হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখে ধাঁধা লেগে গেলো বনহুরের। তীব্র ইলেকট্রিক আলো।
বনহুর ইচ্ছা করেই সংজ্ঞাহীনের মত চুপচাপ পড়ে রইলো। তবে একটু আধটু দেখতে লাগলো সে অতি সতর্কভাবে। দেখলো বনহুর, কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলো সেই শয়তান লোকটা। চোখেমুখে তার হিংস্রভাব ফুটে উঠেছে।
একটা উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠেছে, তারই তীব্র আলোরছটায় কক্ষটা ঝলমল করছে।
লোকটার সঙ্গে দু’জন বলিষ্ঠ লোক আছে। তাদের দেহে অদ্ভুত ধরনের খাকি পোশাক। লোক দুটোকে ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে। প্রথম ব্যক্তি শামস হুসাইন এবং তার সঙ্গীদ্বয় তারই সহচর।
ওরা তিনজন এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে।
বনহুর অনুভব করলো মেঝেতে একটি মোটা তক্তার সঙ্গে তার দেহটা আটকানো আছে। হাত-পা এবং দেহের সঙ্গে মজবুত করে লৌহশিকল আঁটা।
বনহুরের কানে গেলে প্রথম ব্যক্তি মানে শামস হুসাইনের কণ্ঠস্বর-দেখোত একে চিনতে পারো কিনা?
বলিষ্ঠ জোয়ান লোক দু’জনার মধ্যে একজন ঝুঁকে পড়ে দেখলো বনহুরকে, তারপর বলে উঠলো-একে চিনবো না, এটা সেই লোক যে আমাদের মালিক জাফর হুসাইনকে হত্যা করেছে।
গর্জে উঠলো হুসাইন-কি বললে, ভাইজানকে এই নরশয়তান হত্যা করেছে?
হাঁ ছোট ওস্তাদ, এই সেই মিঃ লিয়ন।
মিঃ লিয়ন! যে বাঙ্গালী বিদেশীর ছদ্মবেশে হোটেল গুলবাগে আস্তানা গেড়েছিলো?
হাঁ, এ সেই বাঙ্গালী শয়তান।
ও, এবার বুঝতে পেরেছি কেন এ হীরাঝিলে এসেছে। বাঙ্গালী বন্দীদের উদ্ধার করতে এসে নিজেই বন্দী বনে বসেছে।
ঠিক বলেছেন ছোট ওস্তাদ। বাঙ্গালী দোস্তদের উদ্ধার করতে এসে বেটা নিজেই ফাঁদে পড়েছে। বললো শামস হুসাইনের এক সঙ্গী।
শামস হুসাইন বনহুরের দেহে পা দিয়ে লাথি মেরে বললো-শয়তান বাঙ্গালী বেটার এখনও জ্ঞান ফেরেনি দেখছি।
একজন বললো-ছোট ওস্তাদ, ওকে এই বেলা খতম করে দেই?
না, এখন নয়। বললো শামস হুসাইন।
কেন ওস্তাদ, ওকে কি বাঁচিয়ে রাখবেন? বললো–আর একজন।
শামস হুসাইন বললো-একে এতো সহজে হত্যা করবো না। জ্ঞান ফিরলে একে তিল তিল করে শাস্তি দিয়ে শেষ করবো। এখনও কিছু অনুভব করবে না……
অন্যজন বললো-ঠিক বলেছেন ছোট ওস্তাদ।
শামস হুসাইন আবার বললো-একে জীবন্ত রেখে এর সামনে ওর জাতভাইদের উপর নির্যাতন চালাবো। দেখবে কেমন মজাটা!
হাঁ, সেই ভাল হবে ছোট ওস্তাদ। বললো অপরজন।
ঠিক সেই সময় আর একজন লোক সেই কক্ষে প্রবেশ করে। কুর্ণিশ জানালো সে শামস হুসাইনকে।
শামস হুসাইন বললো-কি সংবাদ জোসেফ?
আজ তিনটা যুবক পাকড়াও করে এনেছি।
মাত্র তিনটা?
এ তিনটা দশটার কাজ দেবে ছোট ওস্তাদ। বড়লোকের ছেলে, বড় খুবসুরাত আছে।
মেয়ে খুবসুরাত হলে হতো, পুরুষ ছেলে খুবসুরাত হলে কি তেমন লাভ! নিয়ে এসো..
লোকটা বেরিয়ে গেলো, একটু পরে ফিরে এলো, তার সঙ্গে তিনটা যুবক। প্রত্যেকের হাতে রশি বাঁধা। যুবক তিনজনের বিষণ্ণ বদন, চোখে অশ্রুধারা। পিছনে দু’জন রাইফেলধারী লোক।
বনহুর সব লক্ষ্য করছে।
শামস হুসাইন যুবক তিনজনকে দেখলো, খুব ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখার পর বললো-নিয়ে যাও, এদের গোপনকক্ষে বন্দী করে রাখোগে। এদের চালান করবো বিদেশে।
বন্দী যুবক তিনজনসহ লোক দু’জন ওদের দেয়ালের দিকে এগুলো। তার সঙ্গে শামস হুসাইনও চললো। বনহুর দেখলো, দেয়ালের এক জায়গায় একটি জমকালো বোতামে চাপ দিলো শামস হুসাইন। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে একটি দরজা বেরিয়ে পড়লো। সেই দরজা দিয়ে দেয়ালের ভিতরে প্রবেশ করলো লোক দু’জন, যুবক তিনটিকেও তারা সঙ্গে নেবার জন্য টানাটানি করতে লাগলো।
নিরুপায় যুবক তিনজন শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলো তাদের সঙ্গে যেতে।
একটু পরে যুবক তিনজনকে রেখে ফিরে এলো লোক দু’জন।
শামস হুসাইন কালো বোতামটার উপর চাপ দিলো। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালটা যেমন ছিলো তেমনি হয়ে গেলো।
সব লক্ষ্য করলো বনহুর।
শামস হুসাইন লোক দুটিকে লক্ষ্য করে বললো-আজ কত দিতে হবে তোমাদের?
লোক দু’জনের মধ্যে একজন বললো-তিন যুবকের জন্য তিন হাজার দিতে হবে।
এতো বেশি চাচ্ছে কেন? পাঁচশো করে দেড় হাজার দেবো।
না ছোট ওস্তাদ, তা হবে না। বহুত দূর থেকে এদের নিয়ে এসেছি। তাছাড়া এই তিন ছেলেকে আনতে গিয়ে পাঁচটা খুন করতে হয়েছে।
পাঁচটা সেতো কম হলো, কতজন দশটা খুন করে একটা মেয়েমানুষ পাকড়াও করে আনে। যাও দু’হাজার দেবো।
আচ্ছা ছোট ওস্তাদ, তাই দিন। একজন বললো।
অপর জন বললো-বড় ওস্তাদ থাকলে আমরা বেশি টাকা পেতাম। ছোট ওস্তাদ বড় কৃপণ : আছে……।
হাসলো শামস হুসাইন, কুৎসিত বিকৃত হাসি, তারপর বললো-মেয়েমানুষ নিয়ে এসো, বহুত টাকা দেবো,…..একটু থেমে নিজের সঙ্গীদের একজনকে বললো-যাও মোহসিন আলী, ওদের দু’হাজার টাকা দিয়ে দাও।
বেরিয়ে যায় মোহসিন আলী, তাকে অনুসরণ করে লোক দুজন।
এমন সময় আর একজন লোক ভিতরে প্রবেশ করে শামুস হুসাইনকে কুর্ণিশ জানিয়ে ব্যস্তকণ্ঠে বলে-ঘোট সাহেব, মিস হীরা আসছেন।
শামস হুসাইনের চোখেমুখে একটা উত্তেজনার ভাব ফুটে উঠে, বললো সে-মিস হীরা আসছে?
হাঁ, ছোট সাহেব।
হঠাৎ হীরা হীরাঝিলে কেন?
বললো লোকটা-মিস হীরা জানতে পেরেছেন তার পিতৃহন্তা ধরা পড়েছে, তাই তিনি নিজে তাকে দেখতে আসছেন।
হু। একটা শব্দ করলো শামস হুসাইন।
বনহুরের হাত-পা এবং সমস্ত শরীরে লৌহশিকল আটকানো থাকায় তার খুবই কষ্ট হচ্ছিলো, তবু সে স্তব্ধ নিশ্বাসে সংজ্ঞাহীনের মত সেই কক্ষের সব কিছু লক্ষ্য করছিলো। নতুন লোকটি যখন শামস হুসাইনকে কথাগুলো বললো তখন শামস হুসাইনের মুখোভাব লক্ষ্য করলো বনহুর! মিস হীরা নামটা শুনে শামস হুসাইন যেন বেশ কিছুটা দমে গেলো বলে মনে হলো তার।
