মাত্র কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে ভাবলো, তারপর এগুলো সে দক্ষিণ দিকের পথ বেয়ে। বেশিদূর যেতে হলো না, হঠাৎ কাতরানির শব্দ কানে এলো তার। সামনে তাকিয়ে দেখলো বনহুর একটি ছোট খুপরির মত কুঠরিতে প্রায় পঞ্চাশজনলোক বসে-দাঁড়িয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। সবাইকে এক-একটা রশি দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা রয়েছে। ভাল করে লক্ষ্য করলো বনহু, এই ছোট খুপরিটার মধ্যে নারী-পুরুষ সব রকম আছে। এটা যেন মুরগীর খুপরি।
বনহুরকে ওরা দেখে ফেলেছিলো, একজন বললো-আমাদের মারবে? এর চেয়ে মেরে ফেলো, একসঙ্গে সবাই মরে বেঁচে যাই।
যে লোকটা বনহুরকে দেখে কথাগুলো বললো সে বেশ বয়সী বলে মনে হলো।
লোকটা অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে।
বনহুর অনুভব করলো তাকে ওরা ভুল বুঝছে। সে আরও কিছুটা এগুলো সামনের দিকে।
মশাল জ্বলছে।
তারই আলোতে সুড়ঙ্গপথ আলোকিত।
কুঠরিটার মধ্যে সম্পূর্ণ দেখা না গেলেও যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই ভিতরটার অবস্থা বেশ বুঝতে পারছে বনহুর। হায়রে অসহায় বাঙ্গালী, তোমরা আর কতদিন এমন কি করে মৃত্যুর প্রহর গুণবে!
এগিয়ে গেলো বনহুর।
যে লোকটা বনহুরকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলেছিলো সেই আবার বললো-তোমাকে তো ওদের মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। তুমি কি তাহলে এদের লোক নও?
বনহুর আরও এগিয়ে এসেছে।
খুপরির মধ্য থেকে সবাই তাকিয়ে দেখছে বনহুরকে। বনহুর সরে এসে সেই বয়স্ক লোকটার সামনে দাঁড়ালো।
ও বললো-তুমিও কি আমাদের মত বন্দী? তুমিও কি বাঙ্গালী?
বনহুর বললো-বাঙ্গালী কিন্তু বন্দী নই।
তবে কি করে এলে এই দুর্গম সুড়ঙ্গমধ্যে?
বললো বনহুর-বাঙ্গালী বলে বাঙ্গালী উদ্ধারে এসেছি।
মুহর্তে খুপরির মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ জোড়া চোখ মুক্তির আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠলো। সবাই খুপরি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আকুলি বিকুলি করছে। সবাই হাত বাড়াচ্ছে বনহুরের দিকে।
বনহুর তাকিয়ে দেখছে কত যন্ত্রণাময় অবস্থায় আছে ওরা। হাওয়াবিহীন কবরের অন্ধকারে ভরা খুপরিটা। বনহুর বললো, তোমরা প্রস্তুত থেকো আমি ফিরে এসে যা বলবো সেই মত কাজ করবে।
সবাই আশাদীপ্ত মুখে বললো-হাঁ, আমরা তোমার কথামতই কাজ করবো।
বনহুর এবার দ্বিতীয় পথ ধরে এগিয়ে চললো। এটাও একটি সুন্দর সুড়ঙ্গপথ। কিছুদুরে এগিয়ে যে দৃশ্য বনহুরের নজরে পড়লো সে এক করুণ মর্মবিদারক দৃশ্য। কতকগুলো হাড় জিরজিরে কঙ্কালসার মানুষ বসে বসে মৃত্যুর প্রহর গুণছে। কোটরাগত চোখ, রুক্ষ চুল, ছিন্নভিন্ন বসন।
বনহুরকে দেখে ওরা দাঁড়াতে চেষ্টা করলো কিন্তু এতো দুর্বল যার জন্য তারা দাঁড়াতে পারলো না। এ-ওর গায়ে পড়ে গেলো হুমড়ি খেয়ে।
বনহুর এসে ধরে ফেললো একজনকে, সে অতি বৃদ্ধ এবং দুর্বল ছিলো।
বৃদ্ধটা বললো-বাবা কে তুমি?
বনহুর বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো-আমি একজন বাঙ্গালী। আমি এসেছি আপনাদের উদ্ধার আশায়।
বৃদ্ধের চোখ দুটো খুশিতে জ্বলে উঠলো।
ঐ মুহূর্তে সুড়ঙ্গপথে দ্রুত পদশব্দ শোনা গেলো। ভারী জুতোর শব্দ, মনে হলো এদিকেই এগিয়ে আসছে।
বনহুর ক্ষিপ্রগতিতে একটু আড়ালে আত্নগোপন করে ফেললো। এখনও তার ডান হাতে সূতীক্ষ্ণ ধার বর্শাখানা ধরা রয়েছে।
বনহুর দেখলো শামস হুসাইন ও আরও দু’জন জোয়ান লোক এগিয়ে আসছে। দুজন লোকের হাতে দুটি মশাল।
মশালের আলোতে তার মুখোভাব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এক একজনের চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে।
বনহুর প্রস্তুত হয়ে নিলো।
ওরা তিনজন এগিয়ে আসছে।
সর্বপ্রথম রয়েছে শামস হুসাইন, হাতে তার উদ্যত রাইফেল।
পিছনে তার সঙ্গীদ্বয়, হস্তে বৃহদাকায় সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা।
বনহুর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে তার বর্শা।
ওদিকে বন্দী বাঙ্গালীরা ভয়বিহ্বল চোখে তাকাচ্ছে। একটা বিরাট কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তারই জন্য প্রতীক্ষা করছে ওরা।
বৃদ্ধ বনহুরকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। বনহুর কে তা সে জানে না, জানে লোকটা তাদের উদ্ধার করতে এসেছিলো। তাদের বাঁচাতে এসে বিপদে পড়লো লোকটা। বৃদ্ধের হৃদয় ব্যথায় মুষড়ে পড়ছিলো। খোদা যদি ওকে রক্ষা করেন তাহলে সে খুব খুশি হতো।
শুধু বৃদ্ধ নয়, সেই কক্ষের জীর্ণশীর্ণ বন্দী নারী-পুরুষ সবাই উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। নতুন একটা ঘটনা তাদের সম্মুখে ঘটতে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বৃদ্ধ দাঁড়াতে পারছিলো না, তবু দেয়ালে ভার দিয়ে প্রতীক্ষা করছে একটা চরম অবস্থার জন্য।
ঠিক ঐ মুহর্তে শামস হুসাইন শিকারী কুকুরের মত সোজা এগিয়ে আসছিলো।
আড়াল থেকে বনহুর তার বর্শা নিয়ে শামস হুসাইনের হাতের উপর প্রচণ্ড আঘাত করলো। সঙ্গে সঙ্গে শামস হুসাইনের হাত থেকে রাইফেলটা পড়ে গেলো ছিটকে কিছু দূরে।
একদণ্ড সে থমকে দাঁড়িয়ে বাম হাতে ডান হাতখানা চেপে ধরলো, মুখখানা তার ক্রুদ্ধ শৃগালের মত কুৎসিত হয়ে উঠলো।
পিছনের লোক দুটিও অল্পক্ষণের জন্য হতভম্ভ হয়ে পড়লো।
শামস হুসাইন নিজেকে সামলে নিয়ে চিৎকার করে সঙ্গীদের বললো-হা করে কি দেখছো কাপুরুষের দল……
শামস হুসাইনের কথা শেষ হয় না, আড়াল থেকে বনহুর হিংস্র সিংহের মত ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর।
শামস হুসাইন টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো মাটিতে।
শামস হুসাইন পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গীদ্বয় ছোরা নিয়ে আক্রমণ করলো বনহুরকে।
