পরিণতি যাই হোক পরে দেখা যাবে, আপনি এই মুহূর্তে আদেশ দিন ওকে মুক্ত করে দিতে।
বেশ, তাই দিচ্ছি। এবার সঙ্গীটিকে লক্ষ্য করে বললো শামস হুসাইন-মালিক নাসিরকে বলল ওর দেহ থেকে লৌহশিকল খুলে নিক।
সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলো সঙ্গীটি।
শামস হুসাইন বললো-মিস হীরা, আপনার বাবা আপনাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং সেই কারণেই আপনার নামে এই হীরাঝিল তৈরি করেছিলেন……
এ সব আমি জানি ছোট সাহেব।
তাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি সেই পিতাকে হত্যা করে হীরাঝিল যে ব্যক্তি অধিকার করতে চেয়েছিলো তাকে আপনি মুক্তি দিচ্ছেন কিন্তু……
কোনো কিন্তু আমি শুনতে চাই না ছোট সাহেব। কারণ আমি যা বুঝি তাই হবে। হাঁ, আর একটি কথা, আজ থেকে পিতার বদলে আমি হীরাঝিলের দায়িত্বভার নিলাম।
মিস হীরা, আপনি ছেলেমানুষ হয়ে……
সব পারবো তবে আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন।
বনহুর এই মুহূর্তে একটু তাকিয়ে দেখে নিলো মিস হীরা ও শামস হুসাইনের মুখমণ্ডলটা। দেখলে মিস হীরার কথায় শামস হুসাইনের মুখ কালো হয়ে উঠেছে।
ঐ সময় কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলো’ শামস হুসাইনের সঙ্গীটি, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন। লোক।
শামস হুসাইন এবং মিস হীরাকে কুর্ণিশ জানিয়ে বললো একজন-ছোট সাহেব, বন্দীর বন্ধন খুলে দেবার জন্য নাকি আদেশ দিয়েছেন?
শাসম হুসাইন কিছু বলার পূর্বেই বললো মিস হীরা-হাঁ মালিক নাসির, তুমি বন্দীর বন্ধন মুক্ত করে দাও।
শামস হুসাইন মুখ গম্ভীর করে রইলো।
মালিক নাসির এবার বনহুরের দেহ থেকে লৌহশিকলের তালাগুলো চাবি দিয়ে খুলে দিতে, লাগলো।
মিস হীরা তখন নির্নিমেষ নয়নে দেখছিলো বনহুরকে।
বন্ধন মুক্ত করে দেওয়া হলো।
বনহুর তখনও মরার মত পড়ে রয়েছে।
মিস হীরা বললো-এবার তোমরা বেরিয়ে যাও। যতক্ষণ না এর সংজ্ঞা ফিরে আসে ততক্ষণ। তোমরা কেউ এ কক্ষে আসবে না।
মিস হীরার আদেশক্রমে সবাই বেরিয়ে যায়।
শামস হুসাইনের মুখমণ্ডলে একটা প্রতিহিংসার ভাব ফুটে উঠে। ক্রুদ্ধ পদক্ষেপে বেরিয়ে যায় সে।
মিস হীরা এগিয়ে যায় বনহুরের পাশে, উবু হয়ে তার চিবুকে হাত স্পর্শ করে বলে-কে তুমি অজানা পুরুষ, আমাকে তুমি মুগ্ধ করলে।
অবশ্য মিস হীরাও অবাঙ্গালী, কথাবার্তা সেও উর্দুতে বলছিলো।
বনহুর রুদ্ধ নিশ্বাস নিশ্চুপ থেকে সব লক্ষ্য করতে লাগলো। মিস হীরা যে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আরও কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরার জন্য বনহুর প্রস্তুত হয়ে নিয়েছে।
মিস হীরা বনহুরের কপাল ও গণ্ডে হাত বুলিয়ে চলেছে। চুলগুলো সরিয়ে দিলো সে ওর কপাল থেকে কোমল হস্তের স্পর্শে বনহুরের ব্যথা অনেকখানি যেন কমে গেলো। নিশ্চিন্তও হয়েছে। সে অনেক, কারণ এখনও তার হাত-পা-শরীর মুক্ত।
মিস হীরাকে এই মুহূর্তে সে কাবু করে সরে পড়তে পারে কিন্তু সে আরও কিছুক্ষণ দেখতে চায় মিস হীরার শেষ অভিরুচি কি।
মিস হীরা তখন বনহুরের চিবুক এবং সমস্ত মুখমণ্ডলে নিজের রুমালখানা বুলিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছিলো। একটু পরে উঠে দাঁড়ালো মিস হীরা, তারপর হাতে তালি দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে দু’জন জোয়ান লোক প্রবেশ করলো সেই কক্ষে। মিস হীরাকে ওরা দু’জন কুর্ণিশ জানিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
মিস হীরা বললো-তোমরা দুজন এই কক্ষে এর পাহারায় থাকবে। যখন জ্ঞান ফিরবে তখনই আমাকে ডাকবে। আমি বিশ্রামাগারে যাচ্ছি।
লোক দু’জনের মধ্যে একজন বললো-আচ্ছা মা-জী, আমরা এখানে পাহারায় রইলাম।
হাঁ, সতর্ক থাকবে, জ্ঞান হলেই আমাকে জানাবে। কথাটা বলে বেরিয়ে গেলো মিস হীরা।
বনহুর দেখলো, পাহারাদার লোক দুজন খুব সতর্কভাবে তার দু’পাশে এসে দাঁড়ালো।
এক মিনিট, দু’মিনিট, তিন মিনিট….কয়েক মিনিট কেটে গেলো। বনহুর তাকিয়ে দেখলো পাহারাদার দু’জন ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, হাতে তাদের সূতীক্ষ্ণ ধার বর্শা।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে উঠে দাঁড়ালো। দু’জন পাহারাদারকে দুহাতে চেপে ধরে ভীষণ জোরে চাপ দিলো ওদের গলায়। মাত্র একটু গোঙ্গানির ক্ষীণ আওয়াজ, তারপর দু’জনের সংজ্ঞাহীন দেহ ঢলে পড়লো বনহুরের দু’বাহুর মধ্যে। ৫৯০ ০ –৪
এবার বনহুর পাহারাদার দু’জনকে আলগোছে শুইয়ে দিলো সেই তক্তাখানার উপর। পাশেই পড়ে ছিলো ঐ শিকলগুলো, যে শিকলে বাঁধা ছিলো বনহুরে হাত-পা আর শরীরটা।
বনহুর ঐ শিকলগুলো দিয়ে পাহারাদার দু’জনকে মজবুত করে বেঁধে ফেললো, তারপর সে সোজা দেয়ালের জমকালো চাক্তিটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখলো পকেট ফাঁকা, এমন কি তার ছদ্মবেশের দাড়ি-গোঁফ জোড়াও নেই। রিভলভারটা তো তার হাতে ছিলো, ওটার তো কথাই নেই। বনহুর একটু ভেবে নিলো তারপর পাহারাদারদের একটি বর্শা সে তুলে নিলো হাতে।
এবার বনহুর জমালো গোলাকার চাক্তিটায় আংগুল দিয়ে চাপ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালটা যাদুবিদ্যার মত একপাশে সরে গেলো। বেরিয়ে এলো একটি দরজা।
বনহুর কালবিলম্ব না করে বর্শা হাতে সেই দরজাপথে ভিতরে প্রবেশ করলো। সুন্দর সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে নিচের দিকে।
বনহুর নেমে চললো।
কেউ বাধা দিলো না তাকে।
বেশ কিছুদূর চলার পর দেখলো সিঁড়ির মুখ কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে এদিক-সেদিক চলে গেছে। বনহুর ভেবে নিলো এখন কোন্ দিকে যাবে সে।
