বনহুর মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার হাতের বর্শার আঘাতে একজনকে ধরাশায়ী করলো
যে লোকটা ধরাশায়ী হলো তার হাতের ছোরাখানা ঠিক শামস হুসাইনের পাশে গিয়ে পড়লো। শামস হুসাইন সেই ছোরাখানা নিয়ে পুনরায় আক্রমণ করলো বনহুরকে।
বনহুর চট করে সরে দাঁড়ালো।
হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো আবার শামস হুসাইন। ঠিক ঐ সময় দ্বিতীয় ব্যক্তি ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বনহুরের উপর।
বনহুর খপ খরে ছোরাসহ লোকটার হাতখানা ধরে ফেললো। ভীষণ চাপ দিতেই ওর হাত থেকে ছোরাখানা খসে পড়লো। বনহুর প্রচণ্ড এক লাথি মারলো ওর তলপেটে, সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়লো লোকটা তারই হাত থেকে পড়ে যাওয়া ছোরাখানার উপর।
একটা তীব্র আর্তনাদে সুড়ঙ্গপথটায় প্রতিধ্বনিত হলো। লোকটার বুকে ছোরাখানা আমূল বিদ্ধ হয়েছে।
একটু পূর্বে যে লোকটা বনহুরের বর্শার আঘাতে পড়ে গিয়েছিলো, সে উবু হয়ে ছিলো-এবার যন্ত্রণায় চীং হয়ে মুখখানা বিকৃত করলো, অমনি এক ঝলক ক্ত গড়িয়ে পড়লো মুখ গহ্বর থেকে।
শামস হুসাইন একবার ফিরে তাকালো ছোরাবিদ্ধ অনুচরটির দিকে, তারপর বর্শাবিদ্ধ লোকটার মুখে। সঙ্গীদের অবস্থা দর্শন করে মুখ কালো হয়ে উঠলো শামস হুসাইনের। মুহর্ত বিলম্ব না করে শামস হুসাইন পিছু হটে পালাতে লাগলো।
বনহুর তাকে অনুসরণ করলো।
ছুটতে শুরু করেছে শামস হুসাইন, প্রাণপণে ছুটছে। যেমন করে থোক বাঁচতে হবে। হীরাঝিলের মায়া সে মরলেও ত্যাগ করতে পারবে না।
শামস হুসাইন সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো।
বনহুর আবার এসে দাঁড়ালো সেই কক্ষে যে কক্ষে তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাত-পা-শরীর শিকলে বেঁধে মেঝেতে তক্তার উপর ফেলে রাখা হয়েছিলো।
মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভেবে নিলো বনহুর, ওদিকে একটি দরজা দেখা যাচ্ছে। বনহুর সেই দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। দেখলো একটি লিফট ঘর সেটা।
বনহুর দ্রুত লিফটে চেপে বসলো।
সঙ্গে সঙ্গে একটা অন্ধকারময় কক্ষে এসে থামলো লিফটটা। বনহুর কক্ষমধ্যে নেমে দাঁড়ালো, ঠিক ঐ সময় তার কানে গেলো নারীকণ্ঠ……আমি তোমাকে চাবিকাঠি দেবো না। শয়তান।
শামস হুসাইনের গলা……চাবিকাঠি দেবে না মিস হীরা?
না!
তাহলে তোমাকে খুন করব।
খুন করবে আমাকে?
হাঁ, তুমি যদি চাবিকাঠি না দাও…
বনহুর কান পেতে শুনছিলো কথাগুলো, সে বুঝতে চেষ্টা করছিলো কথাবার্তা কোন দিক থেকে আসছে। অল্পক্ষণেই তার কানে গেলো আবার সেই কণ্ঠ….হীরা, তুমি ঐ শয়তানটাকে মুক্ত করে ভাল করোনি! আমি জানতাম সে সংজ্ঞালাভ করে ভীষণ আকার ধারণ করবে……
হীরার চঞ্চল কণ্ঠ……সে জ্ঞান লাভ করেছে সে কথা এখনও বলেনি কেন?
আর একটু অপেক্ষা করো, সমস্ত হীরাঝিল সে দখল করে নেবে। এই মুহূর্তে চাবিকাঠি দাও, আমি সরে পড়ি তাহলে হীরাঝিলের চাবিকাঠি সে পাবে না। দাও, চাবিকাঠি দাও…
না, দেবো না।
তাহলে মরবে।
মরতে ভয় করি না শয়তান…
তাই নাকি? তবে প্রস্তুত হয়ে নাও মিস হীরা…দাঁতে দাঁত পিষে বললো শামস হুসাইন।
ঠিক সেই সময় বনহুর গিয়ে দাঁড়ালো তার পিছনে। সে দেখতে পেলো শামস হুসাইন মিস হীরার গলাটা দুহাতে টিপে ধরেছে।
মিস হীরার চোখ দুটো গোলাকার হয়ে উঠেছে। জিভটা বেরিয়ে এসেছে মুখের ভিতর থেকে-আর এক মিনিট, তাহলেই মিস হীরার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বনহুর ঝাঁপিয়ে পড়লো পিছন থেকে শামস হুসাইনের উপর, পিছনের জামাসহ ঘাড়খানা বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিলো বনহুর তার চোয়ালে।
মাত্র এক দণ্ড, হাতখানা ওর শিথিল হয়ে এলো। মিস হীরাকে মুক্ত করে দিয়ে ফিরে দাঁড়ালো শামস হুসাইন, আক্রমণ করলো সে বনহুরকে।
বনহুর ওকে সুযোগ না দিয়ে পুনরায় ঘুষির পর ঘুষি লাগিয়ে চললো। তাল সামলাতে পারলো না শামস হুসাইন, পালাতে গেলে সে আবার, কিন্তু বনহুর ওকে পালাবার সুযোগ দিলো না, বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় চেপে ধরলো ওর কারখানা।
তখন শামস হুসাইনের নাকমুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
বনহুর যখন শামস হুসাইনকে কাহিল করে ফেলেছে তখন মিস হীরা বিস্ময় নিয়ে দেখছে ওকে। কে এই শক্তিশালী বীর পুরুষ যে শয়তান শামস হুসাইনকে কাহিল করতে পারে।
বনহুরের তখন হিতাহিত জ্ঞান ছিলো না, সে ঘুষির পর ঘুষি চালিয়ে চলেছে। শামস হুসাইন এক মুহূর্তের জন্য টাল সামলে উঠতে পারলো না, উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে আবার হুমড়ি খেয়ে পড়লো। বনহুর দক্ষিণ পা দিয়ে শামস হুসাইনের গলা চেপে ধরলো, ভীষণ জোরে চাপ দিলো
শামস হুসাইনের মুখ গহ্বর থেকে গোটা জিভটা বেরিয়ে এল, চোখ দুটো ঠিকরে বের হচ্ছে যেন। বনহুর একবার তাকালো হীরার মুখের দিকে, বললো-বলুন একে শেষ করে দেবো না প্রাণে বাঁচিয়ে রাখবো।
এবার হীরা কথা বললো–ওকে শেষ করে দিন।
বনহুর আরও জোরে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘড় ঘড় আওয়াজ বের হলো শামস হুসাইনের কণ্ঠ থেকে, তারপর সব চুপ হয়ে গেলো।
বনহুর শামস হুসাইনের গলা থেকে পা সরিয়ে নিলো।
শামস হুসাইনের বলিষ্ঠ বিশাল দেহটা চীৎ হয়ে পড়ে রইলো। ওর মুখগহ্বর থেকে ফেনাযুক্ত রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
একদৃষ্টে শামস হুসাইনের মুখে তাকিয়ে আছে মিস হীরা।
বনহুর সরে এসে দাঁড়ালো মিস হীরার সম্মুখে। যেন কিছু ঘটেনি, এমনিভাবে বলে বনহুর-মিস হীরা, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
