রহমান আর শামস হুসাইন মিলে শুরু হলো ভীষণ ধস্তাধস্তি। শামস হুসাইন বুঝতে পেরেছে এও ঐ লোকটির সঙ্গী, তাই মরিয়া হয়ে সে লড়াই করে চললো। শামস হুসাইনের লক্ষ্য রহমানকে কাবু করে পিছন সুইচটায় হাত দেবে কিন্তু সে কিছুতেই রহমানকে কাবু করতে পারছে না।
ঠিক ঐ সময় রামসিং একটা মোটা রশি ঝুলিয়ে দেয়-সর্দার, এটা ধরে ফেলুন।
বনহুর বুঝতে পারে তার কথামত রহমান, রামসিং এরা গাড়ি নিয়ে হীরাঝিলে এসে পৌঁছে গেছে। হয়তো এটা খোদার রহম, নাহলে এতোক্ষণে তার মৃত্যু ঘটতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রামসিং যে রশিটা ঝুলিয়ে দিলো বনহুর ঐ রশি ধরে ফেললো।
এদিকে শামস হুসাইন আর রহমান মিলে সেকি প্রচণ্ড লড়াই চলেছে। কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারছে না। শামস হুসাইন জানতো না হঠাৎ এমন একটা পরিস্থিতি দাঁড়াবে। তার সাঙ্গপাঙ্গ সব নেশায় এখন বুদ। কে কোথায় ঢলে পড়েছে তার ঠিক নেই। তবু বারবার তাকাচ্ছে সে দরজার দিকে, কেউ যদি এসে পড়তো তার দলের লোক তাহলে এক্ষুণি বেঁচে যেতো।
শামস হুসাইনের আশা পূর্ণ হলো না, কারণ শয়তানদল তখন কে কোথায়, কোনো পাত্তা নেই কারো।
বনহুর রশি ধরে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে রামসিং রশির এক অংশ একটা থামের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। এবার বনহুরের বিলম্ব হয় না, রশি ধরে অনায়াসে উঠে আসে বনহুর উপরে।
বনহুর উপরে এসেই প্যান্টের পকেট থেকে ক্ষিপ্রহস্তে রিভলভার বের করে উদ্যত করে ধরে শামস হুসাইনের বুক লক্ষ্য করে। কঠিন কণ্ঠে বলে বনহুর-খবরদার, নড়বে না।
শামস হুসাইনকে মুক্ত করে দিয়ে রহমান সরে দাঁড়িয়েছিলো। শামস হুসাইন এবার ভূতলশয্যা থেকে উঠে বসে। রীতিমত হাঁপাচ্ছে শামস হুসাইন। চোখেমুখে তার হিংস্রভাব ফুটে উঠেছে। ঠোঁটের এক পাশ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
রহমানও অত্যন্ত হাঁপিয়ে পড়েছিলো। তার কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে।
বনহুর শামস হুসাইনের জামার কলার ধরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়, তারপর রিভলভার ঠিক রেখে বলে-হীরাঝিলের চাবিকাঠি কোথায়?
শামস হুসাইন বলে উঠলো-চাবিকাঠি কোথায় আমি জানি না।
তুমি জানো না? তবে কে জানে।
জাফর হুসাইন……….
সে তো এখন যমালয়ে।
আমি জানি না।
তবে তুমি কে?
বলবো না।
বনহুর প্রচণ্ড থাবায় শামস হুসাইনের গলার কাছে জামাটা ধরে ভীষণভাবে ঝাঁকুনি দেয়, তারপর বলে-বলবে না? বড় সুবিধার লোক তুমি। সহজে না বললো কেমন করে বলাতে হয়। দেখাচ্ছি …..সঙ্গে সঙ্গে বতুল্য এক ঘুষি।
ঘুষি খেয়ে একটুও নড়লো না শামস হুসাইন, রিভলভারখানা তখনও তার বুকে চেপে ধরে আছে বনহুর। দাতে দাঁত পিষে বলে-হীরাঝিলের গভীর রহস্য তোমাকেই জানাতে হবে শয়তান। চলো, না হলে এক্ষুণি তোমাকে হত্যা করবো।
বনহুরের ঘুষি খেয়ে শামস হুসাইনের দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলো। নাক দিয়েও রক্ত ঝরতে শুরু করলো। এগুলো সে বাধ্য ছেলের মত।
বনহুর শামস হুসাইনের পিঠে রিভলভার চেপে ধরে বললো-চলো, কোথায় চাবিকাঠি দাও।
শামস হুসাইন একবার পিছন ফিরে কটমট করে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। তারপর এগুলো সে, এগারো তলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে, সিঁড়ির ধাপ বেয়ে পাশাপাশি নামছিলো শামস হুসাইন আর বনহুর।
রহমান আর রামসিং তারা পিছনে, দু’জন দু’পাশে সতর্কভাবে রয়েছে। তাদের হাতেও পিস্তল আছে।
শামস হুসাইন তিন তলায় নেমে এলো।
এবার সে একটা কক্ষ দেখিয়ে বললো-এই কক্ষে চাবি রয়েছে।
বনহুর বললো-বেশ, দরজা খুলে চাবি বের করে আনো।
শামস হুসাইন তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা চাবি বের করে দরজা খুলে ফেললো, প্রবেশ করলো সে ভিতরে। বনহুর তাকে অনুসরণ করলো।
রহমান আর রামসিং ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলো, বনহুর তাদের ইংগিতে বারণ করলো।
রহমান আর রামসিং অগ্রসর না হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দরজার বাইরে।
বনহুর ভিতরে প্রবেশ করে দেখলো শামস হুসাইন ওদিকে দেয়ালের দিকে এগুচ্ছে। দেয়ালের গায়ে কতকগুলো যন্ত্রপাতি লক্ষ্য করলো বনহুর। কিন্তু চাবি কোথায়, এ কক্ষে আর কোনো আসবাব দেখা যাচ্ছে না। কক্ষটার মধ্যে ঝাপসা আলো জ্বলছে।
বনহুর কিন্তু সবসময় শামস হুসাইনের দিকে তার রিভলভার ঠিক রেখেছে। এতোটুকু বদমাইশি বা চালাকি করলে সে বনহুরের রিভলভার থেকে রক্ষা পাবে না।
হঠাৎ শামস হুসাইন একটা চাকায় হাত দিয়ে চাপা দিলো, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ঘর একরাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে ধুমরাশির মধ্যে শামস হুসাইনকে লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো। শুড় ম……গুড় ম……গুড় ম……কোনো আর্তনাদ শোনা গেলো না।
বনহুরের মনে হচ্ছে সমস্ত ঘরখানা যেন দুলছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। সে অতি দ্রুত নাকেমুখে রুমাল চাপ দিলো। বনহুর বুঝতে পারলো শয়তানটার চক্রান্ত এটা। ধূমুরাশি বিষাক্ত গ্যাস ছাড়া কিছু নয়। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে বনহুর। চোখের দৃষ্টি ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছে।
বনহুর তাড়াতাড়ি উবু হয়ে শুয়ে পড়লো মেঝেতে ডান হাতে নাকমুখ চেপে ধরে।
*
ক্রমান্বয়ে জ্ঞান ফিরে এলো বনহুরের।
চোখ খুলতেই নজরে পড়লো চারিদিকে জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন। হাত পা-দেহ কিছুই নড়াতে পারছে না সে। বুঝতে পারলে তার সমস্ত শরীরে লৌহশিকল জড়ানো আছে। উঠে বসতে গেলো কিন্তু পারলো না। ধীরে ধীরে মনে পড়লো সেই ধূম্ররাশির কথা। বিষাক্ত গ্যাস ছাড়া কিছু নয়। আরও মনে পড়লো বনহুরের রহমান আর রামসিং-এর কথা। ওরাও কি তারই মত বিপদে পড়েছে, না মুক্ত আছে। কতক্ষণ সে এমন অজ্ঞান ছিলো খেয়াল নেই। কেমন যেন একটা শব্দ কানে আসছে। কেউ যেন গোঙ্গাচ্ছে বা কাতরাচ্ছে বলে মনে হলো।
