শামস হুসাইন পায়চারী করতে শুরু করলো, চোখেমুখে তার গাম্ভীর্য ভাব দেখা দিলো। বললো আবার-যাও নিয়ে এসো তাকে।
নিয়ে আসতে হবে না, আমি নিজেই এসেছি ছোট সাহেব। শুনলাম আমার বাবাকে যে হত্যা করেছে সে ধরা পড়েছে?
শামস হুসাইন একটু হেসে নিজকে সংযত করে নিয়ে বললো-ধরা পড়েনি, আমি তাকে গ্রেপ্তার করেছি।
সব শুনেছি। বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে তাকে ধরেছেন, দেহের শক্তিতে নয়। কোথায় সে ব্যক্তি?
শামস হুসাইন মিস হীরার কথায় ক্ষুণ্ণ হলো, ক্রুদ্ধও হলো বটে তবু নিজকে সামলে রেখে ভালভাবে বললো-কে বললো এ কথা আপনাকে?
যেই বলুক, আমি শুনেছি। তাছাড়া আমি নিজেও জানি আপনি কতখানি বীর পুরুষ।
বনহুর চোখ বন্ধ করে সব শুনছে, বুঝতে পারলো মিস হীরা ছোট ওস্তাদকে তেমন তোয়াক্কা করে না। বনহুর আরও বুঝতে পেরেছে, মিস হীরা জাফর হুসাইনের কন্যা। পিতৃহন্তার গ্রেপ্তার সংবাদ পেয়েই সে হাজির হয়েছে হীরাঝিলে।
বনহুরের কানে ভেসে আসে মিস হীরার কন্ঠ-আপনাকে যা জিজ্ঞেস করলাম তার জবাব দিন? সে লোকটি কোথায়?
শামস হুসাইন এবার আংগুল দিয়ে বনহুরকে দেখিয়ে বললো-ঐ যে তক্তার সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে।
এতোক্ষণ মিস হীরা অন্যদিকে খেয়াল করেনি। এবার সে এগিয়ে যায় বনহুর যেখানে রয়েছে। সেখানে। কক্ষমধ্যে অল্প পাওয়ারের আলো জ্বলছিলো তাই সহসা নজরে পড়েনি।
মিস হীরা ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে-এখনও একে জীবিত রেখেছেন কেন?
শামস হুসাইন বললো-বিষাক্ত গ্যাসে ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, কাজেই তাকে আমি হত্যার আদেশ দেইনি, কারণ ওকে দগ্ধীভূত করে তিলে তিলে হত্যা করবো।
হাঁ, আমার আব্বাকে যে হত্যা করেছে তাকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করবো না। কথাটা বলে নিজের হাতে মিস হীরা বেশি পাওয়ারের আলোর সুইচটা টিপ দেয়। তারপর ঝুঁকে পড়ে সে বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর তখন নিশ্বাস-প্রশ্বাস একেবারে বন্ধ করে নিপ মরার মত পড়ে থাকে।
মিস হীরার দু’চোখে যে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিলো, প্রতিহিংসার বহ্নিজ্বালায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলো সে।
শামস হুসাইনও এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে।
শামস হুসাইনের সঙ্গীটা দাঁড়িয়ে আছে হুকুমের প্রতীক্ষায়।
শামস হুসাইন লক্ষ্য করছে মিস হীরাকে, বললো সে-এর জ্ঞান ফিরে এলে আমি একে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করবো। এ শুধু বড় ওস্তাদকে হত্যা করেনি, আমাকেও হত্যা করতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি।
মিস হীরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখখানার দিকে। ধীরে ধীরে চোখ দুটো যেন শান্ত হয়ে আসছে মিস হীরার। অবাক হয়ে গেছে সে বনহুরকে দেখে।
শামস হুসাইন তখনও বলে চলেছে-আমাকে হত্যা করে এ শয়তান হীরাঝিল অধিকার করতে চায়। আমি জীবন দিয়ে হীরাঝিলকে রক্ষা করেছি মিস হীরা।
মিস হীরা তখন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে। দৃষ্টি সে ফিরিয়ে নিতে পারছিলো না কিছুতেই। এতো সুন্দর সুপুরুষ লোকটা তার আব্বা জাফর হুসাইনকে হত্যা করেছে। পিতার হত্যার প্রতিহিংসা আগুন যেমন দপ করে জ্বলে উঠেছিলো, তেমনি ধীরে ধীরে নিভে গেলো। এটা নারী সুলভ মায়াময় হৃদয় জেগে উঠলো সেখানে।
শামস হুসাইন বলেই চলেছে-মিস হীরা, এর উদ্দেশ্য অতি জঘন্য ছিলো, হীরাঝিল হস্তগত করে হীরাঝিলের বন্দী সুন্দরী নারীদের সে……
এতোক্ষণে হুস হলো মিস হীরার, বললো-এর হাত-পা ও শরীরের লৌহশিকল খুলে দিন ছোট সাহেব।
মিস হীরার কথায় শামস হুসাইন অবাক হয়ে যায়, বলে উঠে-আপনার পিতৃহন্তাকে মুক্ত করে দেবো, এ কি বলছেন মিস হীরা।
এবার মিস হীরা তাকালো শামস হুসাইনের দিকে, মুখমণ্ডলে তার সেই পূর্বের হিংস্র ভাব আর নেই। স্থির কণ্ঠে বললো হীরা-সংজ্ঞাহীন মানুষকে এভাবে বেঁধে রাখা ঠিক নয় ছোট সাহেব।
আপনি জানেন না মিস হীরা, এ ভয়ঙ্কর শক্তিশালী লোক। শুধু আমাকে নয়, হীরাঝিলের সবাইকে কাহিল করে ফেলবে।
তা আপনার আচরণেই আমি বুঝতে পেরেছি ছোট সাহেব। নাহলে একটা সংজ্ঞাহীন লোককে আপনি এইভাবে লৌহশিকলে বেঁধে রাখতে পারেন! খুলে দিন, তারপর ওর জ্ঞান ফিরে এলে আমি নিজে এর বিচার করবো।
শামস হুসাইনের মুখোভাব গম্ভীর হলো। কত কষ্ট করে তবেই না একে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়েছে সে। তাকে মুক্ত করে দেওয়া মানে বিপদ ডেকে আনা। শামস হুসাইন বললো-মিস হীরা, একে মুক্ত করে দেওয়া কিছুতেই উচিত হবে না।
এটা আপনার মনের দুর্বলতা। একটা সংজ্ঞাহীন মানুষকে বন্দী করে কেউ বীর পুরুষ হতে পারে না। আপনি একে যদি সজ্ঞানে পাকড়াও করতে সক্ষম হতেন তাহলে আমি আপনাকে পুরস্কৃত করতাম। এখন একে আপনি লৌহশিকলে আবদ্ধ রেখে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন।
ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে শামস হুসাইন-মিস হীরা, আমি কাপুরুষ?
হা।
কি বললেন?
যা সত্য তাই বলেছি। যত শক্রই হোক না কেন, তাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় বন্দী করা মোটেই শ্রেয় নয়।
মিস হীরার কথাগুলো বনহুরের হৃদয় স্পর্শ করলো। ওকে একবার চোখ মেলে দেখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু উপায় নেই। শয়তান শামস হুসাইন ও তার সঙ্গী ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
এবার বনহুরের কানে গেলে শামস হুসাইনের কণ্ঠমিস হীরা, ওর হাত-পা এবং দেহ থেকে লৌহশিকল খুলে দেবার নির্দেশ দিচ্ছি কিন্তু এর পরিণতি ভাল হবে না মনে রাখবেন।
