অবাক চোখে তাকালো হীরা বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর বললো আবার–তখন আপনার দয়ায় আমার জীবন রক্ষা পেয়েছে মিস হীরা।
অপরিচিতি ব্যক্তির মুখে নিজের নাম শুনে অবাক হলো হীরা, আরও অবাক হলো লোকটা তো তখন সংজ্ঞাহীন ছিলো, সে কি করে জানলো তার আদেশেই ওর দেহ থেকে লৌহশিকল খোলা হয়েছে। হীরা দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে।
বনহুর বললো-আপনার পিতাকে হত্যা করেছি এ জন্য আমি ক্ষমা চাই।
এবার মিস হীরার মুখ গম্ভীর হলো, বললো-আমার বাবার হত্যার জন্য আমি দুঃখিত বটে, কিন্তু……
বলুন থামলেন কেন?
হীরা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো-আমার বাবার মৃত্যুতে আমি যেমন দুঃখিত, তেমনি খুশিও হয়েছি..
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো-আপনি আপনার বাবার মৃত্যুতে খুশি হয়েছেন?
হাঁ।
আপনার বাবার প্রতি তাহলে…
এখানে দাঁড়িয়ে সে সব কথা বলা চলে না। আপনি যদি আমার সব কিছু জানতে চান তা হলে আমি বলতে রাজি আছি। হীরা আংগুল দিয়ে শামস হুসাইনের মৃতদেহটা দেখিয়ে বলে-ঐ শয়তানটাই আমার বাবাকে অমানুষ করে তুলেছিলো। ওকে হত্যা করে আপনি শুধু আমাকেই মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচাননি, বহু মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তাই আমি আপনাকে খুশি করবো……
খুশি! আমাকে আপনি খুশি করবেন?
হাঁ। যা চাইবেন তাই দেবো। চলুন…মিস হীরা এগুলো।
বনহুর হীরাকে অনুসরণ করার সময় একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিলো শামস হুসাইনের বিকৃত মুখটা।
*
হীরা আর বনহুর এগিয়ে চলেছে।
অবাক হয়ে দেখছে বনহুর, এতবড় হীরাঝিল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, শব্দ হীন। সুন্দর ঝকঝকে লম্বা টানা বারান্দা বেয়ে ওরা দুজন এগুচ্ছে।
বনহুর বললো-সবাই গেলো কোথায়?
হীরা থমকে দাঁড়িয়ে বললো-সবাই আছে কিন্তু আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ বাইরে আসবে না।
যাক, তাহলে কিছুক্ষণের জন্য আমি নিশ্চিন্ত?
কিছুক্ষণ নয়, আপনি সর্বক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত। এখন আমিই এই হীরাঝিলের একমাত্র অধিকারী। কারণ আমার বাবার মৃত্যুর পর ঐ শয়তান শামস হুসাইন হীরাঝিলের সবকিছু অধিকার করে বসেছিলো। হীরাঝিলের চাবিকাঠি ছিলো তারই হাতে, তাই হীরাঝিলের সমস্ত কিছু ছিলো তারই আয়ত্তে। এখন চাবিকাঠি আমার হাতে।……চলুন সব বলবো আপনাকে।
বনহুর বললো-তাই চলুন।
মিস হীরার সঙ্গে এগুতে এগুতে ভাবছে বনহুর অনেক কিছু। যা চেয়েছিলো তাই হলো। মিস হীরাকে এখন আয়ত্তে আনতে পারলেই সবকিছু সমাধা হবে। মনে মনে বনহুর খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ জানালো।
একটা ঘরে এসে থামলো হীরা।
বনহুরও হীরার পিছনে পিছনে সেই ঘরে প্রবেশ করলো।
অবাক হলো বনহুর, ঘরখানা সুন্দর করে সাজানো। কিন্তু সাধারণ আসবাবপত্রে নয়, কতকগুলো তৈলচিত্র দিয়ে সাজানো। এক একটি তেলচিত্রের ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে সহসা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না বনহুর।
হীরা গম্ভীর কণ্ঠে বললো-ঐ যে দেখছেন ওটা আমার দাদু। আর ঐ যে দেখছেন ওটা আমার দাদুর ছোট ভাই। ওটা আমার বড় চাচার তৈলচিত্র! এটা আমার ছোট চাচা, আরও এই যে এ তৈলচিত্রটা হলো আমার বাবার……।
হাঁ, আমিই তাকে হত্যা করেছি মিস হীরা।
হীরার মুখমণ্ডলে একটা বিষণ্ণতার ছাপ ফুটে উঠলো। একটু নিশ্চুপ থেকে বললো-বাবার হত্যার কথা মনে হলে ব্যথা পাই সত্য কিন্তু খুশিও লাগে। ও, এততক্ষণ আপনাকে বসতে বলা হয়নি। একটা আরাম কেদারা দেখিয়ে দিয়ে বলে মিস হীরা-বসুন।
বনহুর কোনো দ্বিধা না করে বসে পড়লো। শরীরটা এলিয়ে দিলো সে নরম তুলতুলে আরাম কেদারাটায়। কদিন সে এমন নরম কেদারায় বসেনি।
হীরা পাশের সোফায় বসলো।
উভয়ে কিছুক্ষণ নীরব।
বনহুরের জামাকাপড় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। কপালের পাশে সামান্য কেটে গিয়েছিলো এখনও রক্ত ঝরছে। চুলগুলো এলোমেলো। বনহুর নিজের আংগুল দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিলো। বনহুর পকেট হাতড়ে দেখে নিলো তার পকেটে সিগারেট কেস বা ম্যাচবাক্স আছে কি না!
মিস হীরা বুঝতে পারলো সে পকেট হাতড়ে কিসের অন্বেষণ করছে। উঠে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে বের করলো একটা দামী সিগারেটের টিন এবং একটি দিয়াশলাই।
এগিয়ে ধরলো হীরা সিগারেটের টিন আর দিয়াশলাই-নিন পান করুন। নিজেও সে টিন থেকে একটা সিগারেট তুলে নিলো। হেসে বললো-আমি কিন্তু সিগারেট পান করি।
বনহুর অবাক হলো না, কারণ সে বহু নারীকে সিগারেট পান করতে দেখেছে। এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
হীরা নিজের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা এগিয়ে ধরলো বনহুরের দিকে।
বনহুর ততক্ষণে টিন থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে খুঁজে দিয়েছে। হীরার হাত থেকে নিজের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো বনহুর, একটু হেসে বললো-ধন্যবাদ।
হীরা একমুখ ধূয়া ছুঁড়ে দিয়ে বললো-পরদেশী, এবার আমি তোমাকে সব কথা বলবো।
বনহুর এবার একটু অবাক হলো, একেবারে সোজা তুমি’ বলে সম্বোধন করে বসেছে তাকে হীরা। কুঞ্চিত করে বললো বনহুর-আপনি সব কিছু বলবেন আমি সে রকমই আশা করি।
হীরা বেশ কিছুক্ষণ একমনে সিগারেট পান করে চলে। ললাটে তার গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে।
বনহুর তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য করতে থাকে হীরার মুখোব।
হীরা হঠাৎ হেসে উঠে উজ্জ্বলভাবে, তারপর হাসি বন্ধ করে বলে-পরদেশী, তুমি আমার বাবাকে খুন করেছো তবু তোমাকে আমি ক্ষমা করেছি। তোমাকে নৃশংস হত্যা থেকে রক্ষা করেছি কেন জানো?
