্ষা করছিলাম পরদেশী….
বিশ বছর ধরে? বনহুরের দু’চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠে।
হীরা তার আংগুলের ফাঁক থেকে সিগারেটটা অ্যাসট্রের মধ্যে গুঁজে রেখে সোজা হয়ে বসে বলে-হা, হঠাৎ তোমাকে পেলাম পরদেশী। তুমি যে আমার……
মিস হীরা!
সত্যি বলছি, তোমাকে আমি হত্যা করার উদ্দেশ্যেই সেদিন গোপন কুঠরিতে গিয়েছিলাম। তখন আমার মনে ছিলো পিতৃহত্যার প্রতিহিংসার তীব্র জ্বালা। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার সমস্ত হৃদয় যেন অনাবিল এক আনন্দে ভরে গেলো। তোমার সংজ্ঞাহীন মুখখানা আমাকে অভিভূত করে ফেললো। আমি ভুলে গেলাম পিতৃহত্যার প্রতিহিংসা……
বনহুরের ঠোঁটের ফাঁকে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
হীরা তখন বলে চলেছে-শামস হুসাইনকে আমি আদেশ দিলাম তোমাকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। আমি তখন জানতাম না তুমি সরে পড়বে। কারণ একটু পরে গিয়ে দেখি তুমি নেই…..
বনহুর বললো-মিস হীরা, আপনি জানেন না আমি কি উদ্দেশ্য নিয়ে হীরাঝিলে এসেছি। আমি জানি তুমি কেন হীরাঝিলে এসেছে।
না, আপনি জানেন না। জানলে আমাকে কিছুতেই আপনি ক্ষমা করতে পারতেন না।
বিশ্বাস করো আমি জানি। আমার কাছে তুমি নতুন নও পরদেশী।
তার মানে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে হীরা, একটা ব্যথারুণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেললো তার গোটা মুখটাকে।
বনহুর কোনো কথা না বলে হীরার জবাবের প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
হীরা আবার গা এলিয়ে দিলো আরাম কেদারাটার বুকে। দূরদৃষ্টি মেলে তাকালো সে হীরাঝিলের জানালা দিয়ে নীল আকাশের দিকে। একসময় বলে উঠলো-তোমার নাম মিঃ লিয়ন তাও জানি।
এবার বনহুর যেন চমকে উঠলো ভীষণভাবে।
হাসলো হীরা, সে হাসি যেন অতি রহস্যময় বলে মনে হলো বনহুরের কাছে। তবু নীরবে সে অপেক্ষা করতে লাগলো হীরা এরপর কি বলে।
হীরা হাসিভরা মুখেই বললো-তুমি হোটেল গুলবাগের এগারো তলার পাঁচ নম্বর ক্যাবিনে থাকতে তাও জানি।
এবার বনহুর কথা বললো–শুধু তাই নয় মিস হীরা, আপনি আরও জানেন। আমি সেখানে কি উদ্দেশ্যে ছিলাম নিশ্চয়ই.
বনহুরের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো হীরা-হাঁ, তাও জানি।
সত্যি বলছেন?
হা মিঃ লিয়ন।
না, আপনি আমাকে পরদেশী বলেই ডাকবেন।
নিজের নাম গোপন করতে চাইলেও নিজকে গোপন করা যায় না লিয়ন। জানি তুমি খুব অবাক হচ্ছো আমি তোমার সম্বন্ধে এতো জানলাম কি করে?
হাঁ, আমার মনে বিরাট প্রশ্ন জেগেছে।
তুমি অপেক্ষা করো, আমি তোমার মনের দ্বন্দ্ব দূর করবো।
উঠে গেলো হীরা, একটু পরে ফিরে এলো, হাতে তার একটি ফটো রয়েছে। ফটোটা বনহুরের সম্মুখে তুলে ধরে বললো-একে চিনতে পারো?
দু’চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো বনহুরের, অস্ফুট শব্দ করলো সে-শাম্মীর ছবি!
আমি একটিমাত্র জবাব দেবো তাতেই তোমার সব কৌতূহলের সমাপ্তি ঘটবে।
বনহুর অবাক চোখে তাকিয়ে আছে হীরা মুখের দিকে।
হীরা একটু হেসে বললো-আমার বান্ধবী।
শাম্মী আপনার বান্ধবী?
হাঁ। কথাটা বলে আর একটি ফটো বের করে মেলে ধরে বনহুরের সামনে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর বলে উঠে-এ ফটো আপনি কোথায় পেলেন?
আমার বান্ধবীর আছে।
হুঁ, এবার সব বুঝতে পেরেছি।
বনহুর এবার কতটা নিশ্চিন্তভাবে আরাম কেদারায় তেঁশ দিয়ে বসলো।
হীরা পুনরায় একটি সিগারেট টিন থেকে নিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করলো। তারপর কয়েকমুখ ধোয়া ত্যাগ করে বললো-আমার বান্ধবী মিস শাস্মী তোমাকে গভীরভাবে ভালবাসত, যদিও তার জীবনে বহু পুরুষ এসেছে, সে কাউকে ভালবাসতে পারেনি। শুধু তার কর্তব্য পালন করে গেছে, কাউকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেনি। শাম্মীর জীবন ছিলো বড় দুঃখের, বড় কষ্টের। অবশ্য অর্থকষ্ট বা দৈহিক কষ্ট তার ছিলো না, কষ্ট ছিলো তার মনের।
হাঁ, একথা শাম্মী আমাকে বলেছিলো।
জানি সে তার কোনো কথাই তোমার কাছে গোপন করেনি। আজ আমি তোমাকে সব বলবো বলে কথা দিয়েছি তাই আমাকে পুনরায় শাম্মী সম্বন্ধে বলতে হচ্ছে, কারণ শাম্মীর কাছেই আমি পেয়েছিলাম তোমার সন্ধান।
বনহুর অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে হীরার মুখ। মাঝে মাঝে তার মুখোভাব পরিবর্তন হচ্ছিলো।
হীরা বলে চলেছে- ওর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এক উৎসবে। আমার বাবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম সেই উৎসবে। হঠাৎ ওকে আমার খুব ভাল লেগেছিলো, তারপর থেকে সেই ভাল লাগা গভীর ভালবাসায় পরিণত হয়। প্রায়ই আমি শাম্মীর সঙ্গে মিলিত হতাম শাশ্মীর এক আত্নীয়ের বাসায়। সেখানেই শাম্মী আমাকে সব বলেছিলো আর দেখিয়েছিলো তোমার ছবিটা।
থামলো হীরা, হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রের মধ্যে রেখে আবার বলতে শুরু করলো-জানি না ছবিটার মধ্যে কি যাদু ছিলো, আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম। শাম্মী বলেছিলো, এ ছবিটা সে তোমার অজ্ঞাতে কোনো ফটোগ্রাফারের সহায়তায় উঠিয়ে নিয়েছিলো। আমি ঐ ছবিখানা একদিন চুরি করলাম ওর ব্যানিটি ব্যাগ থেকে। আমি যতই গোপনে ছবিটা সরিয়ে ফেলি না কেন, সে বুঝতে পারে আমিই তার ছবিটা নিয়েছি।
আবার থামলো হীরা, মুখমণ্ডলে একটা থমথমে ভাব ফুটে উঠলো। বলে চলেছে। হীরা-এরপর শাম্মী আমাকে বিষদৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। অবশ্য সে আমার কাছে কয়েকবার ছবিটা চেয়েছিলো, আমি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলাম, বলেছিলাম ছবি আমি নেইনি। এই ছবির ব্যাপার নিয়ে আমাদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরে। আমরা উভয়ে উভয়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কিন্তু আমার মনে তখন প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠে। এই ছবির মানুষটাকে খুঁজতে শুরু করি। শাম্মী আমাকে সব কথা বলতে কিন্তু ঐ ছবিটা যার তার ঠিকানা কোনোদিন সে আমাকে বলেনি। বা জানায়নি। অনেক সন্ধান করেও ছবির মানুষটার সন্ধান পেলাম না। তখন গুলবাগের মালিক মিঃ প্রিন্সের সহায়তায় তাকে আমি হত্যা করি।
